আপনারা পড়ছেন ও শুনছেন আমাদের নিয়মিত অনুষ্ঠান – রাশিয়ার আদ্যোপান্ত. অনুষ্ঠানটি সংকলন করেছেন নিনা রুকাভিশনিকভা এবং স্টুডিওয় ভাষ্যাকার ল্যুদমিলা পাতাকি ও কৌশিক দাস.

এই অনুষ্ঠানে আমরা আপনাদের পাঠানো প্রশ্নাবলীর ভিত্তিতে রাশিয়া সম্পর্কে গল্প করে থাকি.

তাই আমরা আমাদের ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মরিশাসের পাঠক ও শ্রোতাদের অনুোধ করবো নতুন নতুন প্রশ্ন পাঠাবার রাশিয়া সম্পর্কে.

আজ আমরা উত্তর দেব নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলিরঃ

 

প্রাচীণ রাশিয়ায় কোন ধর্ম ছিল? এই প্রশ্নটি আমাদের পাঠিয়েছেন ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের ইসলামপুর থেকে শামসুদ্দিন সাকি আদিবি.

রাশিয়ায় কিভাবে ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া যেতে পারে – জানতে চেয়েছেন বাংলাদেশের ঝাঁকুনিপাড়া গ্রাম থেকে মোহম্মদ মাহফিজুর রহমান.

অতএব শুরু করছি প্রথম প্রশ্নটি দিয়ে – শামসুদ্দিন সাকি আবিদি জানতে চেযেছেনঃ প্রাচীণ রাশিয়ায় কোন ধর্ম ছিল?

প্রাচীণ রুশদেশে লোকে বহু দেবদেবীতে বিশ্বাস করতো. দশম শতাব্দী নাগাদ রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলি হয় খ্রীস্টান নতুবা ইসলাম ধর্ম অবলম্বন করেছিল, যেখানে স্বীকৃত ছিল একমাত্র ভগবান, অনেক দেবদেবী নয়. কিয়েভের শাসনক্ষমতায় দশম শতাব্দীতে আসীন হওয়া দেশশাসক ভ্লাদিমির দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশীদের ধর্মপালনের দিকে নজর রেখেছিলেন. তার সামনে কঠিন প্রশ্ন ছিল – কোন ধর্ম তিনি তার প্রজাদের জন্য গ্রহণ করবেন – খ্রীস্টান না ইসলাম. প্রখ্যাত রুশী ঐতিহাসিক নিকোলাই কারামজিন লিখেছেন, যে মুসলিম স্বর্গের মধুর বর্ণনা ও অপ্সরীদের কাহিনী তাকে মুগ্ধ করেছিল, কিন্তু ইসলাম ধর্মের ছুন্নত ও সুরাপানের উপর নিষেধাজ্ঞা তিনি মেনে নিতে পারেননি. সুতরাং রুশী শাসক ভ্লাদিমির বেছে নিয়েছিলেন খ্রীষ্টধর্ম. খ্রীষ্টধর্ম তিনি গ্রহণ করেছিলেন বাইজান্টেনিয়ার গ্রীকদের থেকে, যাদের ধর্মের নাম ছিল – অর্থোডক্স খ্রীষ্টধর্ম.

আর তার আগে পর্যন্ত হাজার হাজার বছর ধরে রাশিয়ার ভূখন্ডে বসবাসকারী লোকেরা প্রকৃতিকে দেবতা হিসাবে উপাসনা করতো. সূর্য, অগ্নি, বিভিন্ন গাছের কাছে প্রার্থনা করতো. কাঠ ও পাথর খোদাই করে বিভিন্ন দেবদেবতার মূর্তি বানাতো ও তাদের উত্সর্গ করে গৃহপালিত পশুদের বলি দিত.

দেবতা ছিল অসংখ্য আর কখনো কখনো একই দেবতার বহু নাম দেওয়া হতো. তাদের মধ্যে দশম শতাব্দীতে প্রধান ছিল বজ্র ও বিদ্যুতের দেবতা পেরুন. পেরুনের নামে দিব্যি রেখে শান্তির বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করা হতো. কিয়েভে পেরুনের একটা মূর্তি ছিল, যার মাথা ছিল রৌপ্যনির্মিত, গোঁফ স্বর্ণনির্মিত, আর দেহ ছিল কাঠের তৈরী. পেরুনের মূর্তির সামনে সর্বক্ষণ আগুন জ্বলতো. লোকে ঐ মূর্তির সামনে গৃহপালিত পশু নিয়ে এসে বলি দিত, আর যখন সামর্থ্যে কুলাতো না, তখন মাথার চুল বা দাড়ি বিসর্জন দিত.

বিজ্ঞানীরা প্রাচীণ রুশধর্ম ও হিন্দু ধর্মের মধ্যে বহু মিল খুঁজে পেয়েছেন. যেমন হিন্দু মন্দিরেও বাচ্চাদের মুন্ডায়ন করা হয়.

প্রাচীন রাশিয়ায় জনপ্রিয় ছিল গোত্রের দেবতা. সূর্যের নামকরণ করা হত হর্স বা ইয়ারিলো বলে.

আধুনিক হিন্দু মন্দিরে সূর্যের প্রতিকৃতি দেখতে পাওয়া যায় না, তবে সেরকম প্রতিকৃতি আছে উড়িষ্যার কোনারকে সূর্যমন্দিরে. মহা কুম্ভের সময় হিন্দুরা সূর্যের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা নিবেদন করে. আর আধুনিককালে হিন্দু মন্দিরে পুরোহিতরা পুজোর সময় সূর্যের স্তুতি করে.

প্রাচীণ রুশদেশে দেবতা ও প্রর্থনাকারীদের মধ্যে পুরোহিতরাও ছিল. তারা যেসব গাছ বা জলাশয়কে পবিত্র হিসাবে গণ্য করা হত, তার অদূরেই কুটীরে বাস করতো. পুরোহিতরা পশুবলি ভগবানের উদ্ধেশ্যে উত্সর্গ করতো, ও পুরস্কার স্বরুপ তার একাংশ পেত. এখানে বলা দরকার, যে প্রাচীন রুশদেশেও পুরোহিতদের ধর্মবিশ্বাসীরা শ্রদ্ধা করতো, যেমন হিন্দুধর্মে করা হয়. তারা ভবিষ্যতবাণীও করতো.

বহু দেবদেবতায় বিশ্বাস চালু ছিল বহু শতাব্দী ধরে, খ্রীস্টান পাদ্রীরা মানুষের স্মৃতি থেকে তাদের মুছে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করা সত্বেও. বিশেষতঃ লোকেরা দীর্ঘদিন ধরে কুপালা দেবতাকে ছাড়তে চায়নি. ২৪শে জুন রাত্রে লোকে মাঠে ন্যাড়াপোড়া করতো, আগুনের লেলিহান শিখাকে ঘিরে নাচতো ও গাইতো যুবকযুবতীরা ফুলের মুকুট পরে.

যে সব ভালোবাসার গান তারা গাইতো, তার খুব মিল আছে ভারতের পুরীতে জগন্নাথের রথযাত্রার সময় গাওয়া গানের সঙ্গে.

রথযাত্রার মতো উত্সব কিছুকাল আগেও রাশিয়ায় পালন করা হতো. মাত্র ২০০ বছর আগেও রাশিয়ার বিভিন্ন দূরপ্রান্তে কয়েকটি ঠেলাগাড়ি জুড়ে ট্রেন বানানো হতো, আর প্রথম ঠেলাগাড়িটা ঘোড়া টেনে নিয়ে যেত সারা গ্রাম জুড়ে, ঐ গাড়িগুলোতে বসানো থাকতো খড়ের পুতুল আর অনুষ্ঠানের শেষে ওগুলোকে পোড়ানো হতো. এভাবেই লোকে শীতকালকে বিদায় জানাতো.

মাঝেমাঝে প্রত্নতত্ত্ববিদেরা মাটির তলায় বহু হাত বা বহু মস্ককধারী মূর্তি খুঁজে পায়. হিন্দু দেবতা বিষ্ণুরও চার হাত আর দেবী দূর্গা দশভুজা.

খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করার পরে রাশিয়ায় প্রাচীণকালের ধর্ম নিদর্শনের সামান্যই অবশিষ্ট আছে. এখন সযত্নে তাদের সন্ধান ও সংরক্ষণ করা হয় এবং হিন্দু ধর্মের সঙ্গে প্রচুর সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়.

আর এবার আসা যাক আজকালের সমস্যার বিষয়ে. রাশিয়ায় কি করে ফ্ল্যাট ভাড়া করা যায়? – জানতে চেয়েছেন বাংলাদেশের ঝাঁকুনিপাড়া গ্রাম থেকে মোহম্মদ মাহফুজুর রহমান.

বন্ধুরা, এই প্রশ্নটা ইন্টারনেটে পাঠান এবং সাথেসাথে প্রচুর প্রস্তাব পাবেন. দীর্ঘদিন ধরে কার্যরত রিয়েল এস্টেট এজেন্সিগুলির নিজস্ব ডাটা-বেস আছে, তারা সাথেসাথে যথোপযুক্ত প্রস্তাব আপনাদের পাঠাবে বেছে নেওয়ার জন্য.

যদি ফ্ল্যাট আপনার পছন্দ হয়, তাহলে মালিকের সাথে ভাবী ভাড়াটের চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে. চুক্তি স্বাক্ষর করার আগে ফ্ল্যাটের মালিক রিয়ালটরকে ফ্ল্যাটের মালিকানা প্রমাণকারী সব দলিল দেখাতে বাধ্য. রিয়ালটর আপনার সাথে একত্রে সব দলিল দেখেশুনে নেওয়ার পরেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে.

আর ফ্ল্যাটের মালিক ও ভাড়াটে মুখ্য কোন দলিল দেখায়?

রাশিয়ার সব নাগরিকেরই পাসপোর্ট আছে ফোটোসুদ্ধ. পাসপোর্ট দেওয়া হয় নাগরিকদের ১৪ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই.

কিন্তু, বয়সের সাথে সাথে সবাই বদলাতে থাকে...

তাই পাসপোর্ট বদল করতে হয় ২০ ও ৪৫ বছর বয়সে

সামরিক কর্মীদের পাসপোর্ট থাকে না. তার বদলে তাদের কি থাকে?

সৈন্যদের ও অফিসারদের থাকে সামরিক পরিচয় পত্র.

আমি ইন্টারনেটে দেখলাম. মস্কো নগরীতে ফ্ল্যাট ভাড়া করা কোনো সমস্যা নয়. প্রচুর অফার আছে. তার মানে কি অজস্র ফ্ল্যাট ফাঁকা পরে আছে?

প্রথমতঃ, কিছু সৌভাগ্যবান ব্যবসায়ী একাধিক ফ্ল্যাট কিনে ভাড়া দিয়ে বাড়তি রোজগার করে. আমি যতদূর জানি, ভারতেও লোকে তাই করে. তবে লোকে যখন বৃদ্ধ হয়ে যায়, আর নিজের কাজ নিজে করতে পারে না, তখন ছেলেমেয়ে বা নাতিপুতিদের কাছে গিয়ে থাকে ও তাদের ফ্ল্যাট ফাঁকা হয়ে যায়. ঐ ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে বাড়তি অর্থ কামাই করা যায় পরিবারের জন্য.

রাশিয়ার আদ্যোপান্ত অনুষ্ঠানটি এখানেই শেষ করছি. রাশিয়া সম্পর্কে আমরা আপনাদের কাছ থেকে নতুন নতুন প্রশ্নের অপেক্ষায় থাকবো. ইন্টারনেটে আমাদের ঠিকানাঃ letters a ruvr.ru অথবা আপনারা যেতে পারেন আমাদের সাইটে – Bengali.ruvr.ru