ন্যাটো জোটের সেনা বাহিনীকে আফগানিস্তান থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য লন্ডনে দুই দিন ধরে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও গ্রেট ব্রিটেনের নেতাদের মধ্যে সাক্ষাত্কার হচ্ছে. ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন আশা করেছেন যে, তাঁর অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যে সহযোগিতা সক্রিয় করার ফলে তালিবরা বাধ্য হবে অস্ত্র ফেলে দিতে ও শান্তি প্রক্রিয়াতে সমাকলিত হবে. কিন্তু এই ধরনের ঘটনা পরম্পরা মনে হচ্ছে খুবই কম সম্ভাব্য: জঙ্গীদের আক্রমণ খালি বেড়েই চলেছে ও তা হচ্ছে আরও দুঃসাহসী. বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন.

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই ও আসিফ আলি জারদারির মধ্যে আলোচনা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সকাশে হচ্ছে দুটি অধ্যায়ে. সোমবারে পরিকল্পিত শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের আগে রবিবারে সন্ধ্যায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর শহরের বাইরের চেকার্স নামক জায়গার বাসভবনে হয়েছে এক চুপচাপ সেরে ফেলা সান্ধ্যভোজের অনুষ্ঠান. এটা খুবই সংজ্ঞাবহ যে, এই ধরনের বৈঠকে প্রথমবার অংশ নিচ্ছেন সমস্ত পররাষ্ট্র দপ্তর, সামরিক বাহিনীর প্রধান দপ্তরের কর্তারা ও আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধানরা, আর তাদের সঙ্গেই রয়েছেন আফগানিস্তানের সর্ব্বোচ্চ শান্তি সভার নেতৃত্ব.

তিন দেশের নেতাদের এই তৃতীয় সম্মেলনের উদ্যোগ নিয়ে আহ্বান করেছেন ডেভিড ক্যামেরন. গত বছরের জুলাই মাসে তিনি কাবুলে এক সফরের সময়ে প্রস্তাব করেছিলেন কাবিল ও ইসলামাবাদের মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতা নিয়ে চুক্তি করার, যা আফগানিস্তান থেকে ২০১৪ সালের শেষের আগে ন্যাটো জোটের সেনাবাহিনী ফিরে যাওয়ার পরে দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে ভিত্তি হতে পারে. তাঁদের এর আগের সাক্ষাত্কার গুলিতে, যা হয়েছিল গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্ক শহরে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারন সভার নেপথ্যে, সেখানে রাষ্ট্রপতি কারজাই ও জারদারি এই ধরনের সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করার বিষয়ে সহমতে পৌঁছেছিলেন. যার প্রধান সূচক গুলিই লন্ডনে আলোচনা করা হয়েছে.

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে যে রকম জানানো হয়েছে যে, এখানের মূল আলোচ্য বিষয় হবে আফগানিস্তানের লোকদের পক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রণ সম্ভাব্য করার জন্য যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে ও বিশ্ব সমাজের পক্ষ থেকে এই গুলিকে সমর্থন করার জন্য কি ধরনের সমর্থন জানানো হবে, তা নিয়ে. এখন সঠিক সময়, যখন মনে করা দরকার যে, কাবুল ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক অনেকটা সময় ধরেই ছিল শীতল শান্তির সময়. এই রকম মনে করে সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“প্রত্যেক পক্ষই, যারা নিজেদের সন্ত্রাসের সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে পশ্চিমের জন্য এশিয়ার প্রধান জোট সদস্য বলে ভেবে এসেছে, তারা অন্য পক্ষকে দোষ দিয়েছে নিজেদের জোটের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করছে না বলে. ইসলামাবাদে জোর দিয়ে বলা হত যে, তারা বাধ্য হচ্ছে তালিবদের সঙ্গে একাই লড়াই করতে, কারণ কারজাই চুপ করে বসে আছেন ও তার দেশে পশ্চিমের কাছ থেকে পাওয়া সাহায্য চুরি হয়ে যাচ্ছে. কিন্তু আফগানিস্তানের পক্ষ থেকেও ঋণ শোধ করতে দেরী হয় নি, তারা আবার পাকিস্তানের সরকারকেই বর্তমানের আফগানিস্তানের সরকার ফেলে দেওয়ার জন্য তালিবদের সঙ্গে আঁতাত করছে বলে অভিযুক্ত করেছিল”.

এখানে বাড়াবাড়ি হবে না বললে যে, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে খুবই তীক্ষ্ণ বিবাদই ন্যাটো জোটের এশিয়া ছেড়ে যাওয়ার পরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত নতুন কাঠামো গড়ার কাজে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে. এই পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার আরও বেশী করেই নিজেদের পাক – আফগান প্রকল্প থেকে অব্যাহতি পেতে চাওয়ার বিষয়ে স্থিরপ্রতিজ্ঞ হওয়া দেখে ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে পশ্চিমের দিক থেকে বিচারের দায়িত্ব নিজেদের উপরে নিয়েছেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন. প্রাক্তন উপনিবেশের কর্তা আশা করছেন যে তিনিই প্রধান শান্তি স্রষ্টার মাল্য পরিধান করবেন, তাঁদেরই “ডিভাইড অ্যান্ড রুল” নীতি সংক্রান্ত স্লোগান পাল্টে নিজেদের সমস্যা নিজেরাই মেটাও বলতে গিয়ে নতুন স্লোগান দেবেন জোটে সামিল হও ও শাসন করো – “ইউনাইট অ্যান্ড রুল”.

কিন্তু কল্পিত এই পাক – আফগান জোট পশ্চিমের এখান থেকে যাওয়ার পরে তালিবদের একেবারে মেরে গুঁড়িয়ে দেবে, এই ধরনের ব্যাপার একেবারেই সত্যের ধারা কাছে হতে পারে বলে মনে হয় না. তালিবদের দুই দেশেই নতুন কতরে বেরিয়ে আসা দেখাচ্ছে খুবই দুঃসাহসী কারবার ও তা এখন অনেক প্রসারিত, আর তাদের শান্তি প্রক্রিয়াতে ঢুকিয়ে নেওয়ার রাজনীতিও কাজ করছে না. এই গত শনিবারেই তাদের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের উত্তর- পশ্চিমে এক সীমান্ত চৌকীতে হানা দেওয়া হয়েছে, যা আফগানিস্তানেরই সীমান্তের কাছে. হানা দিয়েছে গ্রেনেড লঞ্চার ও রাইফেল হাতে কোমরে আত্মঘাতীর বোমার বেল্ট পড়া তালিবরা. এক নৃশংস যুদ্ধে, যা চলেছিল বেশ কয়েক ঘন্টা ধরেই, কম করে হলেও পাকিস্তানের ১৩ জন সৈন্য নিহত ও ১০ জন শান্তিপ্রিয় মানুষ মারা গিয়েছেন. এর দায়িত্ব নিজেদের উপরে নিয়েছে পাকিস্তানেরই তালিবান আন্দোলনের শাখা.

আফগানিস্তানের এক উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার ও গেলমেন্দ প্রদেশে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কম্যান্ডার আমিন জান, লন্ডনের এই শীর্ষ বৈঠকের আগে ব্রিটেনের “দ্য মেল অন সানডে” সংবাদপত্রকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে পশ্চিমের নেতাদেরই অভিযোগ করেছেন যে, যারা আজ আফগানিস্তানে যত দ্রুত সম্ভব অপারেশন শেষ করতে চাইছেন, তারাই আফগানিস্তানে নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনী সম্বন্ধে ভুল ধারণা প্রচার করছেন. আমিন জানের কথামতো ন্যাটো জোটের সেনা দলের আফগানিস্তান থেকে তাড়াহুড়ো করে চলে যাওয়ার অর্থ হবে “বিশ্বময় জেহাদ” ঘোষণা ও কাবুলের প্রশাসনে তালিব ও “আল- কায়দা” দলের আগমন.

মনে করিয়ে দিই যে, সোভিয়েত সেনা বাহিনীর আফগানিস্তান থেকে চলে যাওয়ার পরে তালিবরা নাজিবুল্লার প্রশাসন উল্টে দিয়েছিল ও তারাই কাবুলে ক্ষমতায় এসেছিল. আজ যখন পশ্চিমের জোটের সেনা বাহিনীর ফিরে যাওয়ার দিকে ঘড়ির কাঁটা বিরামহীণ ভাবেই এগিয়ে চলেছে ও সময় খালি কমেই আসছে, তখন এক ন্যায্য প্রশ্নের উদ্ভব হয়: ইতিহাসের কি পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে?