রাশিয়াতে মাসলেনিত্সা শুরু হয়েছে. এই সাতটি দিন এখানে চলে জনতার সামগ্রিক মেলা, আনন্দোত্সব ও সকলে মিলে খাওয়া দাওয়া. রাশিয়ার অর্থোডক্স গির্জা থেকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এটা পবিত্র উপবাস শুরুর আগে প্রস্তুতির সময়, যা শেষ হয়ে থাকে পবিত্র খ্রীষ্টের রবিবার দিয়ে. এই বছরে ইস্টারের পর্ব ধর্ম বিশ্বাসীরা পালন করবেন ৫ই মে.

এই বছরের মাসলেনিত্সা যথেষ্ট দেরীতে শুরু হয়েছে. এটার কারণ হল যে, তা সম্পূর্ণ ভাবেই ইস্টারের পর্বের দিনটির উপরেই নির্ভর করে. এই বিষয়ে রেডিও কোম্পানী “রেডিও রাশিয়াকে” ব্যাখ্যা করে বলেছেন স্রেতেনস্কি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লেকচারার আর্চ বিশপ ভাদিম লিওনভ, তিনি বলেছেন:

“ইস্টার - এক সময়ের সঙ্গে দিন পাল্টানো হয় এমন উত্সব, তা যেমন চাঁদ, তেমনই সূর্য নির্ভর ক্যালেণ্ডারের উপরে নির্ভর করে তৈরী করা হয়ে থাকে. একটা বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে, এই দিন বের করার. সেই ভাবেই, ইস্টারের সাত সপ্তাহ আগে পবিত্র উপবাস পালন করা হয়ে থাকে, আর তার আগের সপ্তাহ – ঠিক সেই মাসলেনিত্সা পালনের সপ্তাহ. যেমন ইস্টারের দিন সরে যায়, তেমনই সরে যায় মাসলেনিত্সা পালনের দিন গুলিও”.

অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, মাসলেনিত্সা – এটা একটা পৌত্তলিক ধর্মীয় উত্সব. এটাও সত্যি যে, এই উত্সবের খবর প্রাচীন রুশ দেশের সময় থেকেই জানা রয়েছে. বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, খ্রীষ্ট ধর্ম প্রচারিত হওয়ার আগে এই উত্সব পালন করা হতো বসন্তের দিন ও রাতের সময় যে দিন সমান হয়, তা উদ্দেশ্য করে, যা বহু প্রজাতির লোকের জন্যই নতুন বছরের শুরু হওয়ার দিন বলে মনে করা হত, আর তারই সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগ করা ছিল শীত বিদায় ও বসন্তের আগমন নিয়ে উত্সব পালন. অর্থোডক্স গির্জার যাজকরা বরং উল্টো করেই প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, এমনকি এই দিন গুলিতে যে উত্সব পালন করা হয়, সেই উত্সবের নামটিতেও গির্জার ঐতিহ্য রয়েছে. এই কথা উল্লেখ করে পবিত্র আলেকজান্ডার নেভস্কি নামাঙ্কিত গির্জার প্রধান যাজক আর্চ বিশপ ইগর ফোমিন বলেছেন:

“এই সাত দিন (এক সপ্তাহ) ধরেই পবিত্র উপবাসের দিন শুরু হয়ে যায়. খাওয়ার ব্যাপারে আমরা মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকি, আর ধর্মীয় ভাবে – শুরু করি বুধ ও শুক্রবারে বিশেষ ধরনের প্রার্থনা করা. এই সাত দিনের ঐতিহ্যের মধ্যে রয়েছে, তাদের খেতে দেওয়া, যারা নিজেরা আনন্দ করতে পারে না, যারা দরিদ্র, তাদের সহায়তা করা, অসুস্থ লোকদের কাছে যাওয়া. মাসলেনিত্সা শুরুর আগের রবিবারে গসপেল থেকে বিশেষ পাঠ পড়া হয়, যেখানে করুণার কথা বলা হয়েছে, যা মানুষকে স্বর্গ রাজ্যে প্রবেশের অধিকার দেয়. তাই এই দিন গুলিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হল কাছের লোকদের প্রতি মনোযোগ দেওয়া”.

আমাদের কাছে এসে পৌঁছনো জাতীয় ঐতিহ্যের মধ্যে মাসলেনিত্সা উত্সবের প্রত্যেক দিনের আলাদা নাম রয়েছে. তার প্রত্যেকটির জন্যই নিজের নানা রকমের নিয়ম রয়েছে, যাদের অর্থ কিন্তু এক – লোকের বাড়ী যাওয়া ও নিজেদের বাড়ীতে অতিথি আপ্যায়ন করা, আনন্দ করা ও উত্সব করা. বিশেষ দিন হল – রবিবার. তাকে বলা হয়ে থাকে “ক্ষমা করার দিন”. খুব ভোর থেকে গভীর সন্ধ্যা পর্যন্ত নিয়ম রয়েছে যে, সকলের কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করা ও নিজেরাও ক্ষমা করে দেওয়া. আগে এই দিনেই মাসলেনিত্সা উত্সবকে বিদায় জানানো হত. রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে খড়ের কাকতাড়ুয়া তৈরী করা হত ও তাকে হয় সবাই মিলে পোড়ানো অথবা কবর দেওয়া হত. কিন্তু আর্চ বিশপ ইগর ফোমিন বলেছেন এই কাকতাড়ুয়া খ্রীষ্ট ধর্মের সঙ্গে কোন ভাবেই যুক্ত নয়, তিনি যোগ করেছেন:

“এটা স্রেফ একটা পৌত্তলিক অনুষ্ঠান. তা এই কিছুদিন আগেই আবার করে করা শুরু হয়েছে, আর গির্জা এর প্রতি খুবই নেতিবাচক ভাবে দেখে থাকে. কোন কিছু বিদায় দেওয়াটা একটা পাগলামি. আমাদের শীতকে বিদায় দিয়ে বসন্তের আবাহন করার কোন দরকার নেই, বরং ইস্টার উত্সবকে স্বাগত জানানোর প্রয়োজন”.

মাসলেনিত্সা উত্সবের এক প্রধান প্রতীক – রুশী ময়দার পিঠে ব্লিনি বা সরুচাকলি. সমস্ত ভাল গৃহিনীদেরই নিজের এই পিঠে তৈরীর নিজস্ব রকম রয়েছে. আর যারা রান্নাবান্নার কৌশল থেকে অনেক দূরের মানুষ, তাঁদের জন্য সমস্ত জনতার মেলাতেই দেশের বিভিন্ন শহরে সুযোগ থাকবে ব্লিনি খেয়ে দেখার. এই সব মেলা শুরু হয়েছে ১১ই মার্চ থেকে. যে কোনো লোকই নানারকমের প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে পারবে, উত্সবে মিছিল করে হাঁটতে পারবে ও রাস্তার থিয়েটারে অংশ নিতে পারবে.