ভারতের সর্বজনীন লোকসভা নির্বাচনের আরও এক বছরের বেশী সময় দেরী রয়েছে, কিন্তু নির্বাচনের জন্য প্রচারের সবচেয়ে প্রধান ব্যক্তিত্বকে এখনই দেখা যেতে শুরু করেছে. যদিও প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি এখনও তাদের তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রী পদ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে নি, তবুও বোঝাই যাচ্ছে যে, এই এবং আগামী বছর চলাকালীণ সময়ে মনোযোগের কেন্দ্রে থাকবেন বর্তমানে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী.

বুধবারে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন ভাষণ দিতে, তা নিয়ে ছাত্র সমাজের মধ্যে একটা মেরু বিভাজন হয়ে গিয়েছে. প্রেক্ষাগৃহে হাজার খানেক ছাত্র তাঁকে দাঁড়িয়ে উঠে হাততালি দিয়ে সম্বর্ধনা জানিয়েছে আর তার বাইরে শদুয়েক ছাত্র, যারা বিশেষ করে বাম পন্থী ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের সমর্থক, আন্দোলন করেছে. ছাত্ররা তাঁকে দূর হয় যেতে বলেছে. প্রসঙ্গতঃ, তারা এমন ভাবে এই দাবী জানিয়েছে যে, পরে পুলিশ বাধ্য হয়েছে লাঠি চালাতে.

এতটাই পরস্পর বিপরীত নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে ভারতের বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক মহলের মনন. বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রাক্তন প্রধান অশোক সিংহল মোদীকে তো একেবারে জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে তুলনা করেছেন, তিনি বুধবারে বলেছেন: “জওহরলাল নেহরুর পরে ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদীই প্রথম ব্যক্তিত্ব, যাঁকে সারা দেশের লোক প্রিয় মনে করেছে”.

আর সেই একই দিনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সরকারি মুখপাত্র নিজের টুইটারের ব্লগে লিখেছেন যে, “নরেন্দ্র মোদী নিজের লোকদের সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, গুজরাতের মানুষদেরই রক্ত ঝরিয়েছেন”.

নরেন্দ্র মোদী নামটিই নানা রকমের পরস্পর বিপরীত আবেগ ডেকে আনে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এক দিক থেকে গুজরাত মোদীর এগারো বছর ধরে শাসনের সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাক লাগানো সাফল্য দেখাতে সক্ষম হয়েছে. আর এই সাফল্যের সম্বন্ধেই মোদী দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন ও আশ্বাস দিয়েছেন, সারা ভারত বর্ষকেই নিজের রাজ্যের মতো সমৃদ্ধ এলাকায় পরিণত করে দেবেন.

সারা বিশ্ব ভারতের দিকে তাকিয়ে রয়েছে একটা বিশাল বাজার মনে করে. কেন? কারণ অন্য সব দেশের লোকরা ভাবেন যে, তাঁরা এখানে সহজেই নিজেদের জিনিষ বেচতে পারবেন. সময়ের দাবী হল যে, ভারতকে উত্পাদনের ক্ষেত্রে নেতৃত্বে পৌঁছে দিতে হবে ও আমাদের জিনিষ দিয়ে বিশ্বের বাজারকেই বোঝাই করতে হবে. – বলেছেন মোদী.

অন্য দিক থেকে মোদীর প্রশাসনের শুরুর সময়েই গুজরাতে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হয়েছে, যা হাজারেরও বেশী মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়েছে, প্রধানতঃ মুসলিমদের. মোদীকে এই কারণে সরাসরি দাঙ্গায় যুক্ত থাকার অভিযোগ না করা হলেও অন্তত তা উস্কে দেওয়ার জন্য অভিযোগ করা হয়েছে. মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীণ তিনি পারতেন সহজেই এটা দ্রুত থামাতে, কিন্তু তিনি তা করেন নি”.

অবশ্যই প্রশ্ন রয়েছে যে, মোদী কি লোকসভা নির্বাচনের পরে প্রধানমন্ত্রী হবেন আর তা নিয়েও অসংখ্য পক্ষে ও বিপক্ষে মত রয়েছে. যদি বিজেপি দল তাঁকে প্রার্থী নির্বাচন করে, যদি দেশের লোক তাঁকে ভোট দেয়... কিন্তু বর্তমানের পরিস্থিতিতে মোদীর জনপ্রিয়তা দেখে দুটি হয়তো ব্যাপারকেই বাস্তব মনে হচ্ছে.

আর তখনই একটা দ্বিতীয় প্রশ্নের উদ্রেক হয়, মোদী নির্বাচিত হলে, তা ভারত শুধু নয়, বরং সমস্ত এলাকা ও সারা বিশ্বের জন্য এটা কি হতে চলেছে? আর এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই আগেরটির চেয়ে অনেক কঠিন, এই মনে করে ভলখোনস্কি যোগ করেছেন:

“একদিকে বিজেপি দলকেই মনে করা হয় ইসলাম বিরোধী দল বলে. মোদীকে এই সম্পর্কে একজন প্রধান নেতাই মনে করা হয়. সুতরাং আশা করা যেতেই পারে যে, ভারতের সামাজিক মতামতে একটা মেরু বিভাজন দেখা দেবে ও পাকিস্তানের সঙ্গে এমনিতেই জটিল সম্পর্ক আরও জটিল হবে.

অন্যদিকে বিশ্বে ইসলামের প্রধান শত্রু বলে বিগত বছর গুলিতে নিজের আত্ম পরিচয় ঘোষণা করা সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই মোদীর জটিল সম্পর্ক রয়েছে. সেখানের পররাষ্ট্র দপ্তর একাধিকবার তাঁকে দেশে আসার ভিসা প্রত্যাখ্যান করেছে ও আপাততঃ, কোন রকমের অবস্থান পরিবর্তন করেছে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে না”.

কিন্তু এমনও হতে পারে যে, দেশের ভিতরের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে মোদী নিজের দেওয়া আশ্বাস মতো মনোযোগ দিলে ও দেশের জনতার তাতে সত্যিকারের জীবনের মান উন্নত হতে থাকলে বিদেশের রাজনীতিতে সমস্যা নিয়ে কি আর কেউ মাথা ঘামাবেন? অন্তত পক্ষে বিগত কিছু কাল ধরে মোদীর বাইরের দেশের সঙ্গে সম্পর্ক, বিশেষ করে তাঁর গত বছরের নভেম্বর মাসে চিন সফর, বলে জেয় যে, এশিয়ার অন্য একটি বড় রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে তাঁর কোনও অসুবিধা হয় নি. আর হতে পারে যে, এটাতেই ভবিষ্যতের সাফল্যের জন্য ভিত্তি থাকতে পারে? যদি অবশ্যই উপরোক্ত শর্ত গুলি পালিত হয় ও মোদী সারা ভারতের হিসাবে ক্ষমতায় আসতে পারেন.