গত বৃহস্পতিবারে রোমের সময় সন্ধ্যা আটটায় ভ্যাটিকানের পবিত্র সিংহাসন শূণ্য হয়েছে. পোপ ষোঢ়শ বেনেডিক্ট পদত্যাগ করলেন. রোমের সেনেট ভবনেই এক অবোধ্য ও ধাঁধার ভাব সৃষ্টি হয়েছে গত ১১ই ফেব্রুয়ারী প্রধান যাজকের অবসর গ্রহণের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই. বিশেষজ্ঞরা এটাকে জুড়েছেন সেই সমস্ত সমস্যার সঙ্গেই, যা নিয়ে বহু দশক ধরেই আধুনিক ক্যাথলিক খ্রীষ্টান ধর্ম শুধু জমিয়ে গিয়েছে ও চুপ করে থেকে বর্তমানে এক গুরুতর সঙ্কটের মুখে পড়েছে, ষোঢ়শ বেনেডিক্ট নিজের প্রধান যাজক থাকার সময়ে এই সমস্যা গুলিকে শুধু সমাধান যে করেন নি তাই নয়, বরং আরও গভীর করেছেন.

কারডিনাল ইওজেফ রাটসিঙ্গারের শাসন কালে সব সময়েই একটা না একটা আন্তর্জাতিক স্ক্যান্ডাল লেগেই ছিল. তার মধ্যে একটা ভ্যাটিকান ও গণ প্রজাতন্ত্রী চিনের মধ্যে বিরোধ – যা প্রসঙ্গতঃ শুরু হয়েছিল আগের প্রধান যাজকদের সময় থেকেই. এখনও চিনে বাস্তবে দুটি ধারার ক্যাথলিক গির্জা রয়েছে. তাদের মধ্যে একটা – গোপনে রোমের পোপের ক্ষমতাকে স্বীকার করে ও অন্যটা – যেটা দেশের সরকারের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে – তারা গণ প্রজাতন্ত্রী চিনে স্থানীয় গির্জার প্রধান নির্বাচন স্বাধীন ভাবে করার ধুয়ো তুলে যাচ্ছে আর তা রোমের সঙ্গে অবশ্য প্রয়োজন হিসাবে একসাথে ঠিক করতেও চায় না. ষোঢ়শ বেনেডিক্ট যদিও তৈরী ছিলেন এই প্রশ্নে একটা সমঝোতায় আসতে, তবুও বিরোধ আজও রয়েছে সমাধানের অপেক্ষায়. একই রকম ভাবে, প্রসঙ্গতঃ, রাশিয়া ও প্রাক্তন সোভিয়েত দেশ এলাকায় ক্যাথলিক বিশপের ও প্রশাসনিক এলাকা থাকা সংক্রান্ত ব্যাপারেও কোন রকমের সমাধান সূত্র খোঁজা হয় নি. দ্বিতীয় জন পাভেলের সময়ের অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে ক্যাথলিক খ্রীষ্ট ধর্ম প্রচার এই সব এলাকায় শুধু পরিবর্তিত হয়েছিল ষোঢ়শ বেনেডিক্টের সময়ের “মৌনব্রত” অবলম্বনের মধ্যে. আরও একটি গুরুতর হিসাবের ভুল, যা আজ পোপকে মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, - মুসলমানদের ও তাদের ধর্ম শিক্ষার বিষয়ের উদ্দেশ্যে ২০০৬ সালের খুবই ব্যর্থ মন্তব্য. এটাই অনেকাংশে ইউরোপীয় সঙ্ঘের দেশগুলিতে আধুনিক ইসলামের যথেষ্ট আগ্রাসী ভূমিকা ও চরিত্রের কারণ হয়েছে, এই রকম মনে করেই ধর্ম বিশেষজ্ঞ ইউরি তাবাক বলেছেন:

“পোপ কনস্ট্যানটিনোপোলের সম্রাট দ্বিতীয় ম্যানুয়েল, যা বলেছিলেন তার থেকেই উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন, যেখানে হজরত মহম্মদকে খুবই অপছন্দের উপযুক্ত করে বর্ণনা করা হয়েছিল. প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছিল যে, তিনি তলোয়ার ও রক্তক্ষয় ডেকে এনেছেন. আমার মনে হয় যে, এটা করার দরকার ছিল না. কারণ সমগ্র মুসলিম বিশ্ব এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল ও বহু সংখ্যক মানুষই অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন”.

যদিও ভ্যাটিকান থেকে সরকারি ভাবে এই প্রচার বাণী নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছিল, ঐস্লামিক ধর্মীয় নেতারা তাও এই ক্ষমা চাওয়া, মেনে নেন নি. ভ্যাটিকানের রাজনীতিতে বেড়ে যেতে থাকা অসন্তুষ্ট লোকদের মধ্যে যোগ দিয়েছে ইহুদীরাও.

ইজরায়েলের সঙ্গে ভ্যাটিকানের বিরোধী সম্পর্ক তীক্ষ্ণ হয়েছিল ২০০৯ সালে, যখন ষোঢ়শ বেনেডিক্ট ঠিক করেছিলেন গ্রেট ব্রিটেনে আগে গির্জা থেকে বের করে দেওয়া চার বিশপকে ফিরিয়ে আনার. তাদের মধ্যে ছিল রিচার্ড উইলিয়ামস, যে হলোকস্ট ব্যাপারকেই অস্বীকার করেছিল. অংশতঃ, এই স্ক্যান্ডাল এক রকম করে মানিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যখন রোমের প্রধান যাজক পবিত্র ভূমিতে গিয়েছিলেন সফরে, আর তারই সঙ্গে পবিত্র সিংহাসনের পক্ষ থেকে পূণ্যাত্মা মহাপুরুষদের মধ্যে পোপ দ্বিতীয় পিয়াকে গ্রহণ করার প্রক্রিয়াও বন্ধ করে, যাঁর নামে অভিযোগ ছিল, তিনি ফ্যাসিস্টদের এক সময়ে বাড়তি রকমের সহানুভূতি দেখিয়েছিলেন বলে.

শেষ সাড়া জাগানো স্ক্যান্ডাল, যেখানে কোন না কোন ভাবে অবসর নিয়ে চলে যাওয়া প্রধান যাজকের নাম জড়িত ছিল, - তা ছিল সেই সব শিশু ধর্ষক যাজকদের জড়িয়ে. যদিও পবিত্র সিংহাসন একাধিকবার এই ঘটনার সমালোচনা করেছে ও আশ্বাস দিয়েছে যে, এর সাথে সংগ্রাম করা হবে তবুও কার্য ক্ষেত্রে ষোঢ়শ বেনেডিক্ট ছিলেন প্রথম যাজক, যিনি একেবারেই উল্টো উদাহরণ দেখিয়েছেন, মনে করিয়ে দিয়ে ইউরি তাবাক বলেছেন:

“বছর পাঁচেক আগে তিনি একটি চিঠি দিয়েছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার এক বিশপের নামে, যাকে দুটি কিশোরকে ধর্ষণের জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছিল. তখন পোপ এই বিশপের প্রতি পিতৃ সুলভ যত্নের আহ্বান করেছিলেন ও তার দেখাশোনা করা, যা সমাজের মধ্যে যথেষ্ট বিরক্তির উদ্রেক করেছিল”.

এই সব কিছুরই সঙ্গে যোগ হয়েছে গির্জার ভিতরের সমস্যাও: একদল যাজক প্রথমে খোলাখুলি ভাবেই তাদের নিজেদের জন্য বিবাহ সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য তদ্বির শুরু করেছিল, শোনা যাচ্ছিল গর্ভপাত আইন সঙ্গত করা নিয়েও দাবী, কিছু আলাদা ক্ষেত্রে দাবী করা হয়েছিল এমনকি সমকামীদের বিবাহ ধর্মীয় ভাবে করানোর জন্যও. এই সব লিবারেল প্রবণতা, যা ক্যাথলিক ঐতিহ্যে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব নিয়ে এসেছে, তা দেখা গিয়েছে পবিত্র লেখনের চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী. ভ্যাটিকান নিয়ে অসন্তোষ গণ প্রতিবাদের প্রবাহে মিলেছে, যা দেখতে পাওয়া গিয়েছিল পরবর্তী কালে পোপের ইউরোপীয় দেশ গুলিতে সফরের সময়ে.

শেষ যেটা ষোঢ়শ বেনেডিক্টের কাছ থেকে তাঁর অবসর গ্রহণের আগে আশা করা হয়েছিল, - তা হল সেই সব তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা, যা প্রধান যাজকের খানসামা, পবিত্র সিংহাসনের গোপনীয় দলিল চুরি করে সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেওয়া নিয়ে করা হয়েছিল. আর তারই পরে, সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবর, যাতে ভ্যাটিকানের ব্যাঙ্কের আইন লঙ্ঘণ সংক্রান্ত বিষয়ে হয়েছিল. কিন্তু এই সব তথ্য, তা আরও অন্যান্য সমস্ত সমস্যার সঙ্গে, যা আজকের দিনের ক্যাথলিক গির্জার সামনে উপস্থিত হয়েছে, তা অবসর নিয়ে সরে যাওয়া ষোঢ়শ বেনেডিক্ট, ঠিক করেছেন লোকের অজান্তেই রেখে দিতে ও পরবর্তী প্রধান যাজকের কাঁধেই তুলে দিতে.