সিরিয়ার বিদ্রোহীরা আগের মতই প্রায় প্রত্যেক দিনই নতুন জায়গা দখলের খবর রটিয়ে দিচ্ছে. কিন্তু যুদ্ধের কাজকর্মের মঞ্চ থেকে আসা খবর গুলিতে সব মিলিয়ে বিজয়ের সুর তেমন করে আর বাজছে না. বিদ্রোহীরা মনে হচ্ছে নিজেরাই আর যুদ্ধের মাঠে জয় লাভের ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করতে পারছে না. তার ওপরে সেই সমস্ত জায়গা, যা তারা দখল করছে, তা নিয়ম মতই পরের দিনই আবার ফেরত চলে যাচ্ছে সরকারি বাহিনীর হাতে.

একই সঙ্গে বিরোধী পক্ষের নেতা মুয়াজ আল- হাতীব ঘোষণা করেছেন যে, তাঁরা তৈরী আছেন দামাস্কাসের সঙ্গে আলোচনায় বসতে. আর এই ক্ষেত্রে সেটা মোটেও বিজয়ীর তরফ থেকে নিরর্থক রক্তক্ষয় বন্ধ করার মতে মহান আত্মার পরিচয় বলে মনে হচ্ছে না. বরং উল্টোই, জাতীয় জোটের কর্ম ক্ষমতার উপরে বিতরাগ হয়েছে তাদের পশ্চিমী ও আরব্য সহযোগীরা, এই রকমই মনে করে বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়া জার্নালের প্রধান সম্পাদক ফিওদর লুকিয়ানভ আমাদের “রেডিও কোম্পানীকে” দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন:

“খুবই দুঃখের সঙ্গে পশ্চিমের দেশ গুলি বাধ্য হয়েছে স্বীকার করে নিতে যে আসাদের প্রশাসনের স্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে অন্যেরা যতটা আশা করেছিল, তার থেকে অনেক বেশী. আর এখানে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল যে, তার নির্ভর করার ভিত্তি, অর্থাত্ দেশের সামরিক বাহিনী, যারা প্রসঙ্গতঃ বলা যেতে পারে যে মোটেও শুধুই আলাভিত ধর্মপ্রাণ মানুষদের দিয়ে তৈরী নয়, তারা তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে নি, যেমন গাদ্দাফির সঙ্গে তাঁর সামরিক বাহিনীর লোকরা করেছিল. সেই সন্ত্রাসবাদী ঘটনার পরে, যখন সিরিয়ার আইন শৃঙ্খলা ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর নেতৃত্ব নিহত হয়েছিলেন, আর যাঁদের মধ্যে এমনকি আসাদের খুবই কাছের মানুষরাও আছেন, কিছু লোক তখন ভেবেছিল যে, এটা একটা সহসা দিক পরিবর্তনের মুহূর্ত. কিন্তু সেই রকমের কিছুই হয় নি. আর এটাই খুব বেশী করে সিরিয়াতে হানা যারা দেওয়াচ্ছে, তাদের দুঃখিত করেছে ও করেই যাচ্ছে, কিন্তু এর সঙ্গেই তাদের মানিয়ে নিতে হচ্ছে”.

একই সময়ে ফিওদর লুকিয়ানভের মতে, সব মিলিয়ে পশ্চিমের দেশ গুলির বিরোধীদের প্রতি সম্পর্ক পাল্টে যাচ্ছে অন্যান্য আরব বসন্ত হওয়া দেশ গুলির পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে, পশ্চিম আসাদকে বদলে দিয়ে যারা ক্ষমতায় আসতে চাইছে, তাদের চেহারা ছবি দেখে ভয় পেতে শুরু করেছে.

রাশিয়ার “হায়ার স্কুল অফ ইকনমিক্সের” রাজনীতি শাস্ত্র বিষয়ে সিনিয়র শিক্ষক লিওনিদ ইসায়েভ এই ধারণার সঙ্গে একমত হতে পারেন নি. যেমন ইউরোপের লোকরা, তেমনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন আগে থেকেই তৈরী ছিল যে, সিরিয়ার বিরোধ বহু দিনের মামলায় পর্যবসিত হতে চলেছে, আর বর্তমানে পশ্চিমের দেশ গুলি সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে সেই অর্থে যে, যাতে সিরিয়া রসদের বিষয়ে শূণ্য কুম্ভ হয়. এই রকম মনে করে “রেডিও রাশিয়াকে” দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে লিওনিদ ইসায়েভ বলেছেন:

“তত্ত্বগত ভাবে, এই ধরনের বাস্তব প্রয়োগ সাফল্যের পথে নিয়ে আসতে পারে, কারণ পশ্চিম ও আরব দেশ গুলির নিজেদের রসদ সংক্রান্ত ক্ষমতা আসাদের ক্ষমতার সঙ্গে তুলনায় দেখতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, কোনদিনও শেষ হবে না এমন. যদি পরিস্থিতি সেই রকম ক্ষেত্রে এর পরেও এগোতে থাকে একই ভাবে, তবে খুবই সম্ভবতঃ, সিরিয়ার প্রশাসন কখনও একটা সম্পূর্ণ ভাবেই শুকিয়ে যাবে. আমি মনে করি যে, বর্তমানের ঘটনা পরম্পরা থেকে পশ্চিমের মোটেও নিজেদের পথ হারানো বলে মনে হচ্ছে না, তারা বরং, খুবই মনে হচ্ছে যে, অন্য কৌশল নিয়েছে”.

কিন্তু একটা তৃতীয় ধারণাও থেকে যাচ্ছে, যা পশ্চিম ও তার আরব জোটের জন্য বাড়তি হিসাবে পড়ে রয়েছে. বহু বিশেষজ্ঞের মতে, যেই বিদ্রোহীদের স্পনসররা বুঝে ফেলবেন যে, শক্তি দিয়ে সিরিয়াতে জেতা যাবে না, তারা হঠাত্ করেই তখন সকলে একসাথে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সমর্থক হয়ে পড়বে, এই আশা করে যে, একই রকম ভাবে ইজিপ্ট বা টিউনিশিয়ার মতো এখানেও ঘটনা পরম্পরা হবে.

কিন্তু সমস্যা হল যে, সিরিয়ার পরিস্থিতি – অন্য রকমের.পশ্চিমের দেশ গুলি ও তাদের আরব জোটের দেশ গুলি সিরিয়াতে চরমপন্থী শক্তিদের ছেড়ে দিয়েছে, যারা এবারে এদের ও অন্যদেরও ব্যবহার করছে নিজেদের স্বার্থেই. তারাই এখন প্রশাসনের সারিক বাহিনীর সঙ্গে সবচেয়ে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ করছে, নিজেদের ব্যক্তিগত লক্ষ্য পূরণের জন্য. আর এই লক্ষ্য মোটেও পশ্চিম বা আরব দেশ গুলির জোটের লক্ষ্যের সাথে মিলছে না. এর সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে যে, বিদ্রোহীদের কিছু সাধারন যোদ্ধা ও কম্যান্ডার ইতিমধ্যেই সিরিয়াতে সহজলভ্য অর্থ ও সামরিক লুঠের আস্বাদ পেয়েছে. শান্তি এখন আর তাদের সেই রকমের কোন দরকার নেই. আসাদ জিতবে অথবা হারবে, তারা তার পরেও যুদ্ধ চালিয়ে যাবে. তখন প্রশ্ন হবে – কোথায়?