গত সপ্তাহের শেষে রয়টার সংস্থা ভারতের একটি বৃহত্তম খনিজ তেল পরিশোধন কোম্পানী ম্যাঙ্গালোর রিফাইনারি অ্যান্ড পেট্রো কেমিক্যালস লিমিটেডের কার্যকরী অধ্যক্ষ পি. পি. উপাধ্যায়ের কাছ থেকে পাওয়া খবর হিসাবে জানিয়েছে যে, ভারত আসন্ন ভবিষ্যতে ইরান থেকে খনিজ তেল আমদানী করা বন্ধ করতে পারে. এই কোম্পানী ভারতে ইরানের খনিজ তেল ক্রয় ও আমদানী করা এক অতি বৃহত্ সংস্থা, আর ভারত নিজেই চিনের পরে ইরানের থেকে সর্ব বৃহত্ খনিজ তেল আমদানী কারক দেশ. এই আমদানী করা বন্ধের ইচ্ছার কারণ যে বীমা কোম্পানী গুলি হুমকি দিয়েছে যে, তারা খনিজ তেল পরিশোধনের কাজের আর বীমা করবে না, যদি ইরান থেকে কেনা বন্ধ না করা হয়.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে ইরানের প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারী করাতে ভারত ইতিমধ্যেই গত বছরে ইরান থেকে আমদানীর পরিমান কমিয়েছে শতকরা কুড়ি ভাগ, তার মধ্যে ম্যাঙ্গালোর রিফাইনারি কমিয়েছিল শতকরা ৪০ ভাগ. তা স্বত্ত্বেও ভারত ইরান থেকে প্রতি মাসে প্রায় একশ কোটি ডলার অর্থ মূল্যের খনিজ তেল কিনে চলেছে.

এই প্রসঙ্গে পশ্চিমের দেশ গুলি থেকে, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে ভারতের উপরে যে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে, তা খুবই রকমারি. পশ্চিমের ব্যাঙ্ক গুলি ইরানের বিক্রেতা ও ভারতের ক্রেতাদের মধ্যে পারস্পরিক লেনদেনে অংশ নিতে চায় না. আর ইউরোপীয় সঙ্ঘের বীমা কোম্পানী গুলি সেই সমস্ত ট্যাঙ্কার বীমা করতেই চাইছে না, যেগুলি ইরানের থেকে খনিজ তেল নিয়ে আসছে.

প্রসঙ্গতঃ, আপাততঃ ভারতের পক্ষে সম্ভব হয়েছে কম বেশী এই সব চাপের প্রতিরোধ করার, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ভারত ইরানের সঙ্গে পারস্পরিক হিসাবের ক্ষেত্রে ভারতীয় টাকা ব্যবহার করতে শুরু করেছে. আর তার ফলে ভারতীয় রপ্তানীকারকদের পক্ষে নিজেদের জিনিষ পত্র ইরানে পাঠানো অনেক বেশী বাড়ানো সম্ভব হয়েছে, এই বাজার থেকে পাকিস্তানের রপ্তানীকারকদের অবস্থান সরিয়ে দিয়ে. আর ট্যাঙ্কার গত বছরের গরম কাল থেকে বীমা করছে ইউনাইটেড ইন্ডিয়া ইনসিওরেন্স কোম্পানী”.

আর এই বারে আবার নতুন আঘাত, যা আর খনিজ তেল পরিবহনকে উদ্বিগ্ন করছে না, বরং পরিশোধনের কাজকেই করছে. খুবই কষ্টকর হবে মনে করা যে, ভারতীয় বীমা কোম্পানী গুলি এই পদক্ষেপ নিয়েছে, নিজেদের একান্ত ইচ্ছাতেই, ব্যাপার হল যে, বিশ্বায়নের যুগে বীমা বাজার একটি দেশের সীমানাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, আর ভারতীয় কোম্পানীগুলি নিজেদের ঝুঁকিও আমেরিকা ও ইউরোপের কোম্পানী গুলির কাছেই বীমা করে থাকে. আর তারা, নিজেদের দিক থেকে এই ঝুঁকি বীমা করতে অস্বীকার করেছে, যদি তাতে ইরানের বিরুদ্ধে নেওয়া নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত থাকে.

দেখাই যাচ্ছে যে, ইরানের খনিজ তেল কেনার বিষয়ে ভারতের বিরত হওয়া খুবই শক্তিশালী ভাবে আঘাত হানবে প্রাথমিক ভাবে ইরানের উপরেই, যারা এক মুহূর্তে প্রতি মাসে একশ কোটি ডলার আমদানী হারাবে. এমনকি ভারত নিজেও খুব কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, এই প্রসঙ্গে ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এখানে সেই ভারত থেকে চাল যারা রপ্তানী করে তাদের অবস্থান নির্ভর করছে, কারণ ইরান ভারত থেকে চাল আমদানী করে ভারতীয় টাকার বিনিময়ে খনিজ তেল দেওয়ার কাঠামোর উপরে নির্ভর করেই, যা ইরানকে বাধ্য করেছে, এই টাকা ভারতীয় বাজারেই খরচ করার জন্য. যেই ভারত খনিজ তেল কেনা বন্ধ করবে, ইরান সম্ভবতঃ, চাল কিনতে শুরু করবে সেই পাকিস্তান থেকেই, কারণ এই দেশের সঙ্গে সীমান্ত পার হয়ে বাণিজ্য খুব ভাল করেই তৈরী করা হয়েছে”.

ইরান থেকে খনিজ তেল কেনা কমানোর ফলে প্রায় অবধারিত ভাবেই ভারতের অন্যান্য উত্স থেকে খনিজ তেল কেনাতে খরচ বাড়াবে, যা মনে তো হয় না যে, ভারতের অর্থনীতির উপরে খুব একটা ভাল প্রভাব ফেলবে, যা এমনিতেই বিকাশের গতি ধীরে হওয়ার কারণে বর্তমানে ঝামেলায় রয়েছে.

ভারতের এবারে নিজেদের জন্য একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে যে, তাদের পক্ষে পশ্চিমের নেওয়া ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেওয়ার কোন মানে হয় কি না আর এই পশ্চিমের রাজনীতির পিছনে চলার ফলে নিজেদের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ক্ষতি হবে কি না.

তার ওপরে ভারতের এই এলাকায় প্রধান ভূ- রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী – পাকিস্তান – কোন রকমের নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে সক্রিয়ভাবেই তেহরানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়ে চলেছে. সোমবারে আসিফ আলি জারদারি ইরানে এসেছেন এক সফরে, আর তাঁর প্রধান কাজের তালিকায় রয়েছে গ্যাস পাইপ লাইন নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন. আর তা মোটেও বলা যেতে পারে না যে, পাকিস্তান ইরান প্রশ্নে পশ্চিমের তরফ থেকে কোনও চাপের মুখে এর জন্য পড়ে নি. স্রেফ এই ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থই মুখ্য হয়েছে.