বুধবারে পাকিস্তানের মন্ত্রীসভা বেলুচিস্তানের গাধার বন্দরের পরিচালনার ভার সিঙ্গাপুরের কোম্পানী পি এস এ ইন্টার ন্যাশনালের কাছ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে চিনের চায়না ওভারসিজ পোর্ট হোল্ডিং লিমিটেডের হাতে তুলে দিয়েছে. প্রাথমিক ভাবে এটা স্রেফ অর্থনৈতিক একটা ব্যবস্থা, কিন্তু তা আসলে অনেক দূরে যেতে পারে এমন একটি ভূ-রাজনৈতিক সম্ভাবনাও বয়ে এনেছে.

গাধার বন্দর বিশ্ব রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রয়েছে – বাস্তবে পারস্য উপসাগর থেকে আরব সাগরের বের হওয়ার একেবারে মুখেই. যে এই বন্দরের উপরে প্রভূত্ব করবে, তারই সম্ভাবনা থাকবে বিশ্বের প্রধান খনিজ কার্বন যৌগ উত্পাদনের কেন্দ্র স্থল থেকে বিশ্বের অন্যান্য এলাকায় পাঠানোর উপরে নিয়ন্ত্রণ করার. চিনের জন্য, যারা এই এলাকা থেকেই এক বিশাল অংশ দেশের প্রয়োজনীয় খনিজ কার্বন যৌগ পেয়ে থাকে, তাদের কাছে গাধার থেকে নিজেদের দেশে মাল পরিবহনের জন্য রয়েছে এক সংক্ষিপ্ততম পথ.

তাই চিনই এই গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রধান বিনিয়োগকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল – তাদের ভাগে প্রায় তিনের চতুর্থাংশ প্রাথমিক বিনিয়োগের ভার ছিল. এখানে বন্দর ছাড়াও চিন আগ্রহী ছিল রাস্তাঘাট ও পাইপ লাইন সংক্রান্ত পরিকাঠামো বসানোর জন্য, যা গাধার বন্দরকে তার পশ্চিমের এলাকা গুলির সঙ্গে জুড়ে দিতে পারত.

তাই এমনকি যদিও এখনও অবধি এই বন্দর পরিচালনার ভার রয়েছে সিঙ্গাপুরের এক বিশ্ব স্বীকৃত বৃহত্ বন্দর পরিচালনা কোম্পানীর হাতেই – তবুও চিন নিজেদের হাতে এই বন্দর পরিচালনা করার ভার নেওয়ার বিষয়ে কোন রকমের ইচ্ছা গোপন করে নি.

মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রী কামার জামান কাইরা ঘোষণা করেছেন যে, যাতে এই বন্দর সম্পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করতে শুরু করে, তার জন্য এর পরবর্তী কালের উন্নয়ন ও সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে, আর সিঙ্গাপুরের কোম্পানীর এর জন্য সম্ভাবনা নেই. চিন কিন্তু, তাঁরই কথামতো, এর মধ্যেই গাধার বন্দরে নতুন কুড়িটি বার্থ তৈরীর আশ্বাস দিয়েছে.

প্রসঙ্গতঃ, গাধার বন্দর পরিচালনার ভার চিনের হাতে দেওয়ার অর্থ অর্থনীতির কাঠামোর অনেক বাইরেই বেরিয়ে পড়েছে, বলে মন্তব্য করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“চিনের জন্য এই বন্দরের অর্থ স্রেফ লাভ করার দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হচ্ছে না, এমনকি শুধু নিকটপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে খনিজ কার্বন যৌগ ও অন্যান্য আনা জিনিষের পরিবহনের খরচ কমানোর দিক থেকেই দেখা হচ্ছে না. গাধার বন্দরের অর্থ হল যে, চিনের প্রধান ভূ- রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায় এক বছর আগে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছিল যে, তারা এবার থেকে প্রধান ভূ-রাজনৈতিক মনোযোগের কেন্দ্র নিকটপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায়. এই ঘোষণা সেই এলাকার চিনের সঙ্গে যে সব দেশের মোটেও ভাল সম্পর্ক নেই, সেখানে আমেরিকার সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে এক সাথেই করা হয়েছিল, আর তা মোটেও হঠাত্ করে নয়. অংশতঃ, ফিলিপাইনসে আর যা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সিঙ্গাপুরে – সেই রাষ্ট্রে, যা মালাক্কা উপদ্বীপ অঞ্চলের সবচেয়ে সংকীর্ণ এলাকার দক্ষিণ সীমানায় রয়েছে, আর বাস্তবে যে এলাকা দিয়ে চিনে খনিজ তেল ও গ্যাস সরবরাহের একমাত্র সামুদ্রিক পথ রয়েছে”.

এই ভাবেই যদি বর্তমানের উত্তেজনা চিন ও তার প্রতিবেশী দেশ গুলির মধ্যে আরও বাড়তেই থাকে ও তা পরে কোন খোলাখুলি বিরোধে পরিণত হয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খুব সহজেই নিজেরা চিনে সরবরাহের পথ বন্ধ করে দিতে পারে, যার ফলে তাদের কাছে খুব বেশী হলে দুই সপ্তাহের মতো মোটে জ্বালানীর সঞ্চয় থাকবে.

এই কারণ দিয়েই সেই বাস্তবকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব যে, কেন বিগত বছর গুলিতে চিন খুবই সক্রিয় ভাবে তাদের সেই স্ট্র্যাটেজি কাজে পরিণত করতে চাইছে, যার নাম মুক্তামালা. এই মালাতে গাধার বন্দরকে সবচেয়ে বড় মুক্তার মতই দেখা হচ্ছে, যা মায়ানমার, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কায় ও সম্ভবতঃ মালদ্বীপেও বন্দর, খনিজ তেলের ভাণ্ডার ও নজরদারি করার স্টেশনের সঙ্গে নানা ধরনের এই মালার আরও মুক্তার মতই তৈরী করা হচ্ছে. আ এই সব পরিকল্পনা ভারতকেও উদ্বিগ্ন করেছে, যারা নিজেদের সামুদ্রিক ভাবে ঘেরাও হয়ে যাওয়া বলে মনে করছে.

২০১১ সালে পাকিস্তানের তত্কালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আহমেদ মুখতার একেবারে সরাসরিই চিনকে আহ্বান করেছিলেন গাধার বন্দরে সামরিক নৌবাহিনীর ঘাঁটি তৈরী করার জন্য. তখন চিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটু এড়িয়ে গিয়ে উত্তর দিয়েছিল যে, তাদের এই ধরনের অনুরোধ সম্বন্ধে কিছুই জানা নেই.

কিন্তু বিশ্ব জোড়া ভূ-রাজনৈতিক বিরোধ বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে যা এক বিস্তৃত এলাকায় একেবারে নিকটপ্রাচ্য, আফ্রিকা মহাদেশ থেকে শুরু করে চিনের সীমানা ধোয়া সমুদ্রতটে গিয়ে পৌঁছেছে, তাতে এই গাধার বন্দরের মতো বাণিজ্যিক কারণে তৈরী বন্দরের সামরিক বন্দরে পরিণত হওয়া সম্ভাবনাকে বাদ দেওয়া যেতে পারে না.