শ্রীলঙ্কার তামিল অধ্যুষিত এলাকা গুলি স্বায়ত্ত-শাসন পাবে না. এই সম্বন্ধে দেশের রাষ্ট্রপতি মাহিন্দা রাজপক্ষে সরাসরি ঘোষণা করেছেন, তিনি দেশের ৬৫তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভাষণ দিচ্ছিলেন. “তামিল সমস্যা” একেবারেই শেষ সমাধান করা হয়েছে বলে ধারণা দিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান রাষ্ট্রসঙ্ঘকেই খোঁচা দেওয়া চালিয়ে যাচ্ছেন, যেখান থেকে এই দ্বীপের গৃহযুদ্ধের সময়ে করা সামরিক অপরাধের বিষয়ে তদন্ত করতে চাওয়া হয়েছে. বিশদ বিবরণ নিয়ে এসেছেন আমাদের সমীক্ষক – সের্গেই তোমিন.

দেশের পঁয়ষট্টিতম স্বাধীনতা দিবসের দিনে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতির নির্দিষ্ট করে দেওয়া ভাষণ এই ধরনের ক্ষেত্রে যেই রকমের সাধারণত করা হয়ে থাকে, তেমনই ছিল উদ্দীপ্ত করার মতো, আনুষ্ঠানিক ও জীবনের দাবি মেনেই. নিজের বিতর্কের উর্দ্ধে ওঠা প্রধান সাফল্য ২০০৯ সালে শেষ হওয়া সিংহলী ও তামিল বিরোধের কথা বলতে গিয়ে তিনি পুরনো কথা তোলেন নি বরং নিজের সমস্ত আড়ম্বর ব্যবহার করে উল্লেখ করেছেন ভবিষ্যতের কথা, যখন দেশে আসবে সব রকমের প্রজাতিগত ও ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে সহমত. তিনি এই কথা বলেছেন ও তা থেকেই নিজের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন.

“যখন লোকে একটা ঐক্যের মধ্যে বাস করে, তখন তাদের মধ্যে কোন রকমের ধর্মীয় বা প্রজাতিগত বিভেদ থাকে না. এই দেশে প্রজাতিগত ভাবে নানা ধরনের প্রশাসন তৈরীর দরকার নেই. এখানে সমাধানের একমাত্র পথ, সকলে মিলে একসাথে থাকা, সমস্ত সম্প্রদায়ের জন্য সমান অধিকার দিয়েই”.

আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন এই কথা উল্লেখ করে বলেছেন:

“মনে হতে পারে রাষ্ট্রপতি একেবারে স্পষ্ট ও বিতর্কের উর্দ্ধে থাকা কথাই বলছেন. কিন্তু শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপ্রধান একই সঙ্গে বুঝতে দিয়েছেন যে, নিজেদের রাষ্ট্রসঙ্ঘকে দেওয়া আশ্বাস তিনি প্রত্যাহার করছেন, যেখানে বলা হয়েছিল এই দ্বীপের তামিল অধ্যুষিত উত্তর ও উত্তর – পূর্ব এলাকায় স্বায়ত্ত শাসনের ব্যবস্থা করা হবে. এটা খুব একটা কম জয়ন্তী উত্সবের পক্ষে অপ্রিয় প্রশ্নের উদ্রেক করে নি”.

বিশ্বে খুব কম দেশ নেই, যেখানে মানুষ ঐক্যে, সহমতে ও শান্তিতে বাস করে থাকেন, কিন্তু এই বহুত্বের মধ্যে ঐক্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় না, বরং নমনীয় রাজনৈতিক মডেলের জন্যই হয়ে থাকে, যা করতে গিয়ে কোন না কোন প্রদেশের স্বায়ত্ত শাসন মোটেও বিরোধের কারণ হয় না. কারণ স্বায়ত্ত শাসন – এটা বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়, দেশের ভিতরেই একটি বা অন্য আরেকটি সম্প্রদায়ের জীবন. স্বায়ত্ত শাসন - এটা সমগ্র জনগনের এক সম্মানিত অংশ হওয়া ও নিজেদের মৌলিকত্ব রক্ষার একটি অনন্য উপায় মাত্র.

বিগত দশক গুলি ধরেই কলম্বোর কেন্দ্রীয় প্রশাসনের তামিলদের থাকার ঘন সন্নিবদ্ধ এলাকা গুলিতে কি করা দরকার, তা নিয়ে দৃষ্টিকোণের গুরুতর বিবর্তন ঘটে গিয়েছে. যখন তামিল ইলম স্বাধীন করার জন্য “টাইগাররা” তাদের ভয়ঙ্কর শক্তি প্রদর্শন করতে শুরু করেছিল, ভীত কেন্দ্রীয় প্রশাসন তখন অন্য ধারণার বশবর্তীই ছিল: উত্তর ও উত্তর পূর্বকে সবচেয়ে প্রসারিত স্বায়ত্ত-শাসনের সুযোগ দেবো, শুধু দেশ ভাগ হয়ে যাওয়া ও তামিল দেশের ইলম, যা নিয়ে তামিল ইলম টাইগারদের নেতা প্রভাকরণ ও তার সশস্ত্র ভাইয়েরা স্বপ্ন দেখছিল, তা তৈরী হওয়ার প্রয়োজন নেই.

কিন্তু আজ, যখন “টাইগাররা” হেরে গিয়েছে, রাষ্ট্রপতি রাজপক্ষে মনে করেছেন যে, তামিল স্বায়ত্ত-শাসনের ধারণাকে এবারে বর্জন করলেই হয়, আর তা এবারে মহাফেজখানায় ধুলো পড়ে পচুক. নিজেদের ক্ষমতা ও দেশের জন্য তা সহজে ও কোন রকমের বেদনা ছাড়াই খরচের খাতায় পাঠানো যেতে পারে. একটা নিয়ম রয়েছে: বিজয়ীদের কেউ সমালোচনা করে না. নিজেদের “টাইগারদের” বিরুদ্ধে জয়ী বলে মনে করে লঙ্কা রাষ্ট্রের প্রধান মনে করেছেন যে, এবারে তামিল এলাকা গুলি কলম্বোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে কোন ধরনের সম্পর্কের মডেলই গ্রহণ করবে. কারণ তাদের অন্য কোন পথও নেই.

ঠিক একই ভাবে কলম্বোর প্রশাসন আন্তর্জাতিক ভাবে সামরিক অপরাধের বিষয়ে তদন্তের বিরোধীতা করছে, যা তারা এই লড়াইয়ের সবচেয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে করেছিল. কিন্তু যদি শান্তিপ্রিয় মানুষ শুধু জঙ্গীদের হাতেই মারা গিয়ে থাকে, তবে কলম্বো কেন রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রধান বান গী মুনের উদ্যোগের এত জোর বিরোধিতা করছে? তিনি সেই ২০১০ সালে এই দ্বীপে গৃহযুদ্ধ চলাকালীণ সামরিক অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘণ নিয়ে তদন্তের জন্য স্বাধীন কমিশন তৈরীর কথা প্রস্তাব করেছিলেন. ইন্দোনেশিয়ার প্রাক্তন প্রধান অভিশংসক মারজুকি দারুসমানের নেতৃত্বে তৈরী রাষ্ট্রসঙ্ঘের কমিশন কেন সমস্ত প্রশ্নের ইতি করার অধিকার থেকে বঞ্চিত? কারণ এই দ্বীপে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে ফেলে রেখে গিয়েছে বিশাল সংখ্যক করোটির স্তুপ – আশি হাজারেরও বেশী প্রাণ.

এটা ঠিক যে, কলম্বোর কাজকর্মে আজ নিজেদের কারণ ও যুক্তি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. কিন্তু তামিল এলাকা গুলিকে রাজনৈতিক ভাবে স্বায়ত্ত-শাসন দিতে না চাওয়া দিয়ে ও তার জন্য তোলা বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ও একবিংশ শতকের প্রথমার্ধে ঘটা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ নিয়ে তীক্ষ্ণ প্রশ্নের প্রামাণ্য উত্তর দিতে না চেয়ে শ্রীলঙ্কা আজ ঝুঁকি নিচ্ছে শুধু বাইরের বিশ্বের সঙ্গেই নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলার নয়, বরং এই দ্বীপের দুটি প্রজাতির মধ্যেও.

ভগবান করুন যাতে এটা আবার করে শুরু না হয়.