বিশ্বের বাজারে চিনের ড্রাগন নতুন ঝাঁপ দিয়েছে. বিশ্বের বৃহত্তম সমরাস্ত্র সরবরাহকারী প্রথম পাঁচটি দেশের তালিকায় এবারে প্রথম চিনকে দেখতে পাওয়া গিয়েছে. ২০১২ সালের সমরাস্ত্র বাণিজ্য নিয়ে বিশ্ব সমস্যা সম্বন্ধে এক গবেষণার পরিনাম হিসাবে স্টকহোম ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বলা হয়েছে. ঠাণ্ডা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে এটা প্রথম পাঁচের তালিকায় প্রথমবার পরিবর্তন হয়েছে. চিন একই সঙ্গে এশিয়ার প্রথম দেশ হয়েছে, যারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র রপ্তানীকারক দেশের তালিকায় এসেছে.

২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে, এই বিশ্লেষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চিনের ভাগে পড়েছে সাধারন অস্ত্র রপ্তানী নিয়ে বাণিজ্যের শতকরা পাঁচ ভাগ. এর আগের পাঁচ বছরে চিনের ভাগে পড়েছিল সাধারন অস্ত্র রপ্তানীর মাত্র দুভাগ. পাঁচ নম্বর জায়গা থেকে চিন সরাতে সক্ষম হয়েছে গ্রেট ব্রিটেনকে, তারা দেখিয়েছে এক অনতিপূর্ব সমরাস্ত্র রপ্তানীর হার – শতকরা ১৬২ ভাগ. এটা বিশ্বের পাঁচ প্রধান রপ্তানীকারক দেশের গড় বৃদ্ধির চেয়ে ১৩ গুণ বেশী. এই পাঁচটি দেশ – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জার্মানী, ফ্রান্স ও গ্রেট ব্রিটেন. অন্যান্য কারণ, যা চিনকে এই ধরনের উন্নতি করতে সাহায্য করেছে- তা নিয়ে সুদূর প্রাচ্য ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ আলেকজান্ডার লারিন বলেছেন:

“চিনের একটা সুবিধা রয়েছে, তারা অন্যদের থেকে সস্তায় বিক্রী করে. তাদের জন্য খুবই সুবিধার হয়েছে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সহযোগিতা, যা আমরা তাদের সমরাস্ত্র ও তা তৈরী করার জন্য লাইসেন্স বিক্রী করে তৈরী করে দিয়েছি. চিন রাশিয়ার সহায়তায় আধুনিক কামান, কৌশলগত রকেট অস্ত্র, ইঞ্জিন ও বিমানের অন্যান্য প্রয়োজনীয় অংশ সরবরাহ করে থাকে. চিনকে লাইসেন্স বিক্রী করা প্রায়ই এমন শর্ত দিয়ে করা হয়েছিল যে, যাতে চিন এই অস্ত্র তৃতীয় দেশকে বিক্রীর জন্য ব্যবহার করবে না. কিন্তু চিন এই সব অস্ত্রের সামান্য পরিবর্তন করে, যেমন কামানের ক্যালিবার পরিবর্তন করে বাইরের দেশের বাজারে বিক্রী করতে শুরু করেছে. এই ধরনের কাজ আজ অনেক দিন ধরেই করা হচ্ছে”.

চিনের অস্ত্রের বৃহত্ ক্রেতাদের মধ্যে - পাকিস্তান, ইজিপ্ট, বাংলাদেশ, নামিবিয়া, শ্রীলঙ্কা. পাকিস্তান শুধু বিগত কয়েক বছরের মধ্যেই চিন থেকে কিনেছে ৫০টি জেএফ – ১৭ যুদ্ধ বিমান, আর তারই সঙ্গে ২০৩টি এম বিটি – ২০০০ ট্যাঙ্ক. ট্যাঙ্ক রপ্তানীর ক্ষেত্রে চিন রাশিয়ার পরে বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে পৌঁছেছে, তারা এই ক্ষেত্রে জার্মানী, ফ্রান্স ও গ্রেট ব্রিটেনকে পিছনে ফেলেছে. চিনের ট্যাঙ্ক গুলির প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে আফ্রিকার দেশ গুলিও রয়েছে. এই প্রসঙ্গে পশ্চিম এই সব বাজারে চিনকে নিজেদের দখল করা এলাকা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়ে নিয়মিত ভাবেই তাদের আফ্রিকার সেই সব প্রশাসনকে অস্ত্র সরবরাহের জন্য দোষী সাব্যস্ত করছে, যারা মানবাধিকার খর্ব করছে. চিন এই সব অভিযোগ মানছে না, তারা উল্লেখ করেছে চুক্তি গুলির স্পষ্ট ও স্বচ্ছতার কথা ও অস্ত্র ব্যবসা নিয়ে আন্তর্জাতিক নিয়ম কঠোর ভাবে মানা হচ্ছে বলেই.

বিশ্বের অস্ত্র বাজারে চিনের ড্রাগনের নতুন ঝাঁপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সঙ্ঘের জন্য নতুন ধরনের বিরক্তির কারণ হতে পারে. মানবাধিকার রক্ষা প্রসঙ্গে আইন ভঙ্গের জন্য শাস্তি হিসাবে তারা চিনে আধুনিক রকমের অস্ত্র তৈরীর জন্য প্রয়োজনীয় দুই ভাবেই ব্যবহার যোগ্য প্রযুক্তি রপ্তানী সম্বন্ধে নিষেধাজ্ঞা গ্রহণ করেছে. ইউরোপীয় সঙ্ঘের আবার এই ধরনের হেয় করার মতো নিয়মের বিষয়ে একটি যুক্তি হয়েছে যে, চিন খুবই ভাল করে পশ্চিমের প্রযুক্তি নকল করতে পারে ও তা আবার অন্য দেশে রপ্তানী করতে পারে. আর, এই ভাবেই, বিশ্বের বাজারে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে.

তাই এটাও বাদ দেওয়া যেতে পারে না যে, জার্মানী ও ফ্রান্স, যারা বিশ্বের অস্ত্র রপ্তানী কারক দেশের তালিকায় খুবই অল্প এগিয়ে রয়েছে চিনের চেয়ে, তারা এই কারণেই নিজেদের চিনে অস্ত্র রপ্তানী সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা অবস্থান কঠিন করেছে.

এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়াতে তাদের সহকর্মী দেশ গুলির চাপের ফলেও হতে পারে. জাপান, যেমন একাধিকবার বিভিন্ন স্তরে ব্রাসেলস কে আহ্বান করেছে বেজিংকে অস্ত্র সরবরাহ করা নিয়ে. ১৮ই মার্চ জাপানের মন্ত্রীসভা প্যারিসকে আহ্বান করেছে নিজেদের উদ্বেগ নিয়ে, যা হয়েছে ফ্রান্সের জাহাজ তৈরীর কর্পোরেশন ডিসিএনএস চিনের সঙ্গে চুক্তি করার ফলে. এই চুক্তির মধ্যে চিনকে সেই ধরনের যন্ত্র বিক্রীর কথা রয়েছে, যা জাহাজের উপরে খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে হেলিকপ্টার নামা ওঠার সময়ে সুবিধার জন্য ব্যবহার করা যায়.