দুই বছর আগে – ২০১১ সালের ১১ই মার্চ – বিধ্বংসী ভূমিকম্প ও তার পরে জলোচ্ছ্বাসের প্লাবনে জাপানের পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র “ফুকুসিমা – ১” খুবই গুরুতর ভাবে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল. তেজস্ক্রিয় রশ্মির বিকীরণের ভয়ে, নিজেদের বাড়ীঘর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন দেড় লক্ষের বেশী লোক.

“ফুকুসিমা – ১” পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রে দুর্ঘটনার দুই বছর পরে এই রাজ্যের বেশীর ভাগ এলাকাতেই বিকীরণের স্তর উল্লেখযোগ্য রকমের কমে গিয়েছে. কিন্তু এই এলাকাকে বিকীরণ মুক্ত করার কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে. এই দুর্ঘটনার সমস্ত পরিণামকে সম্পূর্ণ ভাবে মুছে দিতে, বিশেষজ্ঞদের মতে আরও কয়েক দশক লেগে যাবে. এই বিপর্যয়ের অব্যবহিত পরেই জাপানের প্রশাসন দেশের পারমানবিক শক্তি বিকাশের পরিকল্পনাকে আবার করে বিবেচনা করে দেখেছিলেন, কিন্তু ২০১২ সালের শেষে নতুন মন্ত্রীসভা ঘোষণা করেছে যে, তারা দেশে ছটি পারমানবিক রিয়্যাক্টর আবার করে চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন. এই মুহূর্তে জাপানের পঞ্চাশটি বড় রিয়্যাক্টরের মধ্যে দুটি মাত্র কাজ করছে. দেশের আভ্যন্তরীণ জ্বালানী শক্তির অভাব থাকায় দেশ এর পরেও পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র ব্যবহার করবে বলেই মনে করে পারমানবিক স্ট্র্যাটেজি জার্নালের প্রধান সম্পাদক ওলেগ দ্ভোইনিকভ বলেছেন:

“পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রকে ব্যবহার করা থেকে বন্ধ করতে হলে – সেটাও সস্তা বিষয় নয়.জাপান ও চিন আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরল গ্যাস আমদানী করা দেশ হয়েছে. এই জ্বালানীর দামও যথেষ্ট বেশী. আমি মনে করি যে, নতুন মন্ত্রীসভা সেই সিদ্ধান্তেই পৌঁছবে যে, তারা দেশের পারমানবিক শক্তি উত্পাদনের বিকাশ ঘটাতে চাইবে. তারা দেশের নাগরিকদের মানসিকতা ও বাস্তবের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে চাইবে, যা জীবন থেকেই অর্থনৈতিক শর্ত সামনে বাড়িয়ে ধরে. শক্তি ছাড়া অর্থনীতির বৃদ্ধি বা বিকাশ হতে পারে না”.

বহু দেশেই জাপানের মন্ত্রীসভার মনোভাব দেখতে পাওয়া গিয়েছে. পারমানবিক শক্তি ব্যবহার নিয়ে বিরত হওয়ার ঘোষণা ও বিকল্প শক্তির উত্পাদনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ঘোষণার পরেই একটা নতুন ধারণার উত্পত্তি হয়েছে, যে এই বিকল্প খুঁজে পাওয়া এত সহজ নয়. এই কথা উল্লেখ করে জ্বালানী ও নিরাপত্তা কেন্দ্রের ডিরেক্টর আন্তন খ্লোপকভ বলেছেন:

“সেই রকমের রাষ্ট্রও রয়েছে, যারা পরিকল্পনা করেছে নতুন রিয়্যাক্টর তৈরী করার. এই প্রবণতা বেশী করেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে এশিয়াতে. পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র “ফুকুসিমা – ১” দূর্ঘটনার পরে দুই বছর বাদ দিয়ে আরও বেশী করে লোকে বুঝতে পারছে যে, সেই ধরনের প্রযুক্তি, যা বিশ্বের জ্বালানী শক্তির ভারসাম্যে সম্পূর্ণ ভাবে পারমানবিক বিদ্যুত উত্পাদনের বদলে ব্যবহার করা যেতে পারে, তা এখনও দুঃখের বিষয় হলেও কোন স্বল্প মেয়াদী অথবা এমনকি মাঝারি পাল্লার সময় সীমার মধ্যেও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না. পারমানবিক শক্তি একটা লক্ষ্যণীয় রকমের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে যা বহু দেশেরই জ্বালানী শক্তি উত্পাদনের ক্ষেত্রে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে”.

বিশ্বে মোট দেশের প্রয়োজনীয় জ্বালানী শক্তি উত্পাদনে পারমানবিক শক্তি ব্যবহারের অনুপাতে নেতৃস্থানীয় জায়গায় রয়েছে ফ্রান্স – শতকরা ৭৪ ভাগ. জার্মানীতে পারমানবিক শক্তি উত্পাদন করা হয়ে থাকে দেশের শক্তি ভারসাম্যের শতকরা ২৮ ভাগ, প্রায় ততটাই করা হয় থাকে জাপানে – শতকরা ২৯ ভাগ. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সূচক শতকরা ২০ ভাগ আর রাশিয়াতে – শতকরা ১৭ ভাগ.

পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে বিরত হওয়া এত তাড়াতাড়ি সম্ভব হবে না. আর মনে তো হয় না যে, এটা একেবারেই করার প্রয়োজন রয়েছে. কিন্তু বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমস্ত রকমের ঝুঁকিকেই একেবারে সব থেকে নীচু করে দেওয়ার দরকার রয়েছে. এটা শুধু সর্বাধুনিক নিরাপত্তার ব্যবস্থার ব্যবহার অবশ্য করাই নয়, বরং বদ্ধ পারমানবিক জ্বালানী শৃঙ্খল প্রযুক্তি ব্যবহার করা শুরু করা.