রবিবারে পাকিস্তানের আইন মন্ত্রণালয় থেকে যেমন খবর দেওয়া হয়েছে যে, সুইজারল্যান্ড দেশের সরকার দুর্নীতির অভিযোগে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারির বিরুদ্ধে মামলা নতুন করে শুরু করতে অস্বীকার করেছে. সুতরাং পাকিস্তানের সরকার একটা স্থানীয় লড়াইতে দেশের হাইকোর্টের সঙ্গে এবারে জিতেছে, যেখান থেকে দাবী করা হয়েছিল রাষ্ট্রপতিকে প্রায় বিশ বছর আগের মামলার জন্য নতুন করে অভিযুক্ত হিসাবে বিচার করার. প্রসঙ্গতঃ, পাকিস্তানে প্রাক্ নির্বাচনী প্রচারের উত্তেজনা সবে শুরু হয়েছে বলে হিসাব করলে, মনে হয় যে, এই প্রশ্ন এর পরেও একাধিকবার তোলা হতেই পারে.

গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকেই বর্তমানের রাষ্ট্রপতি জারদারির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ চালু রয়েছে, যখন আসিফ আলি জারদারি নিজের স্ত্রী বেনজির ভুট্টোর মন্ত্রীসভায় মন্ত্রী পদে আসীন ছিলেন. তদন্ত কমিশনের মতে, সুইজারল্যান্ডের ব্যাঙ্ক দিয়ে তিনি বহু লক্ষ বেআইনি ডলার পাচার করেছেন, যা পেয়েছেন নানা রকমের ঘুষ ও চুক্তি বহির্ভূত অর্থ হিসাবে. নব্বইয়ের দশকের শেষে জনাব জারদারিকে যেমন পাকিস্তানের, তেমনই সুইজারল্যান্ডের তদন্ত কমিশনের পক্ষ থেকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, আর তিনি এমনকি কয়েক বছর জেলেও কাটিয়েছিলেন.

কিন্তু ২০০৭ সালে দেশে খুবই দ্রুত জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতার কলকাঠি হাতছাড়া হয়ে যেতে দেখে তত্কালীন রাষ্ট্রপতি পারভেজ মুশারফ দেশে সমস্ত দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলায় রাষ্ট্রক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন. এর ফলে ভুট্টো ও জারদারি দেশে ফিরতে পেরেছিলেন. আর ডিসেম্বর মাসে ভুট্টো নিহত হওয়ার পরে জারদারি বাস্তবে একমাত্র প্রার্থী হিসাবে দেশের রাষ্ট্রপতি পদ দখল করতে সক্ষম হয়েছিলেন.

২০০৯ সালে পাকিস্তানের হাইকোর্ট এই রাষ্ট্রক্ষমা ব্যাপারটাকে সংবিধান বহির্ভূত বলে ঘোষণা করেছিল ও জারদারির বিরুদ্ধে মামলা চালু করার জন্য চেষ্টা করতে শুরু করেছিল. বিগত সময়ে জারদারি নিয়মিত ভাবেই সব দিক থেকে আক্রমণের সম্মুখীণ হচ্ছেন ও ক্ষমতা বজায় রাখতে গিয়ে তাঁকে প্রায়ই নানা রকমের ছোটবড় ঘুঁটি হারাতে হচ্ছে, তার মধ্যে দেশের প্রধানমন্ত্রীও আছেন.

এবারে সুইজারল্যান্ডের আদালত জারদারির বিরুদ্ধে মামলা করতে আপত্তি করেছে সেই ভিত্তিতে, যে, তিনি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও তাঁর বিচার সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে অনাক্রম্যতা রয়েছে.

মনে হতে পারে যে, দেশের সর্ব্বোচ্চ আদালতের সঙ্গে লড়াইতে মন্ত্রীসভা জিতেছে. কিন্তু সব রকমেরই ভিত্তি রয়েছে এই রকম মনে করার যে, এই জয় – সাময়িক, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“সর্বজনীন পার্লামেন্ট ও তার পরেই দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের উপকণ্ঠে পৌঁছে পাকিস্তানে উত্তেজনা ক্রমবর্ধমান. আর মনে হয় যে, রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের আরও বেশী করেই নতুন কারণ উত্পন্ন হচ্ছে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার. বিগত কয়েক দিনের মধ্যে পাকিস্তানে এক প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে লাহোর শহরে বেনজির ভুট্টো ও আসিফ আলি জারদারির ২৪ বছরের পুত্র বিলাবল ভুট্টো- জারদারির জন্য বিলাস বহুল প্রাসাদ নির্মাণ নিয়ে. এই ভবনে সব কিছুই রয়েছে, যা চাওয়া যেতে পারে: হেলিকপ্টার নামার মাঠ, উঁচু মজবুত দেওয়াল, যা এমনকি জেট শক্তি চালিত রকেটের আঘাতও প্রতিহত করতে পারে, আর এমনকি বিশাল এক খোলা মাঠ, যেখানে হাজার দশেক অবধি লোক জমায়েত হতে পারেন”.

পাকিস্তানের বেশীর ভাগ লোকেরই অর্থনৈতিক সমস্যা ও জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রাসাদ নির্মাণের ব্যাপারটা খুবই বড় ধরনের বিরক্তির কারণ হয়েছে. এখানে লক্ষ্য করা দরকার যে, বর্তমানে জারদারি সিনিয়রের রাষ্ট্রপতিত্বের মেয়াদ প্রথম ও শেষ বারের জন্যই, তা নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন. আর তাই দেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অনেকদিন ধরেই তার বদলী মুখ খুঁজছে, আর সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত দেখাচ্ছে দেশের ও দলের নেতা হিসাবে বিলাবল ভুট্টোর উপস্থিতি.

কিন্তু এখনও ক্ষমতার চূড়ায় আরোহণের পূর্বেই বিলাবল পাকিস্তানের বহু অসামরিক নেতার জন্য যা সাধারন, সেই পাপই করতে চলেছেন, পরিগ্রহণশীলতার পাপ.

বিরোধী পক্ষের এক নেতা ও পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা ইমরান খান ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রপতি জারদারির কাছ থেকে তাঁর আয়ের উত্স জানতে চেয়েছেন. তিনি নিজের দলের সমর্থকদের সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছেন: “জনাব জারদারি আপনি এই দুর্গের মতো প্রাসাদ বানানোর অর্থ কোথা থেকে পেলেন? আমাকে বলুন, আপনি কি এই অর্থের উপরে কর দিয়েছেন”?

সুতরাং রাষ্ট্রপতি ও তাঁর পরিবারের লোকদের এখনও শান্ত হতে চাওয়া তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে.