চিনের সরকার ঘোষণা করেছে শিনহাই – তিব্বত রেলপথ বাড়ানোর ইচ্ছার কথা, কারণ তারা বলছে যে, চিনের অন্তর্ভুক্ত স্বয়ংশাসিত তিব্বতের রাজধানী লাসা থেকে এই এলাকার দ্বিতীয় বড় শহর শিগাজে অবধি যোগাযোগ করা যায়. এই ভাবেই এই রেলপথ নেপাল ও ভারতের সীমান্তের সব থেকে কাছ দিয়ে যাবে.

২৫৩ কিলোমিটার লম্বা এই রেলপথ তৈরীর কাজ এই বছরের শেষে অথবা আগামী বছরের শুরুতেই শেষ হবে. তা তৈরী করতে আনুমানিক দুশো কোটি মার্কিন ডলারের সমান অর্থ খরচ হবে. ভবিষ্যতে মনে করা হয়েছে যে, নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু শিগাজে পর্যন্ত রেলপথ দিয়ে জুড়ে দেওয়া হবে.

মনে হতে পারে যে, তিব্বতে পরিবহন সংক্রান্ত যোগাযোগের ব্যবস্থা বিকাশের খবরে কিছুই বিশেষ উল্লেখ করার মতো নেই. তিব্বত স্বয়ংশাসিত অঞ্চল চিনের বলে ভারত সমেত, - যারা এটা ২০০৩ সালে করেছে, তেমনই আজ বিশ্বের বেশীর ভাগ দেশই স্বীকার করে নিয়েছে.

কিন্তু রেলপথ তৈরীর কাজ দ্রুত শুরু হতে চলেছে এই খবর ভারত ও নেপালে নানারকম ভাবেই শোনা হয়েছে. নেপাল এই ধরনের বড় রাস্তার জন্য একেবারে খুবই আগ্রহী. এই দেশ বহু দিন ধরেই নিজেদের বৈদেশিক অর্থনীতি ও রাজনীতির অভিমুখ চিনের দিকেই করেছে ও নতুন যোগাযোগের পথকে দেখেছে সহযোগিতা প্রসারের পথ হিসাবেই. ভারতে কিন্তু নতুন প্রকল্পের প্রতি সম্পর্ক কম করে হলেও দুই রকমের, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এক দিক থেকে চিন, নিজেদের মধ্যে বহু সংখ্যক সমস্যা থাকা স্বত্ত্বেও ভারতের মূল বৈদেশিক অর্থনীতির সহযোগী দেশ, আর তাই হিমালয় পর্ব্বত পার হয়ে রেলপথ হওয়ার ফলে, তা শুধু স্বাগত জানানোরই কথা নয়, কারণ এই পথ এশিয়ার দুটি মহান রাষ্ট্রকে একে অপরের বাজারে ঢুকতে সাহায্য করবে. কিন্তু এই প্রকল্পের সারার্থ শুধু অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটাও ভারতে খুব ভাল করেই বোঝা গিয়েছে. ভারতের টাইমস অফ ইন্ডিয়া সংবাদপত্রে এই প্রকল্প সম্বন্ধে খবর দিয়ে এক খুবই অতিরঞ্জিত করার মতো কার্টুন প্রকাশ করা হয়েছে. তাতে ভারত ও চিন একে অপরকে উন্মুক্ত হাতের তালু এগিয়ে ধরেছে, কিন্তু দুজনেরই হাতে রয়েছে বিশাল সংখ্যক সমরাস্ত্রের সজ্জা”.

দুই দেশের মধ্যে একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস এত বেশী –বিশেষ করে শেষ অবধি নিষ্পত্তি না হওয়া প্রাক্ হিমালয় এলাকা নিয়ে বিরোধ, যা যে কোন রকমের সীমান্তবর্তী এলাকায় কোন পক্ষের সক্রিয়তা বৃদ্ধির খবরে অবশ্যম্ভাবী ভাবেই অন্য পক্ষের উদ্বেগের সঞ্চার করে. বিশেষ করে যখন সেই সব দেশ নিয়ে কাজ হয়, যেমন, নেপাল, যাদের উপরে প্রভাব বিস্তারের জন্য ভারত ও চিন অনন্তকাল ধরেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে.

সুতরাং, নতুন রেলপথ চিনকে বিশাল পরিমানে মালপত্র পরিবহন করতে দেবে, তা নিয়ে ভারতের সংবাদপত্র যোগ করতে ভোলে নি যে, অনেকটাই এই মালের অংশ হতে পারে ট্যাঙ্ক ও অন্যান্য ভারী সমরাস্ত্র প্রযুক্তি.

আর এটাও ঠিক যে, রেলপথ তৈরী হওয়ার পরে নেপাল আরও বেশী করেই চিনের স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে এই দক্ষিণ এশিয়া এলাকাতে, সেটাও ভারতকে খুব একটা আনন্দিত করছে না বলে মনে করেছেন বরিস ভলখোনস্কি. ভারত এমনিতেই নিজেকে সামুদ্রিক দিক থেকে এক গুচ্ছ বন্দর দিয়ে ঘিরে ধরা বলে অনুভব করছে, যা ভবিষ্যতে সামরিক নৌবহরের বন্দর হতেই পারে আর তৈরীও হয়েছে ভারত মহাসাগরে চিনের সাহায্য দিয়েই. তাই হিমালয় পর্বতেও চিনের পক্ষ থেকে স্ট্র্যাটেজিক ঘাঁটি নির্মাণের খবর মনে তো হয় না যে ভারত ও চিনের মধ্যে ভরসা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়তা করবে – এমনকি অর্থনৈতিক সুবিধার কথার দিকে না তাকিয়েও, যা এই পরিবহন সংক্রান্ত পরিকাঠামো প্রসারিত করার ফলে হতে চলেছে.