জাপানের পারমানবিক বিদ্যুত উত্পাদন কেন্দ্র ফুকুসিমা দূর্ঘটনার দ্বিতীয় বর্ষ দিবসে ভারতের পারমানবিক বিদ্যুত বিরোধী লোকরা নতুন করে রাশিয়ার সাহায্যে নির্মিত কুদানকুলাম পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র চালু করার বিরুদ্ধে মিছিল করেছে. প্রায় ৪০০টি ছোট নৌকা ও বোট নিয়ে তারা এই কেন্দ্রের কাছের সমুদ্রে নেমেছিল ও সমস্ত দোকানই সোমবারে প্রতিবাদ পালনের নামে বন্ধ রাখা হয়েছিল. পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি. তিনি বলেছেন:

“পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র চালু করার বিরুদ্ধে আন্দোলনের হোতা পারমানবিক শক্তির বিরুদ্ধে গণ আন্দোলনের নেতা এস. পি. উদয়কুমার দেশের সরকারকে ও অংশতঃ ভারতীয় পারমানবিক শক্তি কর্পোরেশন লিমিটেডকে সেই নিয়ে অভিযোগ করেছেন যে, এই কেন্দ্র তৈরীর বিষয়ে কাজকর্ম হয়েছে খুবই নিম্ন মানের আর প্রশাসন এই সব কারবারের সত্যিকারের পরিস্থিতি নিয়ে চুপ করে রয়েছে এবং পারমানবিক শক্তি বিরোধী সক্রিয় কর্মীদের বিরুদ্ধে খুবই জঘন্য প্রচার করছে”.

আমরা চেষ্টা করব, এই ব্যাপারটাকে বিশ্লেষণ করে দেখতে. এটা সত্যি যে, দুই বছর আগে জাপানের ফুকুসিমায় যে ট্র্যাজেডি হয়েছে, তা বাস্তবিক ভাবেই ভাবিয়ে তোলে পারমানবিক শক্তি নিরাপত্তার প্রশ্নে, কিন্তু প্রথমতঃ, জাপানের ফুকুসিমা পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরীই হয়েছিল ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় ও দ্বিতীয়তঃ, যাঁরা কুদানকুলাম পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের প্রকল্প তৈরী করেছেন, তাঁরা একাধিকবার ঘোষণা করেছেন যে, এই কেন্দ্র তৈরী করা হয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ও তা এমনকি ফুকুসিমায় দূর্ঘটনার কারণ হওয়ার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের চেয়ে অনেক বেশী শক্তির বিপর্যয়কে রুখে দিতে সক্ষম. তাছাড়া, এখনই প্রমাণিত যে, এই কেন্দ্র চালু করার ফলে এই এলাকার পরিবেশে কোন রকমের দূষণ হবে না এবং অংশতঃ তা এই এলাকার সামুদ্রিক মাছের সংখ্যা বা গুণগত মানের উপরে কোনও প্রভাবই ফেলবে না, ফলে স্থানীয় জেলেদের পরিস্থিতি কোন ভাবেই খারাপ হতে পারে না. এই সব জেলেদের নাম করেই পারমানবিক শক্তি বিরোধ গণ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মীরা নিজেদের কাজ করার চেষ্টা করছে. তবুও তারা এই সব যুক্তির কোনটাই শুনতে চাইছে না.

বোধহয়, এই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মীরা ও তাদের নেতা উদয়কুমার খুব ভাল করেই সমর্থন করে থাকে যে, ভারতের অর্থনীতির শক্তির চাহিদা পূরণের কোন দরকার নেই, আর দুটি রিয়্যাক্টর চালু করার ফলে হাজার মেগাওয়াট করে যে বিদ্যুত তৈরী হবে, তাতেও তারা মনে করেছে যে কোনও দরকার নেই, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই পরিস্থিতিতে লন্ডনের “দ্য গার্ডিয়ান” পত্রিকায় সদ্য প্রকাশিত খবরের দিকে তাকানো যেতে পারে, যেখানে এক প্রবন্ধ সম্বন্ধে বলা হয়েছে, যা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা গ্রীনপিস. এই সংস্থাকে মোটেও মনে করা যায় না যে, তারা পারমানবিক শক্তির প্রসঙ্গে কোন রকমের সহমর্মীতা বোধ করে, তবুও তারা বলেছে যে, ভারতের শক্তি চাহিদা মেটানোর জন্য যে পরিমানে কয়লা ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে বছরে এক লক্ষ ২০ হাজার লোক মারা যাচ্ছেন শ্বাস কষ্ট জনিত রোগে ভুগে, আর প্রায় ২ কোটি লোক নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন হাঁপানি রোগে”.

এই ধরনের মৃত্যু খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না, যতটা সহজে যায় দুর্ঘটনার কারণে জনতার অপমৃত্যু, কিন্তু তা বলে এটাকে কম প্রতিফলন ফেলার মতো বলে মনে করা যায় না. আর এটা কি এত বেশী পড়াশোনা করা লোক উদয়কুমার বুঝতে পারেন না?

একেবারেই অন্য রকমের ভাবনা মাথায় আসে. অনেক দিন ধরেই ভাল করে জানা রয়েছে যে, সবচেয়ে ভাল সব স্লোগান – যেমন পরিবেশ সংরক্ষণের নামে স্লোগান – আসলে প্রায়ই প্রতিযোগিতার বাজারে মুনাফা আদায়ের জন্য একটা বর্মের কাজ করে থাকে. আর তাই একেবারেই আচমকা না হয়ে এই পারমানবিক শক্তি বিরোধীতা আন্দোলনের লোকরা রাশিয়ার লোকদের সহায়তায় তৈরী কুদানকুলাম পারমানবিক বিদ্যুত প্রকল্পকেই বেছে নিতে পেরেছে. তাদের একটাই লক্ষ্য – ভারতের পারমানবিক শক্তির বাজার থেকে রাশিয়াকে ঠেলে বের করে দিয়ে অন্যান্য খেলোয়াড়দের জন্য জায়গা করে দেওয়া.

এই উদয় কুমার নামক ব্যক্তির আত্ম পরিচয়ের দিকে তাকালেই যথেষ্ট হবে, বোঝা যাবে, কার স্বার্থে সে কাজ করছে. মাস্টার্স ও ডক্টরেট ডিগ্রী সে করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে, আর সেই দেশে সে কাজ করেছে ও ছিল ১২ বছর ধরে.

গত বছরের শুরুতেই ভারতের প্রশাসন সরাসরি বলেছে যে, এই সব বেসরকারি সংস্থা, যারা কুদানকুলাম পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে, তারা বাইরের দেশ থেকে অর্থ সাহায্য পাচ্ছে – অংশতঃ, সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর কিছু স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ থেকে. তখন এই উদয়কুমার এই সব দোষারোপ একেবারে সরাসরি অস্বীকার করেছিল. কিন্তু কয়েক দিন আগে আবার নতুন খবর এসেছে, যেখানে সরাসরি নির্দেশ করা হয়েছে যে, তামিলনাডু রাজ্যের পারমানবিক শক্তি বিরোধী আন্দোলন বাইরের থেকে মদত পুষ্ট হচ্ছে. সোমবারে পিটিআই সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে যে, কোন এক অম্বিকা নামের মহিলার অ্যাকাউন্টে লন্ডন থেকে ভারতীয় হিসাবে এক বড় রকমের অর্থ ট্রান্সফার করা হয়েছে, প্রায় তিরিশ লক্ষ টাকা. এই পরিস্থিতির ইঙ্গিতময় বিষয় হল যে, এই অম্বিকা সেই পারমানবিক শক্তি বিরোধী আন্দোলনের এক সক্রিয় কর্মী থাভাসি কুমারের স্ত্রী, যে কুদানকুলাম পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে.

তাহলে এটা দেশের সরকারের বক্তব্যের সমর্থন ছাড়া আর কিছুই নয় বলেই তো মনে হচ্ছে, যা দেশের প্রধানমন্ত্রীও অনেক আগেই বলেছেন, তাই নয় কি?