মালির ঘটনা চিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের উপরে আঘাত করছে. আর চরমপন্থী ঐস্লামিকদের কাজকর্ম এবং ফ্রান্সের সামরিক বাহিনীর অনুপ্রবেশ এই দেশের খনিজ তেল, ইউরেনিয়াম, সোনা ও সুতি বস্ত্র এবং রাসায়নিক ফসফেট সারের সম্ভারের দিকে চিনের অগ্রগতির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতেই পারে. এই বিষয়ের প্রতিই মালিতে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় ক্রীড়নকদের অবস্থান বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন.

চিন খুবই সক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রপতি আমাদু তুমানে তুরের সময়ে মালিতে ঢুকেছিল. চিন এখানে পরিকাঠামো গঠনের জন্য অর্থ বিনিয়োগ করেছে, অংশতঃ, বামাকো এলাকায় নিগের নদীর উপরে সেতু তৈরী করেছে, তারা এমনকি দেশের উত্তরে পৌঁছনোর জন্য দ্রুতগতি সম্পন্ন সড়ক নির্মাণও করতে চেয়েছিল. মালি থেকেও চিনের দিকে কাঁচামালের প্রবাহ শুরু হয়েছিল. মালির রপ্তানীর একের তৃতীয়াংশই ছিল চিনে.

প্রসঙ্গতঃ, বিগত বছর গুলিতে মালি থেকে চিনের রপ্তানীর পরিমান বাড়তেই থাকছিল. প্রাথমিক ভাবে সুতি বস্ত্র ও সোনার জন্য. একই সঙ্গে চিনের যন্ত্র নির্মাণ শিল্প থেকেও মালিতে জিনিষ রপ্তানি করা হচ্ছিল, যা ফরাসী উত্পাদকদের অবস্থান সঙ্কুচিত করে দিচ্ছিল, যারা ঐতিহ্যবাহী ভাবেই মালিতে বেশী প্রভাব বিস্তার করেছিল. চিন যত সক্রিয়ভাবে মালিতে ঢুকে পড়ছিল, তত দ্রুত গতিতেই স্থানীয় বাজারে ফরাসী অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছিল. হঠাত্ করেই বিশেষজ্ঞরা ২০১২ সালে আমাদু তুমানে তুরের প্রশাসনের হঠে যাওয়াতে ফরাসী লোকদের নেপথ্যে থেকে কাজকর্মের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেন নি, যিনি খোলাখুলি ভাবেই চিনের প্রতি সহমর্মীতা প্রদর্শন করেছিলেন.

মালি - চিনের আফ্রিকা মহাদেশে বিস্তার লাভের এক প্রদর্শনী মূলক উদাহরণ. এখন মালির ভাগ হয়ে যাওয়াতে এই শো কেস ভেঙে যেতেই পারে, এই রকম একটা সম্ভাবনাকে বাদ না দিয়ে আফ্রিকা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ আলেকজান্ডার ত্কাচেঙ্কো বলেছেন:

“আফ্রিকাতে চিনের অর্থনৈতিক স্বার্থ গত দশকে খুবই দ্রুত বেড়ে উঠেছিল. এই মহাদেশের এক বৃহত্তম বিশ্বমানের সহকর্মী দেশ হল চিন. আফ্রিকার সঙ্গে চিনের বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে ১০ হাজার কোটি ডলার অর্থমূল্যের চেয়েও বেশী. এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সঙ্ঘের সূচকের চেয়েও বেশী. তাই কোন সন্দেহ নেই যে, যে কোন রকমের বিস্তৃত অস্থিতিশীলতা চিনের অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়”.

প্রাথমিক ভাবে রয়েছে মালি দেশের উত্তরে খনিজ তেলের উত্পাদন ক্ষেত্রের ভাগ নিয়ে চিনের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত. এক সময়ে এই সব ক্ষেত্র গুলিতে অনুসন্ধানের কাজ করেছিল ইতালি, আলজিরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নাইজিরিয়া, কানাডা, ফ্রান্স ও কাতারের কোম্পানী গুলি. বোঝাই যাচ্ছে যে, মালি দেশের উত্তরে ফরাসী সামরিক বাহিনীর অপারেশনের অর্থ হল তাদের নিজেদের দেশের কোম্পানীদের সেখানে খনিজ তেল উত্পাদনের বিষয়ে সবুজ সঙ্কেত দেওয়া.

মালি – ফ্রান্সের প্রাক্তন উপনিবেশ, যা এই দেশের কোম্পানী গুলিকে বাস্তবে প্রায় একচেটিয়া ভাবে ইউরেনিয়ামের খনি গুলির উপরে আধিপত্য বিস্তার করতে সুযোগ করে দিয়েছে. তার অধিকাংশই এই দেশের উত্তরে রয়েছে. এর সঞ্চয়ের পরিমান মূল্যায়ণ করা হয়েছে এক লক্ষ টন. এটা ভারত ও চিনের সঞ্চয়ের চেয়েও বেশী. বাস্তবে মালি দেশের ইউরেনিয়ামের মালিক - ফ্রান্সের কোম্পানী আরেভা. তাই বোঝাই যাচ্ছে যে, ফরাসীরা মোটেও এই বাজারে নতুন শক্তিশালী খেলোয়াড়ের আবির্ভাবে খুশী নয়.

পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, ফসফেটের জন্যও মালি দেশের উত্তরে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি হবে. এই কাঁচামাল সার তৈরীর জন্য ব্যবহার হয়, যার অভাব বেশী করেই চিনে দেখতে পাওয়া যায়. বোঝাই যাচ্ছে যে, ফরাসীরা সব কিছুই করবে, যাতে সামরিক ফ্রন্টে সাফল্যের ঘটনা ঘটলে, তা থেকে তারা এই কাজের বাণিজ্যিক সাফল্যও বের করে নেবে.

এর অর্থ হল যে, মালি দেশের সমস্ত রকমের কাঁচামাল আর তারই সঙ্গে খনিজ তেল, সোনা ও ইউরেনিয়ামের জন্য লড়াই এবারে তীক্ষ্ণ হবে. এই প্রসঙ্গে চিন মোটেও সহজে নিজেদের ইতিমধ্যে জয় করে নেওয়া জায়গা ছেড়ে দেবে না. একই সঙ্গে এই মহাদেশে নতুন করে বাণিজ্যের জন্য অর্থনীতি গুলিতে সংগ্রামের পথও ত্যাগ করবে না. তার ওপরে লিবিয়ার ঘটনা, সুদানের রাষ্ট্র হিসাবে দুই ভাগে ভেঙে টুকরো হয়ে যাওয়া, এর মধ্যেই চিনের আফ্রিকা মহাদেশে স্বার্থের উপরে ভারী আঘাত হেনেছে. চিন তাদের নিজেদের জন্য স্থিতিশীল খনিজ তেলের উত্স হারিয়েছে, আকাশে ঝুলে রয়েছে পরিকাঠামোর জন্যে করা বহু হাজার কোটি ডলার অর্থমূল্যের বিনিয়োগ, লাভ করার ও প্রভাব বিস্তারের কল কাঠিও হারিয়ে গিয়েছে. এবারে তাদের সামনে বিপদ রয়েছে – মালি দেশকেও হারানোর.