চিন একমাত্র বৃহত্ রাষ্ট্র, যারা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের কাজের সঙ্গে যুক্ত নয়. কিন্তু এই বছরে চিন, মনে হচ্ছে, এটাকে সবচেয়ে গুরুতর চ্যালেঞ্জ জানাতে চলেছে. এই বছরের গ্রীষ্মে চিনের তিনজন তাইকোনট (মহাকাশচারী) চিনের থেকে পাঠানো কক্ষপথে থাকা স্টেশন “আকাশ প্রাসাদ” বাসযোগ্য ও সাজানো গোছানো করতে যাবেন. এই মহাকাশ স্টেশনের বন্ধ দরজা প্রথমবার খোলা হয়েছিল ২০১২ সালের জুন মাসে, যখন চিন থেকে ইতিহাসে প্রথমবার অন্য একটি মহাকাশে থাকা বস্তুর সাথে পাঠানো পাইলট চালিত মহাকাশ যানের সংযোগ ঘটানো হয়েছিল. এই প্রথম আবিষ্কারের তিন অভিযাত্রীর দলে ছিলেন মহিলা মহাকাশচারী – ল্যু ইয়ান.

কক্ষপথে থাকা মডিউলের সঙ্গে দ্বিতীয় মহাকাশ যানের সফল যোগ সাধন করা সম্ভব হওয়ার মানে হবে যে, চিন নিজেদের স্বাধীন মহাকাশ পরিবহন ব্যবস্থা তৈরী করতে পেরেছে. এই পথে তারা প্রথম পদক্ষেপ করেছিল, আজ থেকে দশ বছর আগে ২০০৩ সালে, যখন চিন কক্ষপথে মহাকাশচারী পাঠিয়েছিল, আর তারপরে ২০০৮ সালে নিজেদের দেশের প্রথম মানুষকে খোলা মহাকাশে যান থেকে বের করেছিল, ভ্রমণে.

কেন চিনের দশক পার হয়ে একই ভাবে মহাকাশে যাওয়ার দরকার পড়েছে, যা একসময়ে সোভিয়েত দেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র করেছিল? রাজনৈতিক গবেষণা ও পূর্বাভাস কেন্দ্রের প্রধান আন্দ্রেই ভিনোগ্রাদভ নাম করেছেন অন্তত পক্ষে তিনটি কারণের. তিনি বলছেন:

“একটি প্রাথমিক কাজ হল – দেশের মর্যাদা প্রমাণ করা. পাইলট চালিত যানের পরিকল্পনা থাকলে এটা মর্যাদার ব্যাপার. চিন সত্যিই বর্তমানে বিশ্বে একটা নেতৃস্থানীয় জায়গা নেওয়ার দাবী করছে, তার মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রও রয়েছে.তাই আন্তর্জাতিক ও আভ্যন্তরীণ মঞ্চে পাইলট চালিত মহাকাশ যাত্রা – এটা একটা প্রতীক. এটা আবার ভিত্তিমূলক বিজ্ঞানের প্রসারও বটে, যা বহু বিনিয়োগের চাহিদা রাখে. তার ফল দ্রুত পাওয়া যায় না, কিন্তু দেয় বড় রকমের ফলই. তাই সেই সব প্রযুক্তি, যা মহাকাশের জন্য তৈরী করা হয়, তা অনিবার্য ভাবেই পরবর্তী কালে অসামরিক ও সামরিক দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে”.

মহাকাশ উপলব্ধ করার কাজে চিন নিজেদের প্রযুক্তিগত আবিষ্কারের উপরেই নির্ভর করেছে. তারই মধ্যে পাইলট চালিত মহাকাশ যাত্রা ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে রুশ প্রযুক্তির আধুনিক রূপ. অংশতঃ, জীবন সংরক্ষণ ও স্কাফান্দার বা মহাকাশচারীর পোষাক নির্মাণের প্রযুক্তির ক্ষেত্রে. তা রাশিয়া থেকে চিনে বিক্রী করা হয়েছিল সোভিয়েত দেশ পতনের অব্যবহিত পরেই. বিশেষজ্ঞরা চিনের মহাকাশযান “শেন্চঝৌ” ও তার সোভিয়েত সহোদর “সইউজ” মহাকাশ যানের মধ্যে মিল দেখতে পেয়েছেন. কিন্তু চিনের একই রকমের যান গুলি বেশী শক্তিশালী ও দ্রুত দিক পরিবর্তনে বেশী সক্ষম. বিজ্ঞানীরা একই সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, চিনের “আকাশ প্রাসাদ” – মহাকাশ মডিউল “তিয়ানগুন -১” ও সোভিয়েত মহাকাশ স্টেশন “স্যালুটের” শুধু এই টুকুই তফাত যে, চিনের যানে কোন কামান রাখা হয় নি.

আর এমনকি চিনের পরিকল্পনাও এখন সোভিয়েত পরিকল্পনারই নকল করছে. তাদের কাজ – রাশিয়ার “মীর” মহাকাশ স্টেশনের চেয়ে কিছুটা ছোট মহাকাশ স্টেশন তৈরী করা. এই ক্ষেত্রে চিন নিজেদের পাইলট চালিত মহাকাশ বিজ্ঞান রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় সঙ্ঘ, কানাডা ও জাপানের থেকে আলাদা ভাবেই করতে চাইছে. বেশ কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেছেন যে – এটা রাজনৈতিক কারণেই. আন্দ্রেই ভিনোগ্রাদভের মত – একেবারেই অন্য, তিনি বলেছেন:

“চিনের আসলে বাস্তবেই আপাততঃ কিছু দেখানোর মত নেই. আর যদি চিন কোন সম্মিলিত যৌথ প্রকল্প শুরু করে, তবে সকলেই বুঝতে পারবে চিনের মহাকাশ বিজ্ঞানের সত্যিকারের স্তর. আজ, যা হচ্ছে – এটা অনেকটাই সোভিয়েত পাইলট চালিত মহাকাশ অভিযানের পরিকল্পনার পুনরাবৃত্তি, যা কয়েক দশক আগেই করে ফেলা হয়েছে. চিনের লোকদের নিজেদের কিছু একটা ব্যক্তিগত আভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হবে, যাতে বিশেষজ্ঞদের গুরুত্ব দিয়ে আগ্রহ তৈরী হওয়ার মতো একটা কারণ থাকে”.

তা সে যাই হোক না কেন চিনের মহাকাশের কক্ষপথে উপগ্রহের গোষ্ঠী সংখ্যার দিক থেকে রাশিয়ার সঙ্গে ইতিমধ্যেই সমান হয়েছে. সক্রিয়ভাবে উপগ্রহ থাকার ক্ষেত্রেও চিন রাশিয়াকে অনেকটাই ছাড়িয়ে গিয়েছে. ২০১০ সালে চিন মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম উড়ানের সংখ্যার হিসাবে সমান হতে পেরেছিল. তখন দুই দেশেই মহাকাশে উড়ান করা হয়েছিল ১৫টি করে. এই ক্ষেত্রে যেখানে চিন থেকে কক্ষপথে কৃত্রিম উপগ্রহ রাখা হয়েছিল ২০টি, আমেরিকা সেখানে রেখে এসেছে ৩৫টি.

0চিন এক দুরন্ত গতিতে মহাকাশের দিকে ধেয়ে চলেছে. ২০১৩ সালে তারা ঠিক করেছে মহাকাশের কক্ষপথে ২০টি উপগ্রহ স্থাপন করবে. তাদের এই বিষয়ে সাফল্য এলে, তারা রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই সূচকে ছাড়িয়ে যাবে. বিশেষজ্ঞরা মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন যে, এর মধ্যে প্রায়  তিন-চতুর্থাংশ উপগ্রহই সামরিক কারণে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ছাড়া হয়েছে.