আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনীর মিশন শেষ হওয়ার পরে অর্থাত্ ২০১৪ সালের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত্ হবে সেই দেশে প্রায় ১৪ হাজার সামরিক কর্মী রেখে দেওয়ার. এই প্রসঙ্গে মার্কিন কংগ্রেসের সেনেটে এক শুনানীর সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সারিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কম্যান্ডের প্রধান জেমস ম্যাট্টিস ঘোষণা করেছেন. ম্যাট্টিস আরও উল্লেখ করেছেন যে, ন্যাটো জোটের অন্যান্য দেশ সম্বন্ধে যা বলা ছেতে পারে, তা হল এই জোটের নেতৃত্ব আশ্বাস দিয়েছে যে তারা আমেরিকার বাহিনীর অর্ধেক সেনাদল পাঠাবে. সব মিলিয়ে হচ্ছে প্রায় বিশ হাজার সৈন্য.

আফগানিস্তানে নিরাপত্তা রক্ষা করার কাজ বাস্তবে হওয়ার জন্য কি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনীর এই পরিমানে সেনা যথেষ্ট হবে? মন্তব্য করেছেন এই প্রসঙ্গে আমাদের সমীক্ষক পিওতর গনচারভ.

খুবই জানা সত্য: সমস্ত কিছুই তুলনা করলে বোঝা যায়. আধুনিক আফগানিস্তানের ইতিহাসে ইতিমধ্যেই এই দেশ থেকে এক বৃহত্ শক্তির নিজেদের সেনা প্রত্যাহারের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে. “শুরাভি” বলে স্থানীয় ভাষায় ডাকা সোভিয়েত সেনা বাহিনীরা অন্তত নিজেদের চলে যাওয়ার পরে আফগানিস্তানের সামরিক বাহিনীকে এই এলাকায় রেখে গিয়েছিল এক অতুলনীয় বাহিনী হিসাবেই, যাদের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব, পেশাদারী প্রশিক্ষণ ও মতৈক্যের বিষয়ে কোন সন্দেহই ছিল না. তখন নাজিবুল্লার সামরিক বাহিনী খুব সহজেই মোজাহেদ জঙ্গীদের সমস্ত দিকে হারাতে সক্ষম হয়েছিল. কিন্তু তা স্বত্ত্বেও নাজিবুল্লার প্রশাসন দীর্ঘস্থায়ী হয় নি. মস্কোতে এই প্রসঙ্গে একক মত তৈরী হয়েছিল – কেন? কিন্তু আমরা আফগানিস্তানের সামরিক বিশেষজ্ঞ ও সেই সময়ের ঘটনার এক অংশীদারকেই এই বিষয়ে মত প্রকাশ করতে বলব, তিনি হলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবদুল হাদি খালেদ, তিনি বলেছেন:

“আজকের সামরিক বাহিনী একই রকম ভাবে সংখ্যার দিক থেকে বড়, কিন্তু নাজিবুল্লার সময়ের থেকে তারা প্রযুক্তির বিষয়ে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে. সেই সামরিক বাহিনী, অবশ্যই, ছিল অনেক বেশী শক্তিশালী, তা যেমন প্রযুক্তির দিক থেকে, তেমনই রাজনৈতিক ভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকার বিষয়ে. কিন্তু মস্কো সোভিয়েত দেশ ভেঙে দেওয়ার আগেই শুরু করেছিল “জামিয়াত ইসলামি” ও “পর্যবেক্ষক সভার” (মোজাহেদ গোষ্ঠীর)সঙ্গে যোগাযোগের ও তারা নাজিবুল্লার প্রশাসনকে রেখে দিয়েছিল কোন রকমের সমর্থন ছাড়াই. এটাই হয়েছিল নাজিবুল্লা প্রশাসনের পতনের প্রধান কারণ”.

অন্য কথায় বলতে হলে, আফগানিস্তানের তত্কালীন সেনা বাহিনী শক্তিশালী ও উদ্যোগী হয়ে দেশের উত্তর দিককে বাস্তবে সমস্ত সশস্ত্র বাহিনী সমেত কেন্দ্রীয় সরকারের আওতায় আনলেও আর সমস্ত সশস্ত্র বিরোধী পক্ষকে পরাজিত করলেও এবং মোজাহেদ গোষ্ঠীদের জালালাবাদ, কাবুল, কান্দাহার, গেরাট থেকে নিশ্চিহ্ণ করে দিলেও, এই সব জায়গায় অনেকেই কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হলেও, শুধুমাত্র দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলের কারণে এবং আভ্যন্তরীণ বিবাদ বৃদ্ধি হওয়ার ফলে প্রশাসনকে টিকিয়ে রাখতে পারে নি. সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সমস্ত বিজয় এক কথায় নস্যাত করা হয়েছিল. আজও সেই বিপদই রয়েছে.

জেনারেল খালেদ সেই ধারণারই পক্ষ নিয়েছেন – যা মস্কোর বিশেষজ্ঞ মহলে বেশী করেই রয়েছে. একানব্বই সালের পরে আফগানিস্তানের ঘটনা পরম্পরা যদি অন্য রকম হত, তবে কাবুলের প্রশাসন খুবই সম্ভবতঃ টিকে যেতে পারত, আর কোন রকমের একটা পরিবর্তন আনা হলেও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ক্ষমতা বজায় থাকত এবং দেশের সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও নিরাপত্তার কাঠামো অটুট থাকত, আর তাহলে আফগানিস্তান সেই গৃহযুদ্ধ এড়িয়ে যেতে পারত, তা যেমন আভ্যন্তরীণ কারণে তেমনই দেশের বাইরের কারণেও, যা শুরু হয়েছিল ক্ষমতায় সেই মোজাহেদ গোষ্ঠীর আসার পর থেকেই.

জেনারেল আবদুল হাদি মনে করেছেন যে নাজিবুল্লার সময়ের ঘটনাবলীর সঙ্গে বর্তমানের ঘটনা একেবারেই এক রকমের মিল রয়েছে – তা যেমন দেশের ভেতরের কারণে, তেমনই বাইরের কারণেও. তিনি যোগ করেছেন:

“পাকিস্তান নিজেদের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে, তারা একই রকমের কারবার করবার মন নিয়েছে. ইরান, আমেরিকার লোকদের এই এলাকায় থাকার বিরুদ্ধাচরণ করে দেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনেরও বিরুদ্ধাচরণ করছে. এই দুই দেশই সশস্ত্র বিরুদ্ধ পক্ষকে জোরালো সমর্থন করছে. ব্রিটেন, আমরা যেমন দেখতেই পাচ্ছি যে, পাকিস্তানকে সমর্থন করছে. সৌদি আরবও তুরস্কের মতই পাকিস্তানের পক্ষে. আমার ভয় হচ্ছে যে, আমাদের পিঠের পেছনে আবারও রাজনৈতিক চোরা কারবার করা হচ্ছে. যদি এটা তাই হয়, তবে বর্তমানের রাজনৈতিক প্রশাসন, তাদের সমস্ত সম্ভাবনা স্বত্ত্বেও, যদিও তাদের বিরোধী পক্ষ সামরিক দিক থেকে যথেষ্ট দুর্বল ও দেশের রাস্তার চোখে নিজেদের খুবই জঘন্য ভাবে প্রতিফলিত করেছে, তবুও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না”.

১৯৯১ সালের শেষ দিকের পরিস্থিতির সঙ্গে ২০১৩ সালের শুরুর দিকের পরিস্থিতির খুবই সাযুজ্য রয়েছে, কিন্তু তাও কিছু তফাত দেখতে পাওয়া গিয়েছে. এখন, তখনকার মতই, প্রশাসনের স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করছে দেশের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির উপরে. কিন্তু বর্তমানের আফগানিস্তান তখনকার আফগানিস্তানের চেয়ে অনেক বেশী করেই হয়েছে জোড়াতালি দেওয়া লেপের মতো. তখনকার মতই, এক বৃহত্ রাষ্ট্র যে প্রশাসনের জোট সঙ্গী, বোধহয়, তার আফগানিস্তানের ভবিষ্যত নিয়ে কোনও পূর্বানুমান নেই. ফলে বর্তমানের পরিস্থিতি “তখনের” থেকে আলাদা ভাবে শুধু এখন বেশী করেই প্রতিবেশীদের শুভেচ্ছার উপরে নির্ভর করছে – মুখ্যতঃ ইসলামাবাদের উপরে.

0সুতরাং এখন যে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাচ্ছে, তা হল যে বিশ হাজার পশ্চিমের সেনা ২০১৪ সালের পরে যথেষ্ট হতে পারে, যদি এই পরিস্থিতির প্রধান গতি প্রকৃতি কাবুলের মতামতকে বাধ্যতা মূলক ভাবে গণ্য করে তবে স্থির করা হয়. সেই ক্ষেত্রে তালিবদেরও কাবুলের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসানো সম্ভব হতে পারে, আর “চল্লিশটা ছেঁড়া টুকরো” জুড়ে পরিণামে একটা চাদরই বোনা সম্ভব হবে.