ভারত ও ইতালির মধ্যে স্ক্যান্ডাল, যা শুরু হয়েছে ইতালির পক্ষ থেকে আরব সাগরে দুই ভারতীয় জেলেকে জলদস্যূ ভেবে গুলি করে হত্যা করার অপরাধে ভারতে ধৃত দুই ইতালির নৌবাহিনীর সেনাকে বিচারের জন্য ভারতে ফেরত দিতে না চাওয়ার জন্য, তা এবারে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে. ইউরোপীয় সঙ্ঘের নেতৃত্ব এই কূটনৈতিক বিবাদে অংশ নিতে না চাওয়া স্বত্ত্বেও ব্রাসেলসকে সম্ভবতঃ ভারত ও রোমের মধ্যে এক মোটেও হাল্কা নয় এমন বাছাই করতে হবে, এই রকম মনে করে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“এই সংঘর্ষ, যার কেন্দ্রে ভারতে ইতালির রাষ্ট্রদূত দানিয়েলে মানচিনি পড়েছেন, তা খুবই দ্রুত স্ক্যান্ডালে পরিণত হচ্ছে. এই বিরোধ এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে যখন ভারতের সুপ্রীম কোর্ট সোমবারে দিল্লী থেকে ইতালির কূটনৈতিক মিশনের প্রধানকে ২রা এপ্রিলের আগে দেশ ছেড়ে না যাওয়ার জন্য নিষেধ সংক্রান্ত রায় দিয়েছে. আদালত দাবী করেছে যে, স্থানীয় বিমানবন্দরের কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রদূত মানচিনিকে যেন দেশ ছেড়ে যেতে না দেয়, যদি তিনি সে চেষ্টাও করেন”.

রাষ্ট্রদূতের পরবর্তী ভাগ্য ভারতের আদালত স্থির করবে আগামী মঙ্গলবারে নিজেদের পরবর্তী অধিবেশনের সময়ে. আদালতের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে মত দিয়ে গিয়ে ভারতের প্রধান বিচারপতি আলতামাস কবির খুবই তীক্ষ্ণ হয়েছেন নিজের বক্তব্যের ক্ষেত্রে. “দানিয়েলে মানচিনি আমাদের বিশ্বাস হারিয়েছেন” ও “তাঁর নিজের কাজ দিয়ে তিনি বিশিষ্ট কূটনৈতিক অধিকার হারিয়েছেন”.

প্রত্যুত্তরে ইতালির পররাষ্ট্র দপ্তর ভারতীয় পক্ষের কাজকর্মকে ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘণ করা বলে উল্লেখ করেছে. এখানে আগ্রহের বিষয় হল যে, তাদের জন্য এত প্রয়োজনীয় ইউরোপীয় সঙ্ঘের সহযোগিতা রোমের সেই পাওয়া হয়ে ওঠে নি. “ইউরোপীয় সঙ্ঘ আশা করা চালিয়ে যাচ্ছে যে, আলোচনার সময়েই একে অপরের জন্য উপযুক্ত সিদ্ধান্ত বের হবে”, - ইতালির গাজেতা দেল সুদ সংবাদপত্রে পররাষ্ট্র নীতি ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা ক্ষেত্রে ইউরোপীয় সঙ্ঘের সর্ব্বোচ্চ প্রতিনিধি ক্যাথরিন অ্যাস্টন খুবই এড়িয়ে যাওয়ার মতো করে এই মন্তব্য করেছেন. খুবই আচমকা ও এক ঘোরানো ঘোষণা, যা মোটেও প্রমাণ করে না যে, নিজেদের অন্য দিকে চলা দিয়ে ভারত ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘণ করেছে, এই রকম মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব বান কী মুন.

পরিস্থিতি মোটেও এত সহজ নয়, যতটা ইতালির পক্ষ থেকে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে. এটা ঠিকই যে, দিল্লী ভিয়েনা কনভেনশনের নিয়মাবলী সম্বন্ধে না জেনে থাকতে পারে না. কিন্তু এই কনভেনশনের ৩২, ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, যদি কূটনীতিবিদ নিজে থেকে তাঁর কর্মস্থলের দেশের আদালতে শুধু সাধারন লোক হিসাবে উপস্থিত হন, তবে তিনি নিজের কূটনৈতিক বিশেষ অধিকার হারান.

এই ধরনের ক্ষেত্রে খুবই এক রকম দেখতে লাগছে রাষ্ট্রদূত মানচিনির সঙ্গে হওয়া ইতিহাসকে. ভারতের আদালতে পৌঁছে ও সেখানে ২২শে মার্চ পর্যন্ত এই দুই নৌবাহিনীর সেনাকে, যাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ধীবরদের হত্যার অভিযোগ রয়েছে, তাদের দেশে ভোট দিতে যাওয়ার জন্য ব্যক্তিগত ভাবে মানচিনির নিজের দায়িত্বে ছেড়ে দেওয়ার আবেদন করে রাষ্ট্রদূত না জেনে পারেন না যে, তাঁর জন্য এর পরিণাম কি হতে পারে, যদি এই নাবিকরা দিল্লীতে উল্লিখিত দিনের মধ্যে ফিরে না আসে.

এই বিরোধের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই দিল্লী থেকে আরও জোরালো ভাবে সেই সব কন্ঠস্বর শোনা যেতে শুরু করেছে যে, ভারতীয় পক্ষ থেকে রোমের সঙ্গে এই বিরোধকে উচিত হবে সমগ্র ইউরোপীয় সঙ্ঘের সঙ্গে বিরোধের স্তরে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার. দিল্লীর বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশের মতে, ভারত ব্রাসেলসের সহযোগিতা আশা করতেই পারে, যারা এশিয়ার এই তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কের উন্নতি করতে আগ্রহী, যাদের বাজার ইউরোপীয় সঙ্ঘের সর্বমোট বাজারের চেয়েও পরিমানে বড়. এক উল্লেখযোগ্য মন্তব্য, যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড সংবাদপত্রে ভারতের স্বাধীন গবেষণা কেন্দ্র তক্ষশিলা ইনস্টিটিউশনের প্রধান নীতিন পাই প্রকাশ করেছেন যে, “ইউরোপকে বঁড়শি থেকে ছিটকে যেতে দিও না” নামের লেখায়, যে “ভারতের উচিত্ হবে ব্রাসেলস, বার্লিন, প্যারিস ও লন্ডনের কাছে এই মত পৌঁছে দেওয়ার যে, ইতালির ব্যবহারের জন্য দায়িত্ব দিল্লী সমগ্র ইউরোপীয় সঙ্ঘের উপরেই অর্পণ করবে”. লেখকের মতে, এই ধরনের অবস্থান নেওয়ার ভিত্তি হতে পারে ২০০৯ সালের লিসাবন শহরের চুক্তি, যাতে বলা হয়েছে ইউরোপীয় সঙ্ঘের সামগ্রিক পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে.

নিজেদের পক্ষ থেকে, ইউরোপে মনে করা হয়েছে যে, ব্রাসেলসের তরফ থেকে নেওয়া হস্তক্ষেপ না করার রাজনীতি মোটেও লিসাবন চুক্তি লঙ্ঘণ করে না. ইউরোপীয় সঙ্ঘে সামগ্রিক ইউরোপীয় নীতির সঙ্গে সেই সমস্ত প্রশ্ন – যে গুলিতে জাতীয় সরকার গুলির সমাধানের অধিকার সর্বাগ্রে রয়েছে, তা সম্বন্ধে এক নির্দিষ্ট সীমারেখা টানা হয়ে থাকে. এই ধরনের প্রশ্নের ক্ষেত্রেই ব্রাসেলস বর্তমানে রোম ও দিল্লীর বিবাদকে উল্লেখ করেছে.

এখন প্রশ্ন হল যে, ইউরোপীয় সঙ্ঘের পক্ষে এর পরেও কি সমান ভাবে দূরে থাকা সম্ভব হবে, কারণ ইতালির উপরে পরবর্তী পর্যায়ে দিল্লী থেকে চাপ বাড়ানো হলে রোম জোর দিয়েই তাদের ইউরোপীয় সহযোগী দেশ গুলির কাছ থেকে সহায়তা চাইতে পারে. আর তখন সেই প্রশ্ন যে, কি করে এই বিরোধকে ইউরোপীয় সঙ্ঘের এক বনেদী দেশের স্বার্থ বজায় রেখে সমাধান করা যেতে পারে, আর তাও মূল নীতি গুলিকে লঙ্ঘণ না করেই এবং “বিশ্বের সবচেয়ে বেশী জনসংখ্যার গণতন্ত্রের” সঙ্গে কোন বিবাদ না করে, যাদের অর্থনীতি ইউরোপীয় ব্যবসার জন্য আরও বেশী করেই লোভনীয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা ব্রাসেলসের জন্য হবে সত্যিই এক বাস্তব ধাঁধা.