হাঙ্গরের দলের ভাগ্য আফ্রিকার কালো গণ্ডারের মতোই হতে চলেছে. তাদের প্রায় সম্পূর্ণ ভাবেই ধ্বংস করে ফেলেছে চোরা শিকারিরা. আজ গণ্ডারের দল বেঁচে রয়েছে আফ্রিকার মাত্র কয়েকটি দেশের জাতীয় বন্য প্রাণী উদ্যান ও সংরক্ষিত অরণ্যেই. কয়েক বছর পরে সম্ভবতঃ কয়েক ধরনের হাঙ্গর আমরা দেখতে পাবো শুধু সামুদ্রিক মাছের জন্য তৈরী বিশেষ ধরনের অ্যাকোরিয়ামেই. প্রত্যেক বছরে চোরা শিকারিরা এই ধরনের মাছ হত্যা করছে বেশ কয়েক লক্ষ করেই. এই ঘটনার জন্য দোষী চিন ও অন্যান্য এশিয়ার দেশে হাঙ্গরের ডানা দিয়ে তৈরী স্যুপের জনপ্রিয়তা. বিজ্ঞানীরা হাঙ্গর ধরা কমানোর জন্য আবেদন করেছেন, যাতে তাদের ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যায়.

চিনের সম্রাট বর্গ হাঙ্গরের ডানা দিয়ে তৈরী স্যুপ খেতে ভালবাসতেন. প্রাচীন চিনে এই বিরল ধরনের জিনিষ দিয়ে তৈরী স্যুপ তৈরীর ক্ষমতা দিয়েই রাঁধুনির রান্নার উত্কর্ষের প্রমাণ দেখা হত. মনে করা হত যে, হাঙ্গর খেলে তার শক্তি অর্জন করা সম্ভব হয়. এখন এই বিস্ময়কর খাদ্য শুধু এশিয়াতেই নয়, আমেরিকাতেও ও বাকী বিশ্বেও পাওয়া যাচ্ছে. এর জন্যই প্রত্যেক বছরে কয়েক কোটি হাঙ্গর ধরা হচ্ছে ও মারা হচ্ছে. তার মধ্যে আবার যারা চোরা শিকারি, তারা এই হাঙ্গর ধরে তার ডানা কেটে নিয়ে জ্যান্ত অবস্থাতেই আবার সমুদ্রে ছেড়ে দিচ্ছে, আর সেই অসহায় প্রাণী জলেই ধীরে হলেও নিশ্চিত ভাবেই মারা যাচ্ছে. এই নৃশংস ব্যবসা এখন আরও জোরদার হচ্ছে. কয়েক বছর আগেও হাঙ্গরের স্যুপ চিনে ছিল এক বিশেষ ধরনের খাবার আর তা দেওয়া হত বিয়ের প্রথাগত খাবারের মধ্যে, কিন্তু এখন এটা কয়েকশো ডলার দিয়ে কিনে স্বাদ নিয়ে দেখা যাচ্ছে বহু এশিয়া ও আমেরিকার রেস্তোরাঁতেই.

হারিয়ে যেতে বসেছে, এই ধরনের বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের রকম নিয়ে বেআইনি কারবার সম্বন্ধে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক কনভেনশনের আওতায় হাঙ্গর সমস্যা নিয়ে একটা পুরো বিশেষ বৈঠক আয়োজন করা হয়েছিল. সেখানে বিশেষজ্ঞরা এক ধারণায় পৌঁছেছেন যে, সবচেয়ে অবলুপ্ত হওয়া মতো অবস্থায় পৌঁছেছে – হেরিং মাছের মতো দেখতে হাঙ্গর, মহাসমুদ্রের প্রবাল প্রাচীরের কাছে থাকা হাঙ্গর, তিন রকমের হাতুড়ী মুখো হাঙ্গর, – যাদের দরকার বিশেষ করেই রক্ষা করার. রেডিও রাশিয়াকে পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করে মস্কো রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও মীন বিদ্যা বিশেষজ্ঞ আলেকজান্ডার কাসুমিয়ান বলেছেন:

“অনেক রকমের হাঙ্গর একেবারেই অবলুপ্ত হওয়ার পথে. সেগুলি একেবারেই হারিয়ে যেতে পারে, আর স্বীকার করা দরকার যে এমনকি সেই ধরনের বিপজ্জনক হাঙ্গর, যেমন বাঘের ধরনের বা সাদা হাঙ্গরও এই সব স্যুপ প্রিয় লোকদের জন্য সংখ্যায় একেবারেই কমে গিয়েছে, যে কারণে বিশেষ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার এদের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য”.

বাজারে বর্তমানে শুধু হাঙ্গরের ডানাই নয় বরং শরীরের অন্যান্য অংশও বিক্রী হচ্ছে. এই ধরনের মাছ খুবই মূল্যবান. তার মেটেতে কড মাছের লিভারের চেয়েও বেশী ভিটামিন সমৃদ্ধ চর্বি থাকে. আর এই মাছ থেকে পাওয়া ওষুধ স্কোয়ালেন (ল্যাটিন ভাষায় স্কোয়ালাস শব্দের অর্থ – হাঙ্গর) ক্যান্সার ও হৃদরোগের চিকিত্সায় নতুন দিগন্তের আবিষ্কার করেছে, যা বহু সম্ভাবনাময়. কিছু বিশেষজ্ঞের মতে হাঙ্গর মানব সমাজকে এমনকি এইডস রোগের হাত থেকেও রক্ষা করতে সক্ষম. কারণ অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় হাঙ্গরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই বিরল ধরনের. এই মাছের চামড়ার বৈশিষ্ট্যও বিস্ময়কর – তা গরুর চামড়ার চেয়েও শক্ত, আর পালিশ করার জন্যও এই চামড়ার খসখসে ভাব ব্যবহার হয়ে থাকে. প্রসঙ্গতঃ, এই সব কারণেই হাঙ্গর আলাদা করে চাষ করা যেতে পারে. তাদের নির্বোধের মত মেরে ফেলা উচিত নয়, কারণ জৈব কারণেই হাঙ্গর যত সংখ্যায় মেরে ফেলা হচ্ছে, তত সংখ্যায় জন্মাচ্ছে না, বিশেষজ্ঞ এই সূত্রে বলেছেন:

“সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমে হাঙ্গর খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে. তারা হিংস্র মাছ খেয়ে থাকে, সেই সমস্ত অসুস্থ মাছই খেয়ে ফেলে, যারা হিংস্র মাছদের জন্যই সবচেয়ে সহজলভ্য. তাদের কাজ ঠিক সেই রকমের, যেমন জঙ্গলে নেকড়ে বাঘের. আপনারা শুনে থাকবেন – নেকড়ে বাঘকে বলা হয় জঙ্গলের ধাঙ্গড়, আর হাঙ্গর ঠিক একই কাজ সমুদ্রের ইকোসিস্টেমে করে থাকে. তাদের থাকা উচিত্ বিভিন্ন রকমের ধরনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য. যখন এই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে ইকোসিস্টেমে খুবই অযাচিত প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে – অযথা প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধি ও অন্যান্য নানা রকমের অপ্রিয় ঘটনা”.

যদি এই চোরা শিকার বন্ধ না করা হয়, তবে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, বিশ্বের বুক থেকে আগামী দশকের মধ্যেই সমস্ত হাঙ্গর নিশ্চিহ্ণ হয়ে যাবে.