গাগ শহরের স্থায়ী সালিশী আদালত এক মামলার শুনানী শুরু করতে চলেছে, যা ভারত মহাসাগরে চাগোস দ্বীপপূঞ্জকে গ্রেট ব্রিটেনের তরফ থেকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা বলে ঘোষণা সম্বন্ধে জড়িত. একজন ভাল করে জানা লোকের জন্য এই ধরনের বাক্য বিন্যাস খুবই অদ্ভুত লাগতে পারে: মনে হতে পারে যে, এক বিশাল সামুদ্রিক এলাকাকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হলে তাতে আর খারাপ কি, বরং প্রাকৃতিক সম্পদ ও ঐশ্বর্য সংরক্ষণের জন্যই সেখানে বোধহয় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে.

কিন্তু সব কিছু মোটেও এত সহজ নয়. খুবই সম্ভবতঃ, এই ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রশ্ন গুলি শুধুমাত্র একটা খুবই বাস্তব প্রয়োজনীয় অন্য ব্যাপার ঢাকা দেওয়ার জন্য করা হয়েছে.

ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক. চাগোস দ্বীপপূঞ্জ – এটা তথাকথিত ব্রিটেনের ভারত মহাসাগরীয় এলাকা. ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত মরিশাস কে রাজধানী করে এই দ্বীপপূঞ্জ ব্রিটেনের উপনিবেশের মধ্যেই ছিল. ১৯৬৫ সালে মরিশাস স্বাধীন হওয়ার তিন বছর আগে, ব্রিটেন চাগোস দ্বীপপূঞ্জকে এর থেকে আলাদা করে দিয়েছিল, আর পরিণতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই দ্বীপপূঞ্জের সবচেয়ে বড় দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়া সামরিক নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর ভারত মহাসাগরীয় ঘাঁটি বানানোর জন্য ভাড়ায় দিয়েছিল.

এই সময়ে আবার ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে এখানের সমস্ত অধিবাসী স্থানীয় মানুষ জনকে, যারা প্রায় সংখ্যায় ছিলেন দুই হাজার, তাদের জোর করে এখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল. যাতে চাগোসের বাসিন্দারা তাদের ঘর বাড়ী ছেড়ে চলে যায়, তাই ব্রিটেনের সরকার এখানের প্রায় হাজার খানের পোষ্য কুকুরকে গ্যাস প্রয়োগ করে মেরে ফেলেছিল, যাতে এখানের লোকরা দেখতে পায়, যদি তারা চলে যেতে না চায়, তবে তাদের জন্য কি ভবিষ্যত অপেক্ষা করে রয়েছে.

তার পর থেকেই এই দ্বীপপূঞ্জ প্রায় কোন রকমের বাধা ছাড়াই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে রয়েছে. দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপ, যা ভারত মহাসাগরের সবচেয়ে কেন্দ্র স্থলে রয়েছে, তা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারী বোমারু বিমানের ঘাঁটি, যা একাধিকবার ব্যবহার করা হয়েছে গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে বর্তমানেও ইরাক ও আফগানিস্তানের এলাকায় বোমা বর্ষণের জন্য.

এই সব দ্বীপ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া চাগোস এলাকার বাসিন্দারা এই সমস্ত বছর ধরেই নিজেদের ভিটে মাটিতে ফেরার লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন. কিন্তু তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা নিষ্ফল হয়েছে.

২০০৯ সালে ব্রিটেনের সরকার ঘোষণা করেছে যে, এই চাগোস দ্বীপপূঞ্জ বিশেষ ভাবে সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকা. অন্য সব কিছুর মধ্যে এটার মানে হল মরিশাস ও চাগোসের লোক সমেত বিশ্বের সমস্ত দেশের লোকদেরই এর কাছাকাছি এলাকায় মাছ ধরতে যাওয়া বারণ. শুধু আমেরিকার সামরিক ঘাঁটির লোকদের জন্যই আলাদা সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে. আজ আমেরিকার সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনের জন্য প্রতি বছরে প্রায় তিরিশ হাজার টন মাছ ধরা হচ্ছে. কিন্তু এখানে প্রধান ব্যাপার হল – এই ধরনের সংরক্ষিত এলাকা তৈরী করা হলে, চাগোসের লোকদের আর কোনদিনই নিজেদের ভিটে মাটিতে ফেরা হবে না.

তাই আন্তর্জাতিক সালিশী আদালতের সিদ্ধান্ত যে, এই সংরক্ষিত এলাকা তৈরী করার নির্দেশ কতটা আইন সম্মত হয়েছে, তা লন্ডনের স্নায়বিক বৈকল্য বাড়িয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এমনকি যদি আদালত চাগোসের বাসিন্দাদের পক্ষেও কোন রায় দেয়, তবুও খুবই সন্দেহ রয়েছে যে, এই ব্যাপারটা একটা অনড় বিন্দু থেকে কোন দিকে যাবে বলে. পশ্চিমের স্ট্র্যাটেজির জন্য ভারত মহাসাগরে দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে সামরিক ঘাঁটির গুরুত্ব খুবই বেশী. ২০১৬ সালে এই ঘাঁটির ভাড়ার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে, আর কোন সন্দেহ নেই যে, তা গ্রেট ব্রিটেন বাড়িয়েও দেবে. বিগত বছর গুলিতে এই এলাকায় চিনের সামরিক নৌবাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে বলেই (তার মধ্যে আবার চাগোস দ্বীপপূঞ্জের পাশেই মালদ্বীপে চিনে ঘাঁটি রয়েছে), এখানে ঘাঁটি হারানোর অর্থ হল যে, বিশ্ব ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিজেদের স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান হারানো”.

আর স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান রক্ষা করার জন্য এমনকি চোখ বন্ধ করে রাখাও যেতে পারে নানা রকমের প্রজাতি উচ্ছেদ সংক্রান্ত ঘটনার প্রতি, যা চল্লিশ বছর আগেই করা হয়েছে, আর বাইরে থেকে এটাকে ধামাচাপা দেওয়া ব্যবস্থা করা যেতেই পারে প্রাকৃতিক সংরক্ষিত এলাকা নাম দিয়ে. এমনকি যদি আসলে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করা হয় শুধু আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি – তাহলেও. এখানের প্রবাল দ্বীপ সমেত অমূল্য ইকোসিস্টেম যদি এর জন্য চুলোয় যায় তা হলেও গ্রেট ব্রিটেন ও আমেরিকার কিছু যায় আসে না.