ইতালি ও ভারতবর্ষ এবারে খুবই গুরুতর ভাবে ও অনেক দিনের জন্যেই ঝগড়া করতে পারে. দুই ইতালীয় নাবিক, যারা ভারতীয় জেলেদের মৃত্যুর জন্য দায়ী, তারা ভারতীয় আদালতের সামনে উপস্থিত হতে চায় না.এই প্রসঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ রোমকে ইতিমধ্যেই “পরিণতি” সম্বন্ধে হুমকি দিয়েছেন. আর ভারতের সুপ্রীম কোর্ট বৃহস্পতিবারে ইতালির রাষ্ট্রদূত দানিয়েল মানচিনিকে ১৮ই মার্চের আগে দেশ ছেড়ে যেতে নিষেধ করেছে. ১৮ই মার্চের মধ্যে তাঁকে আদালত থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তিনি ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য যে, কেন ভারতীয় জেলেদের মৃত্যুর জন্য দায়ী দুই ইতালীয় নাবিক বিচারের জন্য ভারতে ফিরে আসবে না. এই বিরোধ আরও উত্তেজিত করা হয়েছে দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলার প্রসঙ্গেও, যেখানে স্পষ্ট করে দেখা গিয়েছে “ইতালীয় চিহ্ন”. ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রাক্তন প্রধান শশী ত্যাগী ও তাঁর কাছের লোকদের বিরুদ্ধে ইতালীয় কোম্পানী ফিনমেক্কানিকার কাছ থেকে পঁচাত্তর লক্ষ ডলারের বিনিময়ে দিল্লীতে হেলিকপ্টার কেনার চুক্তি করার সময়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে. এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় বিরোধী পক্ষ এখন “ইতালীয় ষড়যন্ত্রের” তাস খেলতেই পারে বলে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন মনে করেছেন, তিনি বলেছেন:

“ভারতীয় প্রশাসনের প্রধান মনমোহন সিংহের খুবই কড়া ঘোষণা, যা প্রমাণ করে দেয় যে, দিল্লী ও রোম বর্তমানে কূটনৈতিক যুদ্ধের দোড়গোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে, তা দেশের পার্লামেন্টের চার দেওয়ালের মধ্যে উচ্চারিত হয়েছে. সাংসদরা দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আশা করেছিলেন ঋজুতা, আর এবারে সেই ঋজুতা দেখানো হয়েছে. ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, “ইতালীয় প্রশাসনের কাজকর্ম কোন রকমের কূটনৈতিক নিয়মের মধ্যেই আর বাঁধা নেই””.

দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্য কেরালার সমুদ্রতীরের কাছে এই ট্র্যাজেডি ঘটেছিল গত বছরের ১৫ই ফেব্রুয়ারী. ইতালীয় বাণিজ্য পোত এনরিকে লেক্সির দুই প্রহরী মাস্সিমিলিয়ানো লাতোর্রে ও সালভাতোরে জিরোনে এই জাহাজের কাছে আসা এক ভারতীয় মাছ ধরার বোটের উপরে গুলি চালনা করেছিল, তাদের জলদস্যূ ভেবে. ফলে দুজন ভারতীয় জেলের মৃত্যু হয়. ইতালীয় জাহাজটিকে ভারতীয় বন্দর কোচিনে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসা হয় ও জেলেদের মৃত্যুর জন্য দায়ী দুই ইতালীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়.

কিন্তু ভারতে এই নিয়ে বিচার পর্ব শুরুই হয় নি. এই বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট দিল্লী শহরে ইতালীয় রাষ্ট্রদূত দানিয়েল মানচিনির ব্যক্তিগত দায়িত্ব পত্রের বিনিময়ে অভিযুক্তদের অনুমতি দিয়েছিল ইতালি উড়ে যাওয়ার, যাতে তারা দেশের লোকসভা নির্বাচনে অংশ নিতে পারে, তাদের শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, তারা ভারতে ২৪শে মার্চের আগে ফিরে আসতে বাধ্য. এই প্রসঙ্গে সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“কিন্তু সোমবারে রোম থেকে দিল্লীকে সরকারি ভাবে জানানো হয়েছে যে, এই নাবিকরা আর দিল্লী ফিরবে না – তাদের নিজেদের দেশেই বিচার করা হবে. দুই পক্ষের ধারণা এখানেই আলাদা হয়ে যাচ্ছে. দিল্লী থেকে জোর দেওয়া হয়েছে যে, এই নাবিকরা ভারতীয় জলসীমার মধ্যে নিহত হয়েছে. রোম প্রমাণ করতে চায় যে, আন্তর্জাতিক জলসীমায়. এটাই এই স্ক্যান্ডালের কারণ ব্যাখ্যা করে দেয়: ভারতের প্রশাসন মনে করেছে যে, তাদের ঠকানো হয়েছে, একই সময়ে ইতালীয় প্রশাসন দৃঢ় বিশ্বাস করে যে, তাদের কাজই আইন সম্মত হয়েছে”.

দিল্লী ও রোমের মধ্যে সম্পর্ক আরও ঘোরালো হয়েছে এই কারণে যে, এই নাবিকদের নিয়ে ইতিহাস এখন আরও অন্য একটি স্ক্যান্ডালের উপরে চেপে বসেছে, যাতে আবারও ইতালীয় চিহ্ন দেখতে পাওয়া গিয়েছে. ভারতের সিবিআই সংস্থা দেশের বিমানবাহিনীর প্রাক্তন প্রধান শশী ত্যাগী ও ১২জন উচ্চপদস্থ কর্মীর বাড়ীতে, যারা যেমন সামরিক বাহিনীতে, তেমনই চারটি ভারতীয় সামরিক শিল্প সংক্রান্ত কোম্পানীর কর্মী হিসাবে কাজ করেন, তল্লাসী করেছে. একদল কেজো লোকের নামে দুই বছর আগে ইতালীয় ফিনমেক্কানিকার অনুজ কোম্পানী অগাস্টা ওয়েস্ট ল্যান্ডের কাছ থেকে ১২টি হেলিকপ্টার দিল্লীকে পঁচাত্তর লক্ষ ডলারের বিনিময়ে সরবরাহ করার চুক্তি অনুমতি করানোর জন্য ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে. গত বছরের ডিসেম্বর মাসে তিনটি হেলিকপ্টার পাওয়ার পরে ভারত সরকার এই চুক্তি বাতিল করে দিয়েছে, এই কারণে যে, দেশের সিবিআই এই চুক্তির মধ্যে দুর্নীতির চিহ্ন খুঁজে পেয়েছে. আর এই সপ্তাহে এই স্ক্যান্ডালে যারা অভিযুক্ত তাদের হাতে চার্জশীট ধরানো হয়েছে. এখানেই কিছু লোক বলে উঠেছেন “ইতালীয় ষড়যন্ত্র” হয়েছে বলে.

খুবই সম্ভব যে, এই স্ক্যান্ডাল গুলি এখন ভারতের বিরোধী পক্ষ ব্যবহার করবে. তারা অনেকদিন ধরেই সোনিয়া গান্ধীর ইতালীয় বংশোদ্ভূত হওয়া নিয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করে যাচ্ছে, যিনি বর্তমানে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রধান. ২০০৪ সালে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের লোকসভা নির্বাচনে বিজয়ের পরে এই ইতালীয় বংশোদ্ভূত হওয়াই সোনিয়া গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া থেকে নিরস্ত করেছে. তখন সোনিয়া গান্ধী আশা করেছিলেন যে, ভারতীয় জনতা পার্টির পক্ষ থেকে তোলা “ইতালীয় বিষয়” সারা জীবনের জন্যই শেষ হয়ে যাবে. কিন্তু এখন, আট বছর পরে, এই বিষয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে নতুন ধরনের ঝাঁকুনির সামনে এনে ফেলেছে.

ভারতীয় রাজনীতির মাথায় কি সত্যই “ইতালীয় অভিশাপ” রয়েছে?