শুরু করছি আমাদের সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান – রাশিয়ার আদ্যোপান্ত. অনুষ্ঠানটি সংকলন করেছেন নিনা রুকাভিশনিকভা, এবং স্টুডিওয় ভাষ্যকার ল্যুদমিলা পাতাকি ও কৌশিক দাস.

এই অনুষ্ঠানে আমরা রাশিয়ার সম্পর্কে গল্প করে থাকি, সেই সব বিষয়ে, যা জানতে আপনারা আগ্রহী.

সেইজন্যই আমরা ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মরিশাসে আমাদের নিয়মিত পাঠক ও শ্রোতাদের অনুরোধ করছি, রাশিয়া সম্পর্কে যত বেশি সম্ভব প্রশ্ন পাঠানোর জন্য. লিখুন, কি আপনারা জানতে চান.

আজ আমরা উত্তর দেব বাংলাদেশের ঢাকা থেকে ফিরদৌস আহমেদের পাঠানো প্রশ্নেরঃ রাশিয়ার কোন সব রেকর্ড গীনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের অন্তর্ভুক্ত?

আর জানাবো ভোলগা নদী সম্পর্কে. এই বিষয়ে জানাতে আমাদের অনুরোধ করেছেন কোলকাতা থেকে সঞ্জীব বিশ্বাস.

রাশিয়ার নতুন কোন সব রেকর্ড গীনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে? – জানতে চেয়েছেন ঢাকা থেকে ফিরদৌস আহমেদ.

প্রত্যেক বছর গীনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ডে নথিভুক্ত হয় সাইবেরিয়ার দুজন রুশী কারিগরের সৃজন.আনাতোলি কোনেনকো ও তার পুত্র স্তানিস্লাভ আজ কয়েক বছর ধরে দুনিয়াকে বিস্মিত করে চলেছেন তাদের সৃজন দিয়ে, যা শুধুমাত্র অত্যন্ত শক্তিশালী অনুবীক্ষণের তলায় অবলোকন করা সম্ভব. তাদের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের ক্যাবিনেটের শোভাবর্ধন করে.

তাদের সৃষ্টি করা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতীকগুলি ক্রেমলিনে জনসাধারনের জন্য প্রদর্শন করা হয়. ভাবতে পারেন, রাশিয়ার জাতীয় সঙ্গীত লেখা হয়েছে মানুষের একটা চুলে! সঙ্গীতের বয়ান পড়া সম্ভব শুধুমাত্র খুব শক্তিশালী অণুবীক্ষণের নীচে.

‘অণুবীক্ষণের তলায় অত্যাশ্চর্য’ নামক পিতা-পুত্রের সৃষ্টির ভ্রাম্যমান প্রদর্শনী রাশিয়ার বহু শহর সফর করেছে. শিল্পী আনাতোলি কোনেনকোর প্রথম সৃষ্টি ছিল মহান লেখক ফেওদর দস্তয়েভস্কির প্রতিকৃতি একটা চালের ওপর. সুঁচের ফুঁটোয় তার উঠদের ক্যারাভান তাজ্জব বনিয়ে দেয়. অণুবীক্ষণের নীচে দেখা যায়, যে ফুঁটোর ভেতরে ১২টা উঠ, ২টো নারকেল গাছ ও ৩টে লোক.

আরও শুনুন. কল্পনা করুন রেললাইন, যার উপর দিয়ে রেলগাড়ি যাচ্ছে. ঐ যে ধুমায়িত পাইপ, ঐ তো ট্রেনচালক, ভ্রু কুঁচকে বহুদূরে দৃষ্টিনিবদ্ধ করে আছে, ঐ দেখুন জানালা থেকে ঘাড় বের করা যাত্রীর মুখ. আর এবার কল্পনা করুন, যে রেলগাড়িটি রেললাইন ধরে নয়. যাচ্ছে মানুষের একটা চুলের ওপর দিয়ে. এতই সেটা ক্ষুদ্র.

পুত্র স্তানিস্লাভ শিক্ষায় ছাপাখানার শিল্পী, উদ্ভাবন করে চলেছেন একের পর তাক লাগিয়ে দেওয়া বই. তিনি বলেন, যে বইয়ের মাপ যত ক্ষুদ্রতর হয়, তার জন্যে প্রয়োজন হয় তত বড় মেশিনের. আন্তন চেখভের লেখা ‘গিরগিটি’ বইটি তার সংকলনে ২০০২ সালে গীনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান পেয়েছে. বইটার দৈর্ঘ্য – ০,৯ মি.মি. ও প্রস্থ ০,৯ মি.মি. কিন্তু এখন তিনি আরও ক্ষুদ্রতর বই তৈরী করেছেন. এবং তিনি জোর দিয়ে বলেন, যে রাশিয়ায় ও বিদেশে এরকম বইয়ের ক্রেতা ও সংগ্রহকারীদের সংখ্যা ক্রমশঃই বাড়ছে.

পিতা-পুত্রের রচনার প্রদর্শনীর দর্শকদের মুগ্ধ করেছে গোলাপের পাপড়ির উপর লেখা বই. অণুবীক্ষণের নীচে সেখানে পড়া যায় কবি আলেক্সান্দর পুশকিনের কবিতা – ‘গোলাপ’.

তবে দর্শকদের সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করে সেই সব সৃষ্টি, যেখানে সত্যিকারের কীটপতঙ্গ আছে. শিল্পীরা যেন প্রকৃতি ও মানুষের সৃষ্টির তুলনা করছেন. যেমন, মৃত ফড়িংয়ের পায়ে জড়িয়ে আছে ১২ মি.মি. দীর্ঘ বেহালা.

আনাতোলি ও স্তানিস্লাভ কোনেনকোর প্রদর্শনীর দর্শকরা সানন্দে অণুবীক্ষণের নীচে প্রত্যক্ষ করেন মশার ডানার ওপর জাহাজ, মশার ঠ্যাংয়ের ওপর গাড়ি, মশার গোঁফের ওপর এইফেল টাওয়ার, এমন ক্ষুদ্র দাবার বোর্ড, যেখানে খেলতে পারবে শুধু মাছিরা. সত্যিকারের পোকামাকড়দের মাপের সঙ্গে তুলনা করে দর্শকরা বুঝতে পারে যে সোনা ও অন্যান্য ধাতু দিয়ে তৈরী করা কারিগরদের জিনিষগুলো কতখানি ক্ষুদ্র.

গীনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান পেয়েছে পিতা-পুত্রের আরও একটা সৃষ্টি – পৃথিবীতে ক্ষুদ্রতম এ্যাকোয়ারিয়াম জীবিত মাছসুদ্ধ. ঐ এ্যাকোয়ারিয়ামে ছিল মাত্র ১০ মিলিলিটার জল. সেখানে সাঁতরাতো পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম আকারের মাছ দানিও রেরিও.

এই সব রচনা প্রদর্শন করা হয়, শুধু একটা বই ছাড়া, যেটা খুব সরু বরফের আস্তরনের ওপর লেখা. ঐ বইটা পিতা-পুত্রের বাড়ির ফ্রিজে সংরক্ষিত আছে ও দেখানো হয় শুধুমাত্র অতিথিদের.

আর এবার কোলকাতার সঞ্জীব বিশ্বাসের অনুরোধে ভোলগা নদীর গল্প করবো. রুশবাসীদের জন্য ভোলগা ততটাই প্রিয় ও দামী, যেমন ভারতবাসীর জন্য গঙ্গা.

রুশবাসীরা বহু লোকগীতিতে ভোলগা নদীর প্রতি তাদের ভালোবাসা ব্যক্ত করেছে. যেমন শুনুন এই গানটার কয়েকটি কথাঃ “ভোলগা, ভোলগা, আপন মাতৃদেবী, ভোলগা – রুশী নদী”.

“ভোলগা নদী গভীর, তীরে আছড়ে পড়ে” – আরও একটা লোকগীতির কথা.

আর এবার শুনুন আধুনিক কবিদের লেখা গানঃ ডাকসাইটে সুন্দরী, যেন টইটুম্বুর সাগর, মায়ের মতো – মুক্ত, প্রশস্ত, বিশাল, বলিষ্ঠ.

আরও একটা গান খুব জনপ্রিয়ঃ “বহুদূর থেকে অনেককাল ধরে বয়ে আসছে ভোলগা নদী, বইছে ভোলগা নদী, তার আদিঅন্ত নেই”

হ্যাঁ, সত্যিই ভোলগা নদীর মধ্য বা নিম্নপ্রবাহের কোথাও দাঁড়ালে মনে হয়, যে তার আদিঅন্ত নেই. নদীটি এতটাই চওড়া, বিশেষতঃ- বসন্তকালে বরফ গলার সময়. ২০০টা উপনদী তাদের জল বয়ে আনে ভোলগা নদীতে.

পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ নদীগুলির তালিকায় ভোলগা ১৬-তম স্থানে. তার দৈর্ঘ্য সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটারেরও বেশি.

ভোলগার উত্স ভালদাই টিলায়. যখন পর্যটকদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়, তারা অবাক হয়ে দেখে নালার মতো একটি নদী, যার নাম ভোলগা.

তবে তার নিম্নপ্রবাহে ভোলগার প্রস্থ দেড় কিলোমিটারেরও বেশি ও সে গিয়ে পড়েছে কাস্পিয়ান সাগরে. কাটা বহু খালের সূত্রে ভোলগা থেকে মালপত্র বহন করে নিয়ে যাওয়া যায় বাল্টিক, আজভ ও কৃষ্ণসাগরে, যেখান থেকে সামুদ্রিক জাহাজে করে পৃথিবীর সমস্ত দেশে.

ভোলগার গোটা প্রবাহ জুড়ে নির্মিত বহু জলবিদ্যুতকেন্দ্র ও ব্যারেজ. সুতরাং এই নদী সস্তার বিদ্যুত্শক্তিও যোগায়.

ভোলগার জলে ৭০ রকমের মাছ আছে. তার উচ্চ ও মধ্যপ্রবাহের তীরবর্তী অঞ্চলে গম ও অন্যান্য দানাশস্যর ফলন হয় আর নিম্নপ্রবাহের তীরবর্তী অঞ্চলে ফলে রসালো ও সুস্বাদু তরমুজ ও ফুটি.

ভোলগার তীরে অবস্থিত শহরগুলি সম্পর্কেও কয়েকটি কথা বলা দরকার. সেরকম শহরের সংখ্যা ষাটটিরও বেশি. তাদের মধ্যে আছে বড় শিল্প শহর ইয়ারোস্লাভল, নিঝনি নোভগোরদ, সামারা, তালিয়াত্তি, কাজান, ভলগোগ্রাদ.

ভোলগা তীরবর্তী তভের শহর থেকে রুশী বণিক আফানাসি নিকিতিন তার ‘তিন সমুদ্র পেরিয়ে’ ভারতে পাড়ি দিয়েছিলেন. এখন এই প্রাচীণ রুশী শহরে ভোলগার তীরে নিকিতিনের স্মৃতিস্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে. লোকে বলে, যে তিনি ভারতের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছেন...

আর ভোলগার সঙ্গমের একেবারে কাছে অবস্থিত আস্ত্রাখান শহরে সপ্তদশ শতাব্দী থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে আসা বণিকরা বসবাস করতো. সেখানে তাদের একটা বড় পাড়া ছিল, আজও সেখানকার রাস্তার নাম – ভারতীয় স্ট্রীট. তাই সুপ্রাচীণকাল থেকে ভোলগার তীরবর্তী সব এলাকায় ভারতীয় হস্তশিল্প সামগ্রী বিক্রয় হতো. আর ভারত দখল করার পরে ইংরেজ নাবিকরা ভোলগার তীরে ভারতীয় পণ্যদ্রব্য বিক্রয় করতো ও মুনাফা লুটতো.

আর এবার শুনুন একটি গান. কি নিয়ে? অবশ্যই ভোলগাকে নিয়ে.

রাশিয়ার আদ্যোপান্ত অনুষ্ঠানটি এখানেই শেষ করছি. আমরা রাশিয়া সম্পর্কে আপনাদের কাছ থেকে নতুন নতুন প্রশ্নের অপেক্ষায় থাকবো. ইন্টারনেটে আমাদের ঠিকানাঃ letters a ruvr.ru