মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবারও পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলে উঠেছে – তাদেরই দক্ষিণ এশিয়ার সহযোগীর সাথে – এবারেও চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে. ওয়াশিংটন ইসলামাবাদকে তেহরানের সঙ্গে যে কোন রকমের কারবারে যেতে নিষেধ করেছে, বলেছে কড়া আর্থিক নিষেধাজ্ঞা নেবে. এই ঘোষণায় কন্ঠস্বর দিয়েছেন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য সচিব প্যাট্রিক ভেনট্রেল্ল, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির সফল ইরান সফরের অব্যবহিত পরেই.

ওয়াশিংটনের বিরক্তির উদ্রেক করেছে ইরান থেকে পাকিস্তান অবধি গ্যাস পাইপ লাইন নির্মাণের বিষয়ে সমঝোতা. ইরানে এই পাইপ লাইন বাস্তবে প্রায় সম্পূর্ণ ভাবেই তৈরী করা হয়ে গিয়েছে, আগামী দুই বছরের মধ্যে তা পাকিস্তানের সীমান্ত থেকে দেশের ভিতরে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়ে যাবে. এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে ২০০৫ সাল থেকে. তা যেমন অর্থনৈতিক কারণে স্থগিত হয়েছে, তেমনই রাজনৈতিক প্রবণতা থেকেও. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল ইসলামাবাদের সঙ্গে তেহরানের জ্বালানী বিষয়ক সহযোগিতা আটকে রাখার সহযোগীর উপরে খুবই কঠোর ভাবে রাজনৈতিক চাপ দিয়ে ও ব্ল্যাকমেল করে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সেনা বাহিনীর প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্য করবে না এমন হুমকি দিয়েছিল.

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের তোয়াক্কা না করে পাকিস্তান ইরানের সহায়তায় নিজেদের শক্তি সংক্রান্ত নিরাপত্তার সমস্যা সমাধান করতে তৈরী হয়েছে. এই ধরনের ঝোঁক তাদের রাজনীতিতে তৈরী হয়েছে ইসলামাবাদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ থেকে, যা তাদের মহা সমুদ্র পারের সহযোগীর বিরুদ্ধে হয়েছে. ইসলামাবাদ ওয়াশিংটনকে ক্ষমা করতে পারছে না যে, আমেরিকার বিশেষ বাহিনী ওসামা বেন লাদেনকে তাদের দেশের মধ্যেই হত্যা করেছে, না জানিয়ে. আরও বিরক্তির কারণ হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের যেসব প্রশ্নে বিরোধ রয়েছে, সেই গুলিতে আফগানিস্তানকে সমর্থন করাতে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞার ভয়, যা ইরানের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য পাকিস্তানকে দেখানো হয়েছে, তা এই ত্রিভুজ সম্পর্কের সব মিলিয়ে পরিস্থিতির মধ্যেই খাপ খেয়ে গিয়েছে, এই রকম মনে করে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর প্রাচ্য অনুসন্ধান ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ তাতিয়ানা শাউমিয়ান বলেছেন:

“পাকিস্তান – আমেরিকার সম্পর্ক খারাপ হয়েছে. আগে মনে করা হত যে, দক্ষিণ এশিয়াতে পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক ও রাজনৈতিক সহযোগী দেশ. তখন ভারতের সঙ্গেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সহজ ছিল না. এখন এই পরিস্থিতি অতীতে চলে যাচ্ছে. তার ওপরে যখন পাকিস্তান এই পাইপ লাইন আমেরিকা – ইরানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুবই তীক্ষ্ণ এক পর্যায়ে করতে চাইছে, যা হয়েছে ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে এই সব বাস্তব বিষয়ই একত্রিত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞার হুমকি হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে”.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই কানাডা পাকিস্তানের কাছ থেকে ইরানের সঙ্গে গ্যাস পাইপ লাইন তৈরী বন্ধের দাবী করেছে. তার উত্তরে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য সচিব মোয়াজ্জেম খান বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন যে, ইসলামাবাদ পশ্চিমের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না. তিনি ঘোষণা করেছেন যে, জাতীয় স্বার্থেই ইরানের গ্যাস পাইপ লাইনের বিস্তার পাকিস্তানেও করা হবে.

ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন বিরোধ নিয়ে নয়া দিল্লী ও বেজিংয়ে মনোযোগ দিয়েই দেখা হচ্ছে. ভারত নিজেদের একসারি প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক বাধা থাকা স্বত্ত্বেও এই গ্যাস পাইপ লাইন নিজেদের এলাকা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থেকে বিরত হয় নি. এই বিষয়ে মনে করিয়ে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ তাতিয়ানা শাউমিয়ান ও পরিস্থিতি কি ভাবে বদলাতে চলেছে, তা নিয়ে নিজের পূর্বাভাস দিয়েছেন:

“যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নেয়, তবে পরিস্থিতি আরও বেশী করেই জটিল হতে পারে. ভারতীয়রা ইরান থেকে গ্যাস পাওয়া যাবে বলে মনে করেছে. এই বাজী ধরা হয়েছে খুবই গুরুতর বিষয় গুলিকে নিয়ে – ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনার উত্তরে পশ্চিমের নিষেধাজ্ঞার ফলপ্রসূতা, ইরান থেকে কার্বন যৌগের সরবরাহ, পাইপ লাইনের নির্মাণ ইত্যাদি”.

0মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা নেয়, তবে তা চিনের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে স্পর্শ করতে পারে. কিছুদিন আগে তারা পাকিস্তানের বন্দর গোয়াদারের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে. আর সেখানে পাকিস্তান ও ইরান ইরানের খনিজ তেল পরিশোধনের কারখানা তৈরী করবে ঠিক করেছে. সেই কারখানার উদ্বৃত্ত উত্পাদন মনে করা হয়েছে যে, চিন কিনে নেবে. যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সত্যই নিষেধাজ্ঞা গ্রহণ করে, - আর ব্যাপারটা এখন সেই দিকেই গড়াচ্ছে, তবে এই জ্বালানী প্রকল্প খুবই গুরুতর ভাবে আটকে যেতে পারে. আর এটা গোয়াদার বন্দরের কাজেই অনিবার্য ভাবে প্রভাব ফেলবে.