গত সপ্তাহের শেষে আমেরিকার কাউন্সিল অফ ফরেন রিলেশনস আয়োজিত সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী পররাষ্ট্র সচিব শ্রীমতী হিলারি ক্লিন্টন খুবই উচ্চ মূল্যায়ণ করেছেন ভারতের “পূর্বের দিকে তাকাও” নামের পররাষ্ট্র নীতির.

“আমরা ভারতীয় “পূর্বের দিকে তাকাও” রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছি ও এখনও দিয়ে যাচ্ছি এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতিতে আরও এক বৃহত্ গণতন্ত্রের ঘন সন্নিবদ্ধ হওয়ার উপায় হিসাবে”.

এই বাক্যকে এশিয়ার আরও একটি নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্রের প্রতি স্রেফ সম্মান প্রদর্শন বলেই দেখা যেতে পারত, যারা বিশ্বে নেতৃস্থানীয় অবস্থানের দাবী করেছে ও গত ছয় সাত বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাদের সঙ্গে চেষ্টা করছে সম্পর্ক তৈরী করতে স্ট্র্যাটেজিক সহকর্মী দেশ হিসাবেই. কিন্তু যদি হিলারি ক্লিন্টনের এই কথাকে আরও সুদূর প্রসারিত আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করা যায়, তবে স্রেফ কূটনৈতিক ভদ্রতার চেয়ে তার একেবারেই অন্য অর্থ দাঁড়ায়.

এক বছরের কিছু আগে হিলারি ক্লিন্টন ও রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে ঘোষণা করেছিলেন এশিয়ার দিকে এক স্ট্র্যাটেজিক “দিক পরিবর্তনের”. একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার দেশ গুলিতে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধিও শুরু হয়েছিল – অস্ট্রেলিয়াতে, সিঙ্গাপুরে, ফিলিপাইনসে, আর তারই সঙ্গে এই এলাকার দেশ গুলির সঙ্গে সামরিক মহড়া সক্রিয় করা হয়েছিল.

এই নতুন স্ট্র্যাটেজির লক্ষ্য স্পষ্ট: চিনের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবকে সীমাবদ্ধ করা. আর ঠিক সেই কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রধান উদ্যোগ সেই দেশ গুলির সঙ্গেই শুরু করেছে, যাদের চিনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“সম্ভবতঃ বৃহত্ নিকটপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ঘটনা পরম্পরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা কিছুটা পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে, প্রমাণ করে দিয়ে যে, এই বিস্ফোরক এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও মনোযোগ দিতে যাওয়া আপাততঃ তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে. আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে একই সঙ্গে দুটি অঞ্চলে একই রকমের সাফল্যের সঙ্গে কাজ করা বোধহয় এখন আর সম্ভব হচ্ছে না. আর এই তো নিজের মার্কিন সেনেটে ভাষণ দিতে গিয়ে পররাষ্ট্র সচিব পদে প্রার্থী হওয়াকে সমর্থন করে নতুন পদাধিকারী জন কেরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় পরবর্তী কালে আরও বেশী সামরিক উপস্থিতির ফলে সাফল্যের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন. কিন্তু এটাকে ধরে নেওয়া উচিত্ হবে না যে, এই এলাকার কাজকর্মে অংশগ্রহণের বিষয়ে আপত্তি হিসাবে, স্রেফ এখন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কাজ করার বদলে সহযোগী রাষ্ট্র দের মধ্যে থেকে নিজেদের প্রক্সি বা বদলি দের দিয়ে কাজ করাতে চাইবে”.

এই নতুন বড় খেলায় বিশেষ ভূমিকা দিতে চাওয়া হয়েছে ভারতকে, মনে করেন বরিস ভলখোনস্কি. ভারতের এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় নিজেদের আইন সঙ্গত অর্থনৈতিক ও স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ রয়েছে, তার মধ্যে অনেক বিরোধ বিদীর্ণ সেই দক্ষিণ চিন সাগরেই. চিনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অনেক গুরুতর সমস্যা রয়েছে. আর ভারতের সেই সব দেশ, যেমন ভিয়েতনাম বা জাপানের সঙ্গে সক্রিয় সহযোগিতা চিনকে মোটেও হাল্কা ভাবে উদ্বিগ্ন করছে না.

বোঝাই যাচ্ছে যে, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার কাজকর্মে ভারতের ভূমিকার প্রশংসা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মোটেও ভারতের স্বার্থের বিষয়ে যত্ন নিচ্ছে না, বরং নিজেদের স্বার্থের কথাই ভাবছে. তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“বিগত বছর গুলিতে আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে একটা স্বপ্ননীল বিষয় হয়ে রয়েছে ভারতকে চিনের সঙ্গে ঠুকে দিয়ে তাদের সম্পর্ককে তীক্ষ্ণ বিরোধের পথে নিয়ে যেতে. এই ক্ষেত্রে কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থাকতে চাইছে তফাতে দাঁড়িয়ে. তাই আজ ভারত একটা নির্বাচনের সামনে পৌঁছেছে: এর মধ্যেই প্রাক্তন হয়ে যাওয়া মার্কিন পররাষ্ট্র সচিবের কথায় বিশ্বাস করে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার কাজকর্ম করা সমুদ্র পারের সহকর্মীর পথে অথবা এই এলাকার দেশ গুলির সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা, কোন রকমের বিরোধের পথে না নেমে”.

শেষমেষ. এমনকি খুবই গুরুতর এলাকা ও অন্যান্য সমস্যা থাকা স্বত্ত্বেও চিনের সঙ্গে ভারতের সফল আর্থ- বাণিজ্য সম্পর্ক তৈরী করতে কোন বাধা হয় নি আর বিশ্বের বহু প্রশ্নেই একজোট হয়ে কাজ করতেও অসুবিধা হয় নি, যার মধ্যে ব্রিকস গোষ্ঠীও রয়েছে.

কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যার দিকে যাচ্ছে – এটা তথাকথিত জিরো সাম গেম – বা যেখানে শেষে সকলেরই শুধু ক্ষতি বা লস – লস সিচুয়েশন তৈরী হয়. কিন্তু কাজ যেটা করা দরকার, তা হল এমন পরিস্থিতি এই এলাকায় তৈরী করা যাতে, সকলেই জেতে বা উইন-উইন সিচুয়েশন তৈরী হয়.