বৃহস্পতিবারে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট এক ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে: কোন রকমের সামরিক অভ্যুত্থান অথবা মেয়াদের আগেই বরখাস্ত না হয়ে সংবিধান সম্মত নিজের পাঁচ বছর ব্যাপী কাজের মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে. যা সাধারণতঃ যে কোন গণতান্ত্রিক দেশের জন্য স্বাভাবিক বিষয় হয়ে থাকে, তাই পাকিস্তানের জন্য রেকর্ড হয়েছে: এর আগে একটি নাগরিক প্রশাসনেরই সংবিধান সম্মত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব হয় নি, আর নিজের ৬৫ বছরের স্বাধীন অস্তিত্বের মধ্যে অর্ধেক সময়ই দেশে ক্ষমতা ছিল সামরিক বাহিনী, যারা ক্ষমতায় এসেছিল দেশে অভ্যুত্থানের ফলে.

পাঁচ বছর ব্যাপী জাতীয় অ্যাসেম্বলী(মজলিশেসুরা বা লোকসভা) যে কাজ করেছে, তার ফলে ১৩০টি আইন গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে, তার মধ্যে বেশ কয়েকটি সংবিধান সংশোধন. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল – নারী অধিকার, রাজ্যের জন্য স্বয়ং শাসনের অধিকার বৃদ্ধি, নির্বাচন সংক্রান্ত আইনে পরিবর্তন ইত্যাদি.

প্রসঙ্গতঃ, আজকের দিনে প্রধান প্রশ্ন এইটা নয় যে, নির্দিষ্ট কোন আইন গ্রহণ সম্ভব হয়েছে. প্রশ্ন হল, আমরা কি দীর্ঘস্থায়ী গণতান্ত্রিক বিকাশের প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি, অথবা এটা স্রেফ একটা অধ্যায় ও ব্যতিক্রম, যা পাকিস্তানের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল ইতিহাসে হয়েছে.

প্যারাডক্স হলেও বাস্তব: বর্তমানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারিকে এক সঙ্গে সমস্ত পর্যবেক্ষকই মনে করেছেন এই দেশের স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্বল অসামরিক নেতা হিসাবে, এই কথা উল্লেখ করেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি. আর তা স্বত্ত্বেও জারদারির পক্ষে সম্ভব হয়েছে সংবিধান সম্মত দায়িত্বের মেয়াদের শেষ অবধি নিজের জায়গায় বহাল থাকার. তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“যতই আশ্চর্য লাগুক না কেন, তাঁকে এখন এর জন্য ধন্যবাদ জানাতে হচ্ছে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও বর্তমানের সরকারের একজন সবচেয়ে কটু সমালোচক পারভেজ মুশারফকে. মুশারফ দেশের সংবিধান পাল্টেছেন, পাকিস্তানকে রাষ্ট্রপতি শাসিত প্রজাতন্ত্রে পরিণত করে. আর এটাই তাঁর উত্তরসুরী জারদারিকে নিজের উপর থেকে আঘাত এড়িয়ে তাঁর নিজের থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের, যেমন প্রধানমন্ত্রীদের এগিয়ে দিতে পেরেছেন. গত বছরের জুন মাসে ইউসুফ রেজা গিলানিকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল, আর বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফের নামে ফৌজদারী মামলা করা হয়েছে, যদিও তিনি নিজের পদেই বহাল রয়েছেন”.

উপরোল্লিখিত প্রশ্নের আংশিক উত্তর পাওয়া সম্ভব হবে দেশে পার্লামেন্ট নির্বাচনের পরেই, যা হওয়া দরকার ১৬ই মের মধ্যে. কিভাবে নির্বাচনী প্রচার ও ভোট গ্রহণ পর্ব হবে, তার উপরে অনেক কিছুই নির্ভর করছে. কিন্তু এমনকি যদি সব কিছুই খুব কঠোর ভাবে গণতান্ত্রিক নিয়ম মেনে হয়, তবুও এতে এখনই দাঁড়ি টানা তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে বলে মনে করেছেন ভলখোনস্কি, তিনি বলেছেন:

“রাষ্ট্রপতি জারদারির ক্ষমতাসীন দল, পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি, তাদের প্রধান বিরোধী দল মুসলিম লীগ আর নওয়াজ মুসলিম লীগের মতই নিজেদের সেই শক্তিরই প্রতিনিধি বলে মনে করে, যা পুরনো নীতি নিয়মের সঙ্গে জড়িত, তারা খুবই বেশী করে নিজেদের দুর্নীতি সংক্রান্ত স্ক্যান্ডালের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছে, যাতে যেমন রাষ্ট্রপতি জারদারি নিজে, তেমনই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ জড়িত. আর সারা দেশের জন সাধারণের পক্ষ থেকে খুবই তীব্র ভাবে পরিবর্তনের প্রত্যাশা করা হয়েছে, নির্বাচনের মেজরিটি হিসাবে ক্ষমতায় আসার পথ পুরনো দল গুলিকেই বেশী সুবিধা করে দিচ্ছে, যদিও দেশের লোকে তাদের চায় না. আজ পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ণে দেশের জাতীয় হিরো ও সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ ইমরান খানের নেতৃত্বে তেহরিক-এ-ইনসাফ পাকিস্তান দল পার্লামেন্টে শতকরা পাঁচ ভাগের বেশী আসনের প্রত্যাশাই করতে পারে না. আর সেই রকমের পরিস্থিতি অসন্তোষ বৃদ্ধি করতেই পারে ও রাস্তায় নিয়ে আসতে পারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেন্দ্রকে – তার ওপরে আরব বসন্তের মতো কিছু একটা করার চেষ্টা এই বছরের শুরুতেই করা হয়েছিল”.

এখানে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবের মধ্যে রাখা দরকার. পাকিস্তানের ঘটনা নিজে থেকেই পাল্টায় না, বরং তা হয়ে থাকে তাদের বড় ভাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গভীর নজরদারির নীচেই. দেখাই যাচ্ছে যে, জারদারির মুখ নিসৃত মার্কিনদের উদ্দেশ্য সমস্ত কড়া ঘোষণা স্বত্ত্বেও তাঁর ঘুঁটি সমুদ্র পারের অভিভাবকদের জন্য খুব ভাল করেই চলতে পেরেছে. একই সঙ্গে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, কম করে হলেও ২০১৪ সালের শেষ পর্যন্ত, অর্থাত্ আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার শেষ না হওয়া পর্যন্ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে খুব একটা তীক্ষ্ণ কাজ কারবার করতে চাইবে না. কিন্তু তার পরে কি হবে – আজ কেউই বলতে চাইবেন না.

গ্যালাপ সংস্থার পক্ষ থেকে কয়েক দিন আগে করা গবেষণা অনুযায়ী, পাকিস্তানে মার্কিন বিরোধী মনোভাব শতকরা ৭৯ ভাগ লোকের রয়েছে. আর যদি ইমরান খান অথবা অন্য কেউ, যারা নির্বাচনের ফল নিয়ে সন্তুষ্ট হবেন না, তারা এই মার্কিন বিরোধী মনোভাবকেই হাতিয়ার করে রাস্তায় মানুষ জনকে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়, তবে যে কোন রকমের পরিস্থিতি বদলকেই আর বিস্ময়কর বলে মনে হবে না.