সোমবারে শ্রীলঙ্কা রাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বে হামবাতোঙ্গা এলাকায় মাত্তালা রাজপক্ষে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হয়েছে.

দেশের একটি সবচেয়ে অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকা শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল. তারই মধ্যে এখানে উন্নতির সম্ভাবনা কিছু কম নয়, আর এটা বিশেষ করে দেখতে পাওয়া গিয়েছে, দেশের গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে, যখন দেশের পূর্বাঞ্চলের এলাকা গুলিকে তামিল ইলম টাইগার জঙ্গীদের হাত থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল. যুদ্ধ পরিস্থিতি শেষ হওয়ার পরে শ্রীলঙ্কা এখন সারা বছর ধরে পর্যটন কেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা পেয়েছে. এখন ট্যুরিসমের জন্য সব থেকে হাই সিজন হয়ে উঠেছে শীতের মাস গুলি, যখন উত্তর – পূর্ব মৌসুমি বায়ু দ্বীপের আবহাওয়াকে আরামদায়ক করে. পূর্বের সমুদ্র উপকূল অঞ্চল গ্রীষ্মের সময়ে সক্রিয়ভাবেই ট্যুরিস্টরা ব্যবহার করতে পারবেন, যখন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় উষ্ণ-মণ্ডলীয় বৃষ্টি প্রবল ভাবেই হয়ে থাকে.

পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় সমুদ্র উপকূল ব্যবহার করায় খুব বেশী করেই অসুবিধার কারণ হয়েছে পরিবহন সংক্রান্ত দুর্বল পরিকাঠামো. এখন এই আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর খোলার পরে ও একই সঙ্গে হামবাতোঙ্গা শহরে বড় সামুদ্রিক বন্দর তৈরী হওয়ার পরে এই সব এলাকার বিকাশের জন্য এটা খুবই শক্তিশালী উত্সাহের কাজ করতে পারে, কারণ এছাড়া শ্রীলঙ্কায় কলম্বো শহরে রয়েছে একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রাক্তন রাষ্ট্র প্রধান বন্দরনায়েকের নামাঙ্কিত. এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“বড় পরিবহন কেন্দ্র এবারে সাহায্য করবে এখানে খুব বড় ধরনের বিনিয়োগ পাওয়ার ও অর্থনীতির অনেক গুলি ক্ষেত্রেই এই পিছিয়ে থাকা রাজ্য স্বল্প সময়ের মধ্যেই হয়ে উঠতে পারে এক বৃহত্ শিল্প – বাণিজ্য কেন্দ্র. এখানে গুরুত্বপূর্ণ হবে উল্লেখ করা যে, হামবাতোঙ্গা শহরের সামুদ্রিক বন্দর ও তার থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে থাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চিনের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সাহায্যে গড়ে উঠেছে. আর শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ-পূর্বে বিশাল পরিসরে যে রাস্তাঘাট তৈরী করা হচ্ছে – যেগুলি স্থানীয় অনুপাতে খুবই উন্নত হয়েছে, তাও তৈরী হচ্ছে চিনের বিনিয়োগের ফলেই. তারই সঙ্গে হামবাতোঙ্গা শহরে ও তার চারপাশের আপাততঃ কম জনসংখ্যা বিশিষ্ট এলাকা গুলিতে বিশাল সব প্রশাসনিক ভবন তৈরী করা হচ্ছে, তারই সঙ্গে আরও অনেক সমস্ত কেন্দ্র, যা প্রমাণ করছে শ্রীলঙ্কার প্রশাসন ও তাদের সঙ্গে চিনের বন্ধুদের বড় ধরনের সমস্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয়েই, যেমন, প্রায় শূণ্য মাঠে তৈরী করা হচ্ছে বিশাল কংগ্রেস ভবন, যেখানে বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক ফোরামের আয়োজন করা সম্ভব হতে পারে”.

এর অর্থ হল যে, আরও বেশী করেই শ্রীলঙ্কা চিনের ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় নিজেদের উপস্থিতি বৃদ্ধির স্ট্র্যাটেজির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধনে বাঁধা পড়ছে- ইংরাজী ভাষার সাহিত্যে এই স্ট্র্যাটেজি নাম পেয়েছে “মুক্তা মালা”. আর যদিও আসন্ন ভবিষ্যতে হামবাতোঙ্গা বন্দরকে চিনের সামরিক নৌবহরের ঘাঁটি বানানোর কথা বলা হচ্ছে না, তবুও এটা জানা রয়েছে যে, এই বন্দরকে চিনের বাণিজ্য পোত ও নৌবহরের জন্য জ্বালানী ভর্তি করার বন্দর হিসাবে ব্যবহার করা যেতেই পারে. এই “মুক্তামালা” স্ট্র্যাটেজি যেমন ভারতবর্ষকে, তেমনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও খুবই উদ্বিগ্ন করেছে, এই কথা উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আন্তর্জাতিক মঞ্চে চিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সরাসরি ভাবে এই বন্দর ও বিমানবন্দর নির্মাণের কাজে কোনও বাধা দিতে না পেরে শ্রীলঙ্কার উপরে “সামঞ্জস্য হীন” চাপের সৃষ্টি করেছে. অংশতঃ, যেমন আশা করা হচ্ছে যে, এই সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশনের কাছে গৃহযুদ্ধের শেষে সেই দেশে তামিল সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার করা হচ্ছে বলে এক সিদ্ধান্তের খসড়া আলোচনার জন্য পেশ করতে চলেছে.

এই পরিস্থিতিতে প্যারাডক্স হল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যারা সন্ত্রাসবাদের প্রসার রোধ করতে অসমর্থ হয়েছে, আর যে সন্ত্রাসবাদের প্রসারের জন্য তারা নিজেরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সহায়তা করেছে, তারা আজ সমালোচনা করছে খুব কম সংখ্যক দেশের একটিকে, যাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে, নিজেদের এলাকায় সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা করার”.

এই পরিস্থিতিতে ভারতবর্ষ খুবই জটিল সমস্যার মধ্যে রয়েছে. এক দিক থেকে ভারত সরকার, তাদের দক্ষিণের প্রতিবেশী দেশের সাথে চায় মিত্র সুলভ ও সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরী করতে. এই প্রসঙ্গে কিছু দিন আগেই ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান সলমন খুরশিদ বলেছেন যে, ভারতের কোন ভাবেই “বিশ্বের শৃঙ্খলা রক্ষক পুলিশ অথবা অন্যদেশের সঙ্গে বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করতে যাওয়া উচিত্ হবে না”. অন্য দিক থেকে ভারতের যে কোনও রাজনৈতিক শক্তিই – তা যেমন ক্ষমতাসীন সরকার, তেমনই বিরোধী পক্ষ – বাধ্য হবে শক্তিশালী “তামিল লবির” মতামত হিসেবে রাখতে. আর ভারতের বহু তামিল রাজনীতিবিদই, পশ্চিমের দেশ গুলিতে থাকা বহু প্রসারিত তামিল সম্প্রদায়ের মতই কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না যে, স্বাধীন “তামিল রাষ্ট্রের” ধারণা কবরে গিয়েছে.

সুতরাং শ্রীলঙ্কার সরকার যত সক্রিয়ভাবে নিজেদের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে. ততই আন্তর্জাতিক মঞ্চে তারা আরও বেশী করেই বাধার সম্মুখীণ হবে.