রোমের ২৬৬ তম পোপ হয়েছেন ৭৬ বছর বয়সী আর্জেন্টিনার কার্ডিনাল হোর্খে মারিও বের্গোলিও. তিনি কনক্লেভ বা নির্বাচনের দ্বিতীয় দিনে নির্বাচিত হয়েছেন. পবিত্র সন্ত পিওতরের সিংহাসনে আসীন হওয়ার জন্য নব নির্বাচিত ক্যাথলিক গির্জার প্রধানের প্রয়োজন পড়েছিল কম করে হলেও ১১৫টির মধ্যে ৭৭টি ভোট পাওয়ার – কারণ তত জনই ছিলেন কার্ডিনাল, যাঁদের এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার ছিল. ক্যাথলিক গির্জার ইতিহাসে ইনি প্রথম কার্ডিনাল, যিনি পবিত্র সন্ত পিওতরের সিংহাসনে আসীন হলেন অথচ ইউরোপ থেকে নন.

অ্যাপোস্টল প্রাসাদের সিক্সটিন চ্যাপেলের ধোঁয়া বের হওয়ার পাইপ থেকে সাদা ধোঁয়া ও ঘন্টাধ্বনি জানিয়ে দিয়েছিল যে, রোমের পোপ নির্বাচিত হয়েছেন. ভ্যাটিকানের পবিত্র পিওতরের চত্বরে লক্ষ জনতার ভীড়ে যেমন ছিলেন ধর্মভীরু জনতা, তেমনই ছিলেন বহু মানুষ. যাঁরা ঠিক করেছিলেন ক্যাথলিক বিশ্বের জন্য এই ঐতিহাসিক দিনে রোমে আসার, যখন চত্বর বাস্তবিক ভাবেই বিস্ফোরিত হয়েছিল জনতার গণ স্বাগত অভিনন্দন উল্লাসে. পোপের জয় হোক! – ভীড়ের থেকে আওয়াজ উঠেছিল. এখানে জমা হওয়া লোকদের মাথার উপরে বিভিন্ন দেশের জাতীয় পতাকা উড়তে শুরু করেছিল. কিছু পরে কার্ডিনাল জান-লুই তোরান ব্যালকনি থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করেছিলেন: হাবেমুস পাপাম!, যা ভাষান্তরে অর্থ হয় – আমাদের পোপ আছেন. ফ্রান্সিস্ক – রোমের প্রধান যাজক নিজের এই নামই বেছে নিয়েছেন. তিনি তাঁর ধর্মাবলম্বী মানুষদের উদ্দেশ্যে প্রথম স্বাগত ভাষণে বলেছেন:

“কনক্লেভ বিশ্বকে নতুন পোপ দিতে বাধ্য ছিল, আর কার্ডিনালরা মনে হয়, সবই সাধ্যমত করেছেন. আর তাই আজ আমি এখানে. কিন্তু চলুন প্রথমে আমরা আমাদের সম্মানিত ধর্মগুরু এপিস্কোপ ষোঢ়শ বেনেডিক্টের জন্য প্রার্থনা করি. আমি আপনাদেরও খুবই অনুরোধ করব যে, আপনারা যেন বিধাতার সামনে নীরবতার মধ্যে আমার জন্যও প্রার্থনা করেন, যাতে আমাদের আপনাদের সঙ্গে সহগমনে পথ হয় ভ্রাতৃত্ব, ভালবাসা ও বিশ্বাসে ভরপুর”.

কার্ডিনাল বের্গোলিও যে, পোপ হয়েছেন, তা খুবই অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার, এই কথা রেডিও রাশিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে স্বীকার করেছেন ভ্যাটিকান সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ কাতেরিনা সান্তোনি সিনিতসিনা. তিনি বলেছেন:

“যখন সিক্সটিন চ্যাপেলের মাথায় সাদা ধোঁয়া দেখতে পাওয়া গেল, তখন সকলেই ভেবেছিল, যে পোপ হয়েছেন হয় কার্ডিনাল বের্তোনে অথবা কার্ডিনাল স্কোলা – যিনি মিলানের আর্চ বিশপ. সুতরাং আমাদের জন্য এটা ছিল খুবই আচমকা ব্যাপার. এটা ঠিক যে, ২০০৫ সালে এই কার্ডিনাল বের্গোলিও ছিলেন ষোঢ়শ বেনেডিক্টের নির্বাচনের সময়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী. ইনি খুবই শিক্ষিত মানুষ. তিনি আর্জেন্টিনাতে জন্মেছেন, কিন্তু ওনার পূর্ব পুরুষরা ইতালি থেকেই. তিনি পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে কনিষ্ঠ. ১৯৬৯ সালে তিনি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের ডিগ্রী পেয়েছিলেন ও তারপরে ধর্মীয় গুরু হিসাবে দীক্ষিত হয়েছিলেন. তিনি সেমিনারি পাশ করেছিলেন. ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি কার্ডিনাল হয়েছিলেন. তিনি খুবই ভাল ধারণা তৈরী করেন. আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় – তিনি নিজে নাম বেছেছেন ফ্রান্সিস্ক. পোপ ইতিহাসে এটাই প্রথম ঘটনা, যখন কোন উচ্চ কোটির নাম বাছা হল না. রোমান ক্যাথলিক গির্জায় ফ্রান্সিস্ক নাম সব সময়ে ভাল চোখে দেখা হয় নি. প্রধানতঃ এটা ছিল রাজাদের নাম. এবারের পোপ নিজে একজন জেসুইট. রোমান ক্যাথলিক গির্জার ইতিহাসে চারজন পোপ ছিলেন ফ্রান্সিস্কান বা সেন্ট ফ্রান্সিসের মতাবলম্বী. বর্তমানের পোপ নিজে জেসুইট. আর যখন জেসুইট ফ্রান্সিস্কান নাম নিয়েছেন, তখন আমি নিশ্চিত যে – এটা ভাল প্রতীক. খুব সম্ভবতঃ, গির্জার এবারে সংশোধনের অপেক্ষা করা যেতে পারে”.

জেসুইট হোর্খে মারিও বের্গোলিও একজন খুবই ধর্ম তত্ত্ব বিষয়ে পন্ডিত লোক বলে বিখ্যাত ও তিনি যথেষ্ট মধ্যপন্থী সংরক্ষণশীল মানুষ, যিনি গর্ভপাত ও স্বেচ্ছা মৃত্যুর কঠোর সমালোচনা করে থাকেন, একই সঙ্গে তিনি সমকামী বিবাহ বিষয়েও খুবই উচ্চৈস্বরে প্রতিবাদ জানিয়েছেন. তিনি সবসময়েই দরিদ্র মানুষদের সহায়তার জন্য সামাজিক পরিকল্পনাকে বিকশিত করার আহ্বান করেছেন ও স্বাধীন বাজার অর্থনীতির ন্যায় সঙ্গত হওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন. মনে হয়, ভ্যাটিকানে মনে করা হয়েছে যে, এই ধরনের পোপই আজ গির্জার প্রয়োজন. কারণ তাঁকে একসারি সমস্যার সম্মুখীণ হতে হবে, যার সমাধান করাতে আর দেরী করার কোন সময় নেই.

১৯শে মার্চ আনুষ্ঠানিক ভাবে রোমের নতুন পোপের সিংহাসনে আরোহণ উত্সব করা হতে চলেছে.