মিশরের সমাজ খেপে উঠেছে, কাতার রাষ্ট্র না কি পিরামিড ভাড়া নিতে চেয়েছে. এমনিতেই মিশরের লোকরা নিজেদের ইতিহাসের এক খণ্ডও বিদেশীদের কবলে যেতে দিতে চায় না তার ওপরে আবার এই কদিন আগেও মরুভূমির অসভ্য বেদুইন কাতারের লোকরা ইতিহাস ভাড়া করতে চায় তেল বেচা পয়সায়. একবার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হোসনি মুবারকের সময়েও সৌদি আরবের কোম্পানী এসেছিল এই দেশের এক প্রাচীনতম বিপনি “ওমর এফ্ফেন্দি” কিনতে, যা দেশের নেতা ভেবেছিলেন একটা স্রেফ পুরনো আর অচল দোকান বলে. তখন দেশের সমাজ এই রকমই খেপে উঠেছিল, আর এখন প্রশাসন বদলের পরে বাধ্য করেছে সৌদি কোম্পানী ও সরকারের মধ্যে চুক্তিকে আদালতের রায় দিয়ে বাতিল করার.

আজ মিছিল ও গুলি চালনায় দ্বন্দ্ব বিদীর্ণ ইজিপ্টে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিই আলাদা, তাই এবারে পরিণামও হতে পারে অন্য রকমের, এই কথা রেডিও রাশিয়াকে উল্লেখ করে ইজিপ্টের “আল- ফজর” খবরের কাগজের সাংবাদিক আহমেদ হাসান বলেছেন:

“আর্থিক সঙ্কট, দুর্নীতি, বেকারত্ব এমন ভয়ঙ্কর আকার নিয়েছে যে, এই ভাইদের সরকার চেষ্টা করছে যে কোন রকমের অর্থ পাওয়ার, একবার অর্থ যোগাড় করে কোন রকমে এই কানা গলি থেকে সাময়িক ভাবে হলেও বের হওয়ার. এমনকি তারা সেই সব ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও শান্তি স্থাপনে আগ্রহী, যারা জেলে রয়েছে বড় তহবিল তছরুপের অভিযোগে. নিজের প্রাক্ নির্বাচনী পরিকল্পনাতে মুর্সি আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, দেশকে এই নিঃস্ব ও দরিদ্র অবস্থায় থাকার চক্রবূহ্য থেকে বের করে আনবেন. আপাততঃ – এটা হয় নি.

এখন ভাইয়েরা এক কঠিনতম সমস্যার মুখে পড়েছে: কি করে দেশের আট কোটি মানুষকে রুটির যোগান দেওয়া হবে, কি করে আর্থিক ও বিনিয়োগের সমস্যা থেকে বের হওয়া যাবে. সুয়েজ প্রণালী বরাবর শহর গুলি বর্তমানে একটা কঠোর মন্দা পরিস্থিতিতে রয়েছে, দেশের অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানই কাজ করছে শুধু কোন রকমে বেঁচে থাকার জন্য. আমরা এটাকে বলে থাকি ঐস্লামিক পশ্চাদপসরণ, যা হয়ে থাকে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম প্রধান দেশ গুলিতে, যেখানে লোকে বহুদিন হল লেখাপড়া ও স্বাস্থ্য চর্চা বন্ধ করেছে. শুধু হরতাল, ফাঁকি বাজী ও বাজে কাজে দিন কাটাচ্ছে. কারণ এই ভাইয়েরা মন্ত্রীসভায় এসেছে রাস্তার হরতাল থেকে, জেল আর গোপন ডেরা থেকেই. তাদের দেশ চালানোর কোন অভিজ্ঞতাই নেই. যে অভিজ্ঞতা আছে, তা হল অন্য ধর্মের বা তাদের মতে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার. তাদের শুধু ক্ষমতার লোভ আছে আর সেই সব লোকের সাথে অনন্ত শত্রুতা, যারা এই ভাইদের দেখানো পথ থেকে সন্ত্রস্ত হয়ে সরে দাঁড়ায়”.

যাই হোক না কেন বিদেশীদের জন্য লোহিত সাগরের পর্যটন কেন্দ্র গুলি কেউই বন্ধ করতে যাচ্ছে না, যদিও সেখানে মুসলমান আইনের কেউই ধার ধারে না. সকলেই বোঝে এখানে কাঁচা অর্থ রয়েছে, যা সারা বিশ্বের দরিদ্র দেশ গুলির মতো, ইজিপ্টের জন্যও খুবই প্রয়োজনীয়. পিরামিড গুলিও অর্থ যোগান দিয়ে থাকে, যদিও এটা এখন রাজধানীতে জরুরী অবস্থার কারণে খুবই সীমিত হয়েছে. সুতরাং যদি পিরামিড গুলিকে শুধু আয়ের উত্স হিসাবেই দেখা হয়, তবে কেন এই আয় বাড়ানো যেতে পারে না?

বিশ্বায়নের যুগে এই ধরনের ভাড়া বা বিক্রী সংক্রান্ত চুক্তি, যা বিক্রী অযোগ্য জিনিষ নিয়ে হতে পারে, তা আর বিস্ময়কর মনে হয় না. লন্ডনের সবচেয়ে বিখ্যাত বিপনি “হ্যারডস্”, যা এক সময়ে ব্রিটেনের সমৃদ্ধির প্রতীক ছিল, তাও তো ইজিপ্টের ব্যবসায়ী মুহামেদ আল- ফায়েদকে বেচে দেওয়া হয়েছিল, যার ছেলেও ব্রিটেনের লেডি ডায়নাকে এই বিশ্বায়নের অংশ করে দিয়েছিল. এই “হ্যারডস্” দোকানই কাতার রাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের কাছে দেড়শো কোটি পাউন্ডের বিনিময়ে বিক্রী করে দেওয়া হয়েছে, তাহলে সেই কাতারের ব্যবসায়ীদের কাছেই কেন পিরামিড ভাড়ায় দেওয়া যাবে না, তার থেকে সহজে খরচ যোগ্য অর্থ যোগাড় করা যাবে না – এই সব ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের যুগে?

তাছাড়া, বর্তমানের পরিস্থিতিতে এর মালিক বদল হলে হয়তো এই ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ গুলিও নিরাপদ থাকতে পারে, বলা তো যায় না কি রয়েছে এই মুসলমানদের নির্বোধ মগজের খুলিতে, তারা হয়তো বলে বসবে “হজরত মহম্মদের আগে পৃথিবীর ইতিহাসের কোন চিহ্নই থাকতে দেওয়া যাবে না”, যেমন করেছিল আফগানিস্তানের তালিবরা বামিয়ানের বুদ্ধ মূর্তি ধ্বংস করে – তালিব ও ইজিপ্টের সালাফিতদের মধ্যে কোন পার্থক্য তো এই বিষয়ে নেই. তারা ইতিমধ্যেই বলেছে স্ফিঙ্ক্স হল বিশ্বের “পাপের সৃষ্টির” মধ্যে সবচেয়ে পুরনো, আর তা ধ্বংস করা হবে. এটাকে মনে হতে পারে ফালতু কথা, কিন্তু একসময়ে বামিয়ানের বুদ্ধ দেখতে সারা বিশ্ব থেকেই ট্যুরিস্টরা যেতেন, আজ সেই জায়গা শূণ্য.

বহু প্রাচীন কাল থেকে একটা প্রচলিত বচন রয়েছে: “স্ফিঙ্ক্স মিশর রক্ষা করবে”, এখন সময় এসেছে এই স্ফিঙ্ক্স রক্ষা করার.