পাকিস্তানের লাহোর শহরে খ্রীষ্টান ধর্মোপাসনা ক্ষেত্রে ধ্বংস ও তাণ্ডবলীলা আরও একবার দেশের ধর্মীয় গোষ্ঠীদের মধ্যে সম্পর্ককে তীক্ষ্ণ করেছে, তা হয়েছে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্যেই নতুন রকমের পরীক্ষা. আইন কানুনকে কলা দেখিয়ে যা করা হয়েছে বাদামী বাগ এলাকায়, তা আরও একবার স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে যে, পাকিস্তানের প্রধান শত্রু – এটা ভারত বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, এটা এদের ভেতরে থাকা অন্ধকারের যুগ, যা এই দেশের চরমপন্থী ও দায়িত্ব জ্ঞানহীণ ধর্মোন্মাদ লোকজনের হৃদয়ে রয়েছে, এই রকমই মনে করেছেন আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন. তিনি বলেছেন

“এই সপ্তাহে পাকিস্তানের শহর লাহোরের উপকণ্ঠে যা ঘটেছে, তা মনে হতে পারে কারও একটা অসুস্থ হিংসাবৃত্তি সহ মনোভাবের ফল, কেই বা ভাবতে পারে যে, দুজন সাধারন খ্রীষ্টান ও মুসলমান লোকের সাধারন দেখা সাক্ষাতের ব্যাপার এমন সারা দেশ জোড়া প্রতিধ্বনি তোলার মতো হিংসার সূচনা করতে পারে. আর এই ধরনের ঘরোয়া ঝগড়ার স্ফুলিঙ্গ নতুন করে খ্রীষ্টান ধর্মোপাসনা ও বাড়ীঘর ধ্বংসের আগুন ডেকে এনেছে. শুধু পুলিশের হস্তক্ষেপের ফলেই সম্ভব হয়েছে এই বিরোধ ছড়িয়ে যাওয়া আটকানোর ও মানুষ হত্যা রোধ করার. কিন্তু এই নিয়ে এখনই সন্তুষ্ট হওয়ার মতো কিছু নেই: পাকিস্তানের জন্য এক উদ্বেগের ঘন্টাই বেজে উঠেছে”.

এটা মোটেও প্রথম ঘন্টা নয়, ২০০৯ সালের আগষ্ট মাসে খ্রীষ্টান গোষ্ঠীর আট জন সদস্য দেশের উত্তর পূর্বে মুসলমানদের সঙ্গে লড়াইতে প্রাণ দিয়েছিল, গুজরা শহরে. এই সপ্তাহের ইতিহাসের মতই, তখন বিরোধ শুরু হয়েছিল একেবারেই ফাঁকা জায়গায়. চরমপন্থী মানসিকতা সম্পন্ন ইসলাম অনুরাগী ও ঈর্ষা পরায়ণ লোকদের জন্য একটা খবরই যথেষ্ট হয়েছিল বিস্ফোরণের কারণ হওয়ার জন্য, বলা হয়েছিল খ্রীষ্টান সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিরা নাকি কোরানের অপমান করেছে. এই ধরনের ঘটনা পরম্পরা দিয়েই লাহোরের বাদামী বাগে গোলমাল হয়েছিল. প্রসঙ্গতঃ সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“পাকিস্তানের খ্রীষ্টান ও মুসলমানদের সম্পর্কের মধ্যে স্ফুলিঙ্গ বহু বছর ধরেই উড়ে বেড়াচ্ছে. একটা অনুভূতি তৈরী হয়েছে যে, দেশ যেন একটা বারুদের স্তূপের উপরে বসে রয়েছে, যা ফাটতে পারে যে কোন রকমের বোকা ব্যাপার থেকেই, যে কোন ছোট ঘটনা থেকেই. এই প্রবণতা খ্রীষ্টান ও মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা পূর্ণ সম্পর্কের থেকে কমে যাচ্ছে না. বাদামী বাগ এলাকায় ধ্বংস ও তাণ্ডব, কোয়েটা শহরের ট্র্যাজেডির ঠিক পরেই হয়েছে, যেখানে শিয়া মুসলিমদের উপরে আক্রমণের ফলে ৮৮ জন নিহত হয়েছেন. এই কাণ্ডের জন্য দায়িত্ব নিয়েছে পাকিস্তানের সুন্নী গোষ্ঠী “লস্কর-এ- জঙ্গী””.

খ্রীষ্টান ও মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করিয়ে দিয়ে, শিয়াদের বিরুদ্ধে সুন্নীদের লেলিয়ে দিয়ে, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক পাকিস্তানের বিরোধীরা আজ চাইছে এই দেশকে এক মাত্স্যন্যায়ের অন্ধকূপে ঠেলে দিতে, একটা বিশৃঙ্খলা ও আইনের বাইরে পাঠিয়ে দিতে. একই ধরনের ঘটনা পরম্পরা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে “আল- কায়দার” প্ররোচনায় ঐস্লামিক চরমপন্থীদের হাত দিয়ে সমস্ত প্রতিবেশী এলাকায়, অংশতঃ নিকটপ্রাচ্যে, ইরাকে ও সিরিয়াতেও.

নিকটপ্রাচ্য নিয়ে বলতে গিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য স্বীকারোক্তি করেছেন মস্কোর অর্থোডক্স গির্জার প্রধান যাজক ইল্লারিওন. রুশ অর্থোডক্স গির্জার প্রতিনিধি ঘোষণা করেছেন যে, “সেই সমস্ত ঐস্লামিক চরমপন্থী শক্তি, যারা আজ সিরিয়াতে ক্ষমতার লেভে যুদ্ধ করছে, তারা নিজেদের লক্ষ্য হিসাবে এখানে রেখেছে সম্পূর্ণ ভাবে খ্রীষ্টানদের এই এলাকা থেকে মুছে দেওয়ার, তাদের এখান থেকে সম্পূর্ণ ভাবেই বের করে দেওয়ার, তাই আজ সিরিয়ার খ্রীষ্টানদের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশী সঙ্গীণ হয়েছে. সেই সব জায়গায়, যেখানে এই চরমপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছে, সেখানে খ্রীষ্টানরাও বাস্তবে একেবারে মারাই পড়ছেন”.

আজ চরমপন্থীরা এই “ঘৃণার বৃত্তচাপকে” প্রসারিত করতে চেয়েছে দামাস্কাস থেকে লাহোর অবধি. এটা – পাকিস্তানের রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্যেই নতুন পরীক্ষা. বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের এবারে প্রয়োজন পড়বে নিজেদের সত্যিকারের সহিষ্ণুতার উদাহরণ দেওয়ার ও নিজেদের জাতীয় ঐক্যের প্রতি আগ্রহের প্রমাণ দেওয়ার, যা না হলে দেশই একক ও ঐক্যবদ্ধ ভাবে থাকতে পারে না, মনে করেছেন সের্গেই তোমিন.