এই সপ্তাহে জেনেভা শহরের রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার পরিষদের সভায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের খসড়া অনুযায়ী শ্রীলঙ্কায় মানবাধিকার রক্ষা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ভোটাভুটির কথা রয়েছে. এখনও না হওয়া ভোটের ফল ইতিমধ্যেই ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দেখতে পাওয়া গিয়েছে: তামিল দল দ্রাভিড় মুন্নেত্রা কাঝগম (ডিএমকে) ঘোষণা করেছে যে, তারা জোটের সরকার ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে. এর অর্থ হল যে, ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সের জোট সরকার, যদিও এখনও দেশের লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন হারায় নি, তবুও এবারে একেবারে কিনারায় ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছে. এই পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি, তিনি বলেছেন:

“বর্তমানের পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয়ে আলাদা করে বলা যেতে পারে. প্রথমতঃ, শ্রীলঙ্কায় পরিস্থিতি নিয়ে প্যারাডক্স হল যে, দেশের আভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, যা পঁচিশ বছর ধরে চলেছে, তাকে দেখা হয়েছে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলীদের সমর্থিত সরকারের সঙ্গে সংখ্যালঘু তামিলদের সমর্থন পাওয়া জঙ্গী দল “তামিল ইলমের টাইগারদের” বিরোধ বলে. কিন্তু বিশ্বের পরিপ্রেক্ষিতে সংখ্যা গরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘুদের ভূমিকা পাল্টেছে: শুধু ভারতেই আছেন ছয় কোটির উপরে তামিল জনতা ও এই তামিলদের সংখ্যা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে, পশ্চিমে, আফ্রিকাতে ও অস্ট্রেলিয়াতেও বিভিন্ন মূল্যায়ণ অনুযায়ী এক কোটির বেশী. আর এই তামিল লোকরা পশ্চিমের দেশ গুলিতে সামাজিক মতামতের উপরে শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করেছে”.

তাই পশ্চিমের বিশ্ব ঝুঁকে রয়েছে সেই সব মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় লক্ষ্য করতে, যা শ্রীলঙ্কার সরকারি সেনাবাহিনী গৃহযুদ্ধের সময়ে করেছে, আর “টাইগারদের” অপরাধের বিষয়ে চোখ বন্ধ করে রাখতে, - বলেছেন বরিস ভলখোনস্কি. – আর এই সব অপরাধ খুবই সংখ্যায় বেশী. সেই “টাইগার” নামের জঙ্গীরাই প্রথম ব্যবহার করতে শুরু করেছিল আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদী ব্যবহার করার. ১৯৯১ সালে এই দলের এক সন্ত্রাসবাদী আত্মঘাতী মেয়েই রাজীব গান্ধীকে হত্যা করেছিল. আর নিহত শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সংখ্যা খুবই কঠিন হবে হিসাব করা. তার ওপরে হিসেব করা হয়েছে যে, ২২০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের আগে বিশ্বে বেশীর ভাগ সন্ত্রাসবাদী কাজই করেছে সেই “টাইগার” জঙ্গীরাই, কোন ঐস্লামিক জঙ্গী নয়, যা নিয়ে বিগত বছর গুলিতে সকলেই বলাবলি করছেন. সেই “টাইগার” জঙ্গীরাই শুরু করেছিল শান্তিপ্রিয় জনগণকে, তাদের মধ্যে শিশু ও মহিলাদেরও “জীবন্ত ঢাল” হিসাবে ব্যবহার করা, আর তার পরে সরকারকে তাদের নিহত হওয়ার জন্য অভিযুক্ত করা. ভলখোনস্কি আরও বলেছেন:

“দ্বিতীয়তঃ, ভূ-রাজনৈতিক সমস্যার অংশও দেখতে হবে. মোটেও এটা বাস্তব নয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার রক্ষার জন্য এত দরদী হয়ে সিদ্ধান্তের খসড়া বানিয়ে নিয়ে আসছে. ইরাকে, আফগানিস্তানে ও বিশ্বের অন্যান্য দেশে এবং “বৃহত্ নিকটপ্রাচ্যে” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের জোটের দেশ গুলির সামরিক কাজকর্মের জন্য গত ১২ বছরে শ্রীলঙ্কার চেয়ে অনেক বেশী শান্তিপ্রিয় মানুষ মারা গিয়েছেন. কারণ অন্য জায়গায়: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খুব ইচ্ছা হয়েছে শ্রীলঙ্কাকে একটু “টাইট” দেওয়ার, যারা নিজেদের পররাষ্ট্র নীতিতে আরও বেশী করেই চিনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে”.

তৃতীয় বিষয় ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেই জড়িত বলে রুশ বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেছেন. ২০১১ সালে তামিলনাডু রাজ্যে আঞ্চলিক নির্বাচনের পরে ডিএমকে ক্ষমতা হারিয়েছে ও এবারে খুবই তাড়াহুড়ো করে চেষ্টা করছে নিজেদের জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনার. ঠিক সেই কারণেই ডিএমকে দলের নেতা এম. করুণানিধি দাবী করেছেন ভারত সরকারের কাছ থেকে এই সিদ্ধান্তের খসড়ায় পরিবর্তন করানোর, কঠোর করানোর - তাতে এমনকি “গণহত্যা” নামক কথাটি অন্তর্ভুক্ত করার.

এই পরিস্থিতিতে ভারত সরকারের বেশ কিছু উপায়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করতে হচ্ছে. সব একই রকম রেখে দেওয়া – যার অর্থ হল যে লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর বিপদ ঘটানো. বিশেষ করে তারপরে, যখন গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে জোট ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে আরেক শরিক – পশ্চিম বঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস. নিজেদের অবস্থানকে কঠোর করা – অর্থ হবে একেবারেই শেষ অবধি শ্রীলঙ্কার মতো নিজেদের জন্য স্ট্র্যাটেজিক প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা, আর এমন একটা উদাহরণ সৃষ্টি করা, যা ভারতের বিপক্ষেই যেতে পারে.

ব্যাপার হল যে, তামিল বিরোধী পক্ষের একটি দাবী হল – সিদ্ধান্তের খসড়াতে শ্রীলঙ্কার প্রশাসনের কাছ থেকে দাবী করা, যাতে স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের এই দেশে সম্পূর্ণ স্বাধীন ভাবেই তদন্ত করতে দেওয়া হয়. ভারত সেই বিষয়েই জোর দিয়েছে যে, পর্যবেক্ষকদের শ্রীলঙ্কাতে ঢুকতে দেওয়া হবে শুধু সেই দেশের সরকারের সহমতেই আর তা কোন ভাবেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের নীতির বিরুদ্ধে করা যেতে পারে না.

কারণটা সহজ: সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রায়ই ভারতের বিরুদ্ধে করা হয়ে থাকে কাশ্মীরের পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে. আর তার অর্থ হল যে, শ্রীলঙ্কায় স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের অবাধে ঢোকার অধিকার দিলে ভারতকে নিজেদের দেশেও “সবুজ সঙ্কেত” দিয়ে এই ধরনের লোকদের ঢোকার অনুমতি দিতে হতে পারে, সেই কাশ্মীর প্রসঙ্গেই.

সুতরাং ভারত সরকারের এখন রয়েছে “মোটেও সহজ নয়”, এমন পরিস্থিতিতে, বলে মনে করেছেন বরিস ভলখোনস্কি. আর তাদের কাছে যা উপায় রয়েছে – তা একটি অন্যটির চেয়ে খারাপ.