ক্ষমতাসীন প্রত্যেক ব্যক্তি – সে তিনি রাষ্ট্রপতিই হোন, রাজা বা জার – সারাক্ষণ জনসমক্ষে. তাদের দিকে হাজার হাজার চোখের দৃষ্টিনিবদ্ধ. তাদের যে কোনো অপ্রিয় কাজ বা অসতর্ক মন্তব্য সাথেসাথে প্রচার হয়ে যায় সমাজে. জনতার অহর্নিশ মনোযোগ থেকে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা চেষ্টা করেন অন্ততঃ তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে আড়াল করার, কিন্তু তা সবসময় সফল হয় না.

রাশিয়ার ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখেছেন দুজন মহান জার – প্রথম পিটার ও দ্বিতীয় আলেক্সান্দর. অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে রাশিয়ায় রাজত্ব করা জার পিটার রাশিয়ার জন্য ইউরোপের জানালা উন্মুক্ত করেছিলেন. তিনি বদ্ধ পিতৃতান্ত্রিক মস্কোর সিংহাসনকে পরিণত করেছিলেন শক্তিশালী সাম্রাজ্যে. আর দ্বিতীয় আলেক্সান্দর কৃষকদের ভূমিদাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন, শাসনব্যবস্থার বড়সড় সংস্কারসাধন করেছিলেন. মুকুটধারী সংস্কারকারীরা লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য নির্ণয় করেছিলেন, কিন্তু তাদের নিজেদের ভাগ্য নিয়ে খেলা করেছিল প্রেম.

পিটারের প্রথম দাম্পত্য জীবনের মেয়াদ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি. পারিষদ কন্যা এভদাকিয়া খুব শীঘ্রই তরুন, চনমনে সম্রাটকে তিতিবিরক্ত করে দিয়েছিল. মাত্র ২৯ বছর বয়সেই সে মস্তকমুন্ডন করে মঠে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল এবং তার দীর্ঘায়ু জীবন মঠের প্রাচীরের আড়ালেই কেটেছিল. এদিকে পিটার জার্মান তরুনী আন্না মন্সকে নিয়ে মেতে উঠলেন. প্রেমান্ধ জার আন্নাকে দামী দামী অলঙ্কারে মুড়ে দিলেন, প্রাসাদ, জমিদারী দান করতে লাগলেন. পিটারের ঘনিষ্ঠদের শিহরিত করে তিনি এমনকি মন্সকে বিবাহ করতেও উদ্যত হয়েছিলেন. কিন্তু শীঘ্রই জার জানতে পারলেন, যে আন্না মন্স সতী নয়. ক্রুদ্ধ সম্রাট আন্না মন্সকে কারাগারে নিক্ষেপ করলেন.

পিটারের দ্বিতীয় পত্নী মার্তা স্কাভ্রোনস্কায়া, যিনি পরবর্তীকালে প্রথম একাতেরিনা নামে রুশদেশের সম্রাজ্ঞীর পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, তার জন্মের ইতিহাস কুয়াসায় ঢাকা. তিনি বহু প্রেমিককে হাতবদল করেছিলেন পিটারের সংস্পর্শে আসার আগে. এই মহিলা জারকে এতটাই বশে আনতে পেরেছিলেন, যে বিবাহের আগে জন্ম দেওয়া তার সব সন্তানকে পিটার স্বীকৃতি দিয়ে তাকে বিবাহ করেছিলেন ১৭১২ সালে. তাদের সুখী দাম্পত্য জীবন স্থায়ী হয়েছিল ১২ বছর, কিন্তু মৃত্যুর অনতিকাল পূর্বে পিটার জানতে পারেন, যে মার্তা তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে. তাও আবার কার শয্যাসঙ্গিনী হয়েছে, না সুদর্শন কামারগার উইলিয়াম মন্সের, যে ছিল আন্না মন্সের আপন ভাই. ক্রোধান্ধ জার উইলিয়ামের মস্তকছিন্ন করে, তা স্পিরিটে ভিজিয়ে রানীর শয্যামহলে রাখার আদেশ দিয়েছিলেন. বলা হয়, যে সম্রাট এমনকি বিশ্বাসঘাতিনী স্ত্রীকেও হত্যা করার কথা ভেবেছিলেন. কিন্তু পিটার আচমকা দেহত্যাগ করেন ও একাতেরিনা রাশিয়ার সিংহাসনে আরোহন করেন.

দ্বিতীয় আলেক্সান্দরের ব্যক্তিগত জীবন অতটা রক্তাক্ত নয়. কিন্তু কম বিয়োগান্তক ছিল না. ১৮৫৯ সালের গ্রীস্মকালে নাইট দোলগারুকির গৃহে বিশ্রাম নেওয়ার সময় তিনি প্রথম দেখতে পান মিষ্টি মেয়ে একাতেরিনাকে. খুব শীঘ্রই নাইট দোলগারুকি মারা যান এবং বহু সন্তানের পরিবার দেউলিয়া হয়ে যায়. তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন জার আলেক্সান্দর. তিনি নাইটের সব পুত্রদের অভিজাত সামরিক স্কুলে ভর্তি করে দেন আর কন্যাদের সেন্ট-পিটার্সবার্গের বিখ্যাত কনভেন্টে ভর্তি করেন. ১৮৬৫ সালে কনভেন্ট পরিদর্শন করাকালে ৪৭-বছর বয়সী জার দ্বিতীয়বার দেখতে পান ১৭-বছর বয়সী একাতেরিনাকে. তাদের প্রেম স্থায়ী হয়েছিল ১৫ বছর, নাইটকন্যা জারকে ৪টি সন্তান উপহার দিয়েছিলেন. সম্রাজ্ঞীর জীবত্কালেই জার সন্তানদের সমেত তাঁর প্রিয়তমাকে রাজপ্রাসাদে তাঁর নিজস্ব মহলের পাশে স্থান দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন. জারের আইনানুগ সন্তানরা, বিশেষতঃ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল এতে. তারা ভয় পেয়েছিল, যে জার দোলগারুকায়াকে সিংহাসন অর্পণ করবেন ও তাদের শাসনক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেবেন.

১৮৮০ সালের ৬ই জুলাই সম্রাজ্ঞীর মৃত্যু উপলক্ষে সরকারী শোকপালনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই জার আলেক্সান্দর একাতেরিনা দোলগারুকায়াকে বিবাহ করেন গোপনে. কিন্তু জারের সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি. তার একবছর পরেই জার দ্বিতীয় আলেক্সান্দরকে হত্যা করে বিপ্লবী-সন্ত্রাসবাদীরা. আলেক্সান্দরের মৃত্যুর অব্যহিত পরেই সন্তানদের সমেত একাতেরিনাকে রাজপ্রাসাদ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার ওপর গুপ্ত পুলিশ অহর্নিশ নজর রাখতো. শীঘ্রই বাচ্চাদের নিয়ে তাকে বিদেশে পাড়ি দিতে বাধ্য করা হয়. দোলগারুকায়া রাশিয়ায় আর কখনো ফিরে আসেননি. কিন্তু দেখা গেল, যে প্রবাস তার ও তার সন্তানদের জীবন রক্ষা করেছিল. ১৯১৭ সালে বিপ্লবের পরে জারের গোটা পরিবারকে হত্যা করেছিল বলশেভিকরা.

আর নাইটকন্যা একাতেরিনা নিজের সম্রাটের প্রতি প্রেমের দীপশিখা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত প্রজ্বলিত রেখে ১৯২২ সালে ফ্রান্সে দেহত্যাগ করেন.