আপনারা পড়ছেন ও শুনছেন আমাদের মাসিক অনুষ্ঠান – ‘রাশিয়া-ভারতীয় উপমহাদেশঃ’ ‘ঘটনাবলী, মানুষ, স্মরণীয় তারিখগুলি’. অতীতের কথা জানা না থাকলে বর্তমানের বিশ্লেষন করা ও ভবিষ্যত নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা সম্ভব নয়. আজ আমরা মার্চ মাসের পাতা খুলবো, স্মরণ করবো সেই সব উত্সবের, ঘটনাবলীর ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের, যারা রাশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের পারস্পরিক সম্পর্কের ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছেন.

কৃতজ্ঞ ভারতবর্ষ কোনোদিন ভুলবে না রাশিয়ার চিকিত্সক ভ্লাদিমির হাফকিনকে, যিনি বহু লক্ষ জীবন বাঁচিয়েছেন. তাঁর সম্মানে মুম্বাইয়ে নামাঙ্কিত ব্যাকটেরিয়ালজিক্যাল ইনস্টিটিউট – হাফকিন ইনস্টিটিউট. ভ্লাদিমির হাফকিন উদ্ভাবন করেছিলেন ও সবার আগে নিজের শরীরে পরখ করে দেখেছিলেন কলেরা ও প্লেগ রোগের টীকা. ঐ রুশী চিকিত্সক ভারতে গিয়েছিলেন ১৮৯২ সালে. ২২ বছর ধরে তিনি ভারতীয় চিকিত্সকদের একটি ছোট দল নিয়ে ভারত ও বর্তমান পাকিস্তানের বহু অঞ্চলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে কলেরা ও প্লেগ রোগের টীকা দিয়েছিলেন. মাঝে মাঝেই গ্রামের বাসিন্দারা শুধু তখনই টীকা নিতে আসতো, যখন জানতে পারতো, যে ডাক্তার ইংরেজ নন, রুশী. জীবত্কালে তাকে মহাত্মা বলে ডাকা হত. ভ্লাদিমির হাফকিনের জন্ম হয়েছিল ১৮৬০ সালের ১৫ই মার্চ.

“ক্রিস্টোফার কলম্বাস যখন আমেরিকার তীরে পৌঁছেছিলেন, তখন না ছিল সংবাদপত্র, না ছিল বেতার বা দূরদর্শন. কিন্তু যদি থাকতো, তবুও তারা গোটা দুনিয়াকে সেভাবে কাঁপিয়ে দিতে পারতো না, যেরকম পেরেছিল প্রথম মহাকাশযাত্রী ইউরি গাগারিনের মহাকাশ অভিযান”. উপরোক্ত উদ্ধৃতির জনক প্রখ্যাত ভারতীয় চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার হাজি আহমদ আব্বাস. তিনি ঐ উদ্ধৃতি লিখেছিলেন ইউরি গাগরিনের সাথে সাক্ষাতের উপরে লেখা ‘আমরা এখনো নক্ষত্রে পৌঁছাতে পারিনি’ নামক বইয়ে. ৯ই মার্চ গাগারিনের ৭৯-বছর বয়স পূর্ণ হতে পারতো.

২৩শে মার্চ পাকিস্তান দিবস পালিত হয়. রাশিয়া বরাবর উপনিবেশের অন্তর্ভূক্ত দেশগুলির সমব্যাথী ছিল এবং স্বাধীনতার জন্য তাদের সংগ্রামে সহায়তা করেছে ও তাদের অর্থনীতি বেড়ে ওঠার পেছনে মদত যুগিয়েছে. পাকিস্তানকে এরকম সাহায্য যোগানো হয়েছিল ভারীশিল্প, ইস্পাতশিল্প ও বিদ্যুতশিল্পের ক্ষেত্রে. এই মুহুর্তে রাশিয়া ও পাকিস্তানের মধ্যে আর্থ-বাণিজ্যিক সম্পর্ক আবার চনমনে হয়ে উঠছে. গত বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি খারের মস্কো সফরকালে আমাদের দুই দেশের সহযোগিতার অগ্রগণ্য ক্ষেত্রগুলি বেছে নেওয়া হয়েছে – বিদ্যুত, ইস্পাতশিল্প, পরিবহন, ব্যাঙ্কিং ও বহুমুখী আঞ্চলিক সহযোগিতা. ‘কাসা-১০০০’ প্রকল্পের রুপায়নে পাকিস্তান রাশিয়ার শরিক. এই প্রকল্প অনুযায়ী হাইভোল্টেজ লাইন দিয়ে কির্গিজিয়া ও তাজিকিস্তান থেকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে বিদ্যুত সরবরাহ করা হবে. ‘তাপি’ নামক গ্যাসের পাইপলাইন, যা তুর্কমেনিয়া থেকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান হয়ে ভারত পর্যন্ত যাবে, তা বসানোর কাজেও রাশিয়া সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণে রাজি হয়েছে.

মার্চ মাসের কয়েকটি তারিখ বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত. ১৭ই মার্চ – বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মদিন আর ২৬শে মার্চ – স্বাধীনতা দিবস. সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল অন্যতম প্রথম দেশ, যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্র রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল. ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান মস্কো সফর করেছিলেন. ঐ সফরকালে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর জন্য একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ দলিল স্বাক্ষর করা হয়েছিল. চলতি বছরের জানুয়ারী মাসে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মস্কো সফরকালে আমাদের দুই দেশের বিভিন্ন সরকারী দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সম্মতিপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে. তার মধ্যে আছে রাশিয়া ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যৌথ সংগ্রামের স্মারকনামা. আইন, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও কৃষিশিল্পের ক্ষেত্রেও স্মারকনামা স্বাক্ষর করা হয়েছে. রুপপুরে পারমানবিক বিদ্যুতকেন্দ্র গড়ার জন্য রাশিয়া বাংলাদেশকে রাষ্ট্রীয় ঋণ দেবে. ঋণের অঙ্ক হবে ৫০ কোটি ডলার. ঢাকা থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত রুপপুরে বাংলাদেশ প্রথম পারমানবিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ করার পরিকল্পনা করেছে. সেখানে দুটো এনার্জিব্লক বসানোর কথা, যেগুলি ফুকুসিমা পরবর্তী নিরাপত্তার সব দাবী পূরণ করবে. তাছাড়াও বাংলাদেশে পারমানবিক শক্তি সম্পর্কিত তথ্যদপ্তরও চালু করা হবে. এছাড়াও রাশিয়া অস্ত্রশস্ত্রের খাতে বাংলাদেশের জন্য ১০০ কোটি ডলার অঙ্কের ঋণ মঞ্জুর করেছে.