গত সপ্তাহের শেষে ভারত সরকার ঘোষণা করেছে যে, আগামী দুই মাসের মধ্যে খুঁটিয়ে পরিকল্পনা করা হবে ভারতের এক পবিত্র নদী যমুনার জল পরিষ্কার করার. জল সম্পদ সংক্রান্ত ইউনিয়ন মিনিস্টার হরিশ প্রভাত যেমন ঘোষণা করেছেন যে, এই পরিকল্পনা তৈরী করা হবে এবং তাতে দেশের রাজধানী দিল্লীকে বেড় দিয়ে এক জলের গতি পাল্টে দেওয়ার চ্যানেল বানানো হবে আর তার সঙ্গে তৈরী করা হবে একবারে একসারি জল পরিষ্কার করার ব্যবস্থা, যেগুলি নদীর জলে আর ময়লা নিকাশী নল থেকে সরাসরি নোংরা জল নদীতে পড়তে দেবে না.

এই ঘোষণা দশ হাজার লোকের ১২ দিন ব্যাপী দিল্লী চলো মিছিলের আগেই করা হয়েছে, যা আয়োজিত হয়েছে যমুনা রক্ষক দলের পক্ষ থেকে ও যেখানে বহু সংখ্যক সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও কৃষক সংস্থা এক জোট হয়েছে, যারা খুবই গুরুত্ব দিয়ে যমুনা নদীর জল পরিষ্কার থাকা নিয়ে আন্দোলন করছে.

হিমালয় পর্ব্বত থেকে শুরু হওয়া যমুনা নদী ভারতের উত্তরাঞ্চল দিয়ে গিয়ে ভারতের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণতম নদী গঙ্গার অববাহিকাতে মিশেছে, আর এই নদীকে তার সম্পূর্ণ দেড় হাজার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সব জায়গাতেই ভাবা হয় পবিত্র বলেই. সবচেয়ে পূজা করার মত জায়গা, যা এই নদীতে রয়েছে – তা হল বৃন্দাবন ও মথুরা শহর, যা ভগবান কৃষ্ণের কাহিনীর সঙ্গে যুক্ত. তাছাড়া যমুনা নদীর তীরে রয়েছে আগ্রা শহর, যেখানে ভারতীয় স্থাপত্যের এক মুক্তা – তাজমহল সমাধি প্রাসাদ রয়েছে.

বিগত বছর গুলিতে যমুনা নদীতে জল নোংরা হওয়ার স্তর সমস্ত রকমের চিন্তার উপযুক্ত সীমানা পার হয়ে গিয়েছে. বহু জায়গাতেই জলে অক্সিজেনের পরিমান রয়েছে শূন্যের স্তরে. পরিনামে – বহু রকমের প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়া, যেমন, বিরল প্রজাতির নদীর শুশুক কমে যাওয়া. আর যেমন বুনো শুয়োর ও চিতল হরিণের সংখ্যাও কমে যাওয়া, যারা আগে এই নদীর বিভিন্ন জলা হয়ে থাকা তীরবর্তী এলাকায় খাদ্য সংগ্রহ করত, আর বর্তমানে তা করতে না পারায় কৃষি জমিতে হানা দিয়ে থাকে, যার ফলে খুবই বেশী পরিমানে ফসল নষ্ট হয়.

যমুনা নদীর প্রধান দূষণের উত্স হয়েছে ভারতেরই রাজধানী দিল্লী শহর. তাই এই প্রতিবাদ মিছিল বৃন্দাবন থেকে হয়েছে এই শহরের দিকেই. আর যদি দেশের মন্ত্রীসভা প্রতিবাদ যাঁরা করছেন, তাঁদের দাবী সত্যিই শুনতে রাজী থাকেন, তবে এটাকে শুধু স্বাগতই জানানো যেতে পারে.

কিন্তু এই সমস্ত পরিস্থিতিতে বহু “কিন্তু” রয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“যমুনা নদীর সমস্যা মোটেও আজ শুরু হয় নি, আর আগেও বহুবার সরকার আশ্বাস দিয়েছে এই নদীকে দূষণ মুক্ত করা নিয়ে কাজ শুরু করার.দেশের পার্লামেন্টে বিরোধী পক্ষের নেতা সুষমা স্বরাজ যেমন ঘোষণা করেছেন যে, যমুনা অ্যাকশন প্ল্যানের জন্য শত কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে, কিন্তু কোন রকমের ভাল পরিস্থিতি তাতে হয় নি.

আর এখনও বোঝা যাচ্ছে না, এই প্রতিবাদ আন্দোলন ও সরকারের তা নিয়ে প্রতিক্রিয়ার মধ্যে কোনটা বেশী – পরিবেশ দূষণ নিয়ে যত্নের প্রচেষ্টা নাকি স্রেফ জনপ্রিয় হওয়ার জন্য স্লোগান দেওয়া, যা ২০১৪ সালের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের আগে নিজেদের জন্য স্রেফ একটা জনমত তৈরী অংশ মাত্র. এই প্রতিবাদ আন্দোলনের এক সক্রিয় কর্মী জয়কৃষ্ণ দাস নিউইয়র্ক টাইমস সংবাদপত্রকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাত্কারে যেমন বলেছেন যে, সরকার কোনও লিখিত গ্যারান্টি দেয় নি আর এখন তাদের মুখের কথাকে বিশ্বাস করা ছাড়া আর কোনও পথও নেই”.

ভারতে দুর্নীতির স্তর এখন এমন জায়গায় উঠেছে যে, এমনকি সবচেয়ে ভাল শুরুও ব্যুরোক্র্যাসীর গভীরে তলিয়ে যেতে পারে. আর এখানে মনে পড়ে যাচ্ছে ২০১১ সালের ঘটনার কথা, যখন সারা ভারত জুড়ে উঠেছিল সর্বজনীন দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন, যাতে অংশ নিয়েছিল মাত্র দশ হাজার সক্রিয় কর্মী নন, বরং সহস্র লক্ষ মানুষ. আর তা সারা ভারত জুড়েই. তখন মনে হয়েছিল যে, এই আন্দোলন ভারতীয় এসট্যাব্লিশমেন্টের বনিয়াদকেই টলিয়ে দিতে সক্ষম ও নিয়ে আসতে পারে মূল ধারায় পরিবর্তন. কিন্তু কোনও বাস্তব পরিনাম এই আন্দোলন নিয়ে আসতে পারে নি – শুধু কিছু সক্রিয় কর্মীকেই তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তৈরী করে দিয়েছিল. তাই এখনও খুব একটা স্পষ্ট নয় যে, রাজনৈতিক নেতারা এই ব্যাপারটা ভোটের পরে ভুলে যাবেন কি না.

আর ব্যাপারটা শুধু যমুনা নিয়েই নয়, আর শুধু এই নদীর জন্য – দিল্লীর আবর্জনা যুক্ত জলের মধ্যেই নয়. যমুনা পরিষ্কার করার পরিকল্পনা (যদি সত্যিই তা সফল ভাবে করা হয়) অন্যান্য নদী গুলিতেও একই ধরনের কাজের জন্য উদাহরণ কি হবে? কারণ পরিবেশের ব্যবস্থা ভারতের উত্তরাঞ্চলের সমতলের বহু ঘন জনসংখ্যা যুক্ত এলাকাতে এত বেশী ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মানুষেরই নানা রকমের বিষয় কর্মের ফলে যে, তা আবার পুনরুদ্ধার করা আজ বোধহয় সম্ভবপর হবে না.

প্যারাডক্স মনে হলেও, যমুনা ও অন্যান্য নদী গুলির নিজেদের পবিত্র হওয়ার স্ট্যাটাসের জন্যই নির্দিষ্ট মাত্রায় পরিষ্কার থাকার বিরুদ্ধে কাজ করে থাকে. বহু দশক, শতক না হলেও, মানুষে তাদের জল ব্যবহার করে গিয়েছে পূজা অর্চনার কাজে, যদিও এই জলের রঙ দেখেই ভয় লেগে যায়. আর শুধু এখনই, যখন এক সক্রিয় কর্মীর কথামতো, যমুনার জলে আর এক ফোঁটাও নদীর জল নেই, শুধু দিল্লী শহরের নর্দমার জলই রয়েছে, তখন সরকার ঠিক করেছে জরুরী ব্যবস্থা নেওয়ার.

দেরী কি হয়ে যায় নি?