২০০১ সালে ভারতের লোকসভায় সন্ত্রাসবাদী হানা আয়োজনের অভিযোগে অপরাধী ও শাস্তি পাওয়া আফজল গুরুর ফাঁসীর ঘটনা নিয়ে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে উত্তেজনা কমছে না. ভারত সরকার কাশ্মীরে বাড়তি সামরিক বাহিনী পাঠিয়েছে. পুলিশের সঙ্গে লড়াইতে বহু লোক আহত হয়েছে – তাদের মধ্যে যেমন মিছিলের লোক রয়েছে ও তেমনই রয়েছে পুলিশের লোক. অন্তত তিন জনের নিহত হওয়ার খবর দেওয়া হয়েছে.

আফজল গুরুকে বিগত রবিবারে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে. আফজল গুরু নিজে শেষ অবধি অস্বীকার করে গিয়েছে যে, সে ২০০১ সালের সন্ত্রাসবাদী কাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল অথবা চরমপন্থী “জাইস-ই-মহম্মদ” গোষ্ঠীর সদস্য ছিল বলে.

ভারতে এই শাস্তি পাওয়া লোকের ফাঁসীর খবরে নানা রকমের প্রতিক্রিয়া হয়েছে. যেমন উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে প্রধান বিরোধী পক্ষ – ভারতীয় জনতা পার্টি এই মৃত্যুদণ্ড বহাল হওয়াতে সন্তোষ প্রকাশ করেছে. আর তাদের এক সবচেয়ে উজ্জ্বল নেতা নরেন্দ্র মোদী নিজের টুইটারের ব্লগে লিখেছেন দেরীতে হলেও এটাই ভাল. আবার অন্য দিক থেকে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের মুখ্য মন্ত্রী ওমর আবদুল্লা এই ফাঁসীর খবরে সেটা একচোখো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন, কারণ তাঁর মতে ভারতের জেলে এখনও বেশ কয়েকজন রয়েছে, যাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বলে আদালত থেকে রায় দেওয়া হয়েছে, এর চেয়ে অনেক বড় সাড়া জাগানো অপরাধের জন্য, তার মধ্যে রয়েছে – ১৯৯১ সালে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর হত্যাকারিণী. তাঁর কথামতো, আফজল গুরুর শাস্তি খুবই দূর পর্যন্ত পরিণাম হওয়ার মতো ঘটনা: বহু কাশ্মীরী যুবাই এবারে আফজল গুরুকে সত্যই গুরু মেনে বসবে.

বোধহয় এই পুরো ঘটনাকেই আইন ও রাজনীতি দুটি ভাগে ভাগ করা দরকার. কিন্তু বর্তমানের বিশ্বে এটা যেমন হরবখত ঘটেই থাকে, মামলা বেশীর ভাগ সময়েই রাজনীতির রঙে বর্ণিত হয়, আর তার অর্থ আইনের কাঠামো ছাড়িয়ে বেরিয়ে পড়ে, এই মন্তব্য করে রুশ স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রশ্নের সমাধান সহজ: যদি প্রমাণিত হয়ে থাকে যে অভিযুক্ত সত্যই তাঁর বিরুদ্ধে করা অপরাধের অভিযোগ অনুযায়ী কাজ করে থাকে, তবে সে আইনের উপযুক্ত শাস্তিই পাবে. সন্ত্রাসবাদ – বর্তমানে একটি ভয়ঙ্কর অপরাধ আর তার শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ডকে মোটেও বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে না. আর অন্য শাস্তি প্রাপ্তদের মৃত্যুদণ্ড এখনও কার্যকরী করা হয় নি বলে উল্লেখ করা এখানে চলতে বোধহয় পারে না. কিন্তু প্রশ্ন এই কারণেই উঠেছে যে, এই ক্ষেত্রে খুবই অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার হল যে, এখন এই শাস্তি দেওয়া. যদিও ভারতের সর্বজনীন লোকসভা নির্বাচন হওয়ার কথা ২০১৪ সালে, আর তারও এক বছরের বেশী দেরী রয়েছে, তবুও প্রাক্ নির্বাচনী লড়াই বাস্তবে ভারতের আধুনিক ইতিহাসে ব্যতিক্রম হলেও শুরু হয়ে গিয়েছে প্রায় আজ থেকে এক বছর আগেই, যখন উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল. আর প্রত্যেকটি কোন রকম উল্লেখ যোগ্য সামাজিক জীবনের ঘটনাই এখন দেখা হচ্ছে ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতির প্রিজমের মধ্যে দিয়ে”.

যদি তারা ঠিক হন, যারা বলছেন যে, এই অপরাধীর শাস্তির সময় মোটেও হঠাত্ করে বাছা হয় নি, তবে একটা প্রশ্নের উদয় হয়: সরকার কি আগে থেকে আন্দাজ করতে পেরেছিল যে, জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্য মন্ত্রী এত তীক্ষ্ণ প্রতিক্রিয়া দেখাবেন? তা যদি সত্য হয়, তবে তাঁকে প্ররোচনা দেওয়ার কি প্রয়োজন ছিল?

ওমর আবদুল্লাকে এখনও অবধি মনে করা হয়েছে রাহুল গান্ধীর ব্যক্তিগত বন্ধু হিসাবে – এই বন্ধুত্বের শুরু সেই তাঁর দাদু ও কাশ্মীরের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শেখ মহম্মদ আবদুল্লার ও রাহুল গান্ধীর প্রপিতামহ জওহরলাল নেহরুর বন্ধুত্বের সময় থেকে. ওমর আবদুল্লা আজ যে পার্টির প্রধান, সেটাও তাঁর দাদুর তৈরী দল জম্মু ও কাশ্মীরের জাতীয় কনফারেনস, আর এই দলকে কয়েকদিন আগেও মনে করা হয়েছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জোটের দল হিসাবেই.

প্রসঙ্গতঃ গত বছরের হেমন্ত কালে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে কাশ্মীরের সরকারের খুবই গুরুতর বিরোধ বেঁধেছিল স্থানীয় পঞ্চায়েতের নির্বাচন নিয়ে আর দুই নেতার কিছু কম শক্তি প্রয়োগ করতে হয় নি এই বিরোধের নিষ্পত্তি করার জন্য. কিন্তু এই সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনার পরে খুবই কষ্ট কল্পনা হবে যে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও জাতীয় কনফারেনস দল আবার জোট বাঁধবে.

কিন্তু হতে পারে যে, কাশ্মীরে একটা উত্তেজনা বৃদ্ধির পথ ধরে দেশের ক্ষমতাসীন সরকার চাইছে বিরোধীদের পায়ের তলা থেকে মাটি কেড়ে নিতে – কারণ তাদের পক্ষে তো সম্ভব হয়েছে ভারতের বিজেপি দলের কাছ থেকে দেশের নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে প্রশংসা আদায় করার. প্রসঙ্গতঃ, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই ধরনের কথাবার্তা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না, তাই বরিস ভলখোনস্কি আবার বলেছেন:

“আরও একটা ব্যাপার রয়েছে, সবচেয়ে অপ্রিয় পরিণাম. এখানে বাদ দেওয়া যায় না যে, সময়ে নির্বাচন হলে, তখন নিজেদের ভোটে হার আগে থেকে লক্ষ্য করতে পেরে, যদি তাঁরা ঠিক করে থাকেন যে, পুরনো অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে দেশে জরুরী অবস্থা জারি করবেন, যেমন ইন্দিরা গান্ধী করেছিলেন গত শতকের সত্তরের দশকে. কিন্তু এই জরুরী অবস্থার পরিণাম তখনও দলের জন্য কোনও ভাল সন্দেশ বহন করে আনে নি. ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস গো-হারান হার হেরেছিল – আর সেটা ছিল তাদের দলীয় ইতিহাসে প্রথম”.

খুবই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে আবার করে এই ধরনের অগণতান্ত্রিক পথে চলার চেষ্টা. কিন্তু যদি দেশের সরকারের কাজকর্ম এই ক্ষেত্রে ভুল হয়ে না থাকে, বরং আগে থেকে ভেবে নেওয়া পদক্ষেপ হয়, তবে সেই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে না, এই রকমই মনে করেছেন রুশ বিশেষজ্ঞ.