ক্রিকেট দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা, এই কিছুদিন আগেও তা রাশিয়ার জন্য ছিল খুবই দূরের ব্যাপার. কিন্তু সেই দেশে, যেখানে বহু শতক ধরেই রুশী জনগনের মজার ব্যাপার ছিল লাপতা খেলা- যাকে অনায়াসেই এই ক্রিকেটের সহোদর ভগ্নী বলেই উল্লেখ করা যেতে পারে, সেখানে এখন ক্রিকেট রয়েছে. আপাততঃ তার উন্নতির স্তর ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার থেকে অনেক দূরে, কিন্তু এটা তো শুধু আপাততঃ...

২০০৭ সালে একটা ঘটনা ঘটেছিল, যা সম্ভবতঃ কখনও মনে করা হতে পারে ঐতিহাসিক বলেই. মস্কোর রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসবল ষ্টেডিয়ামে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলেছিল রাশিয়ার জাতীয় দল, যারা সেই দিনে ওয়েলসের কারমেল অ্যান্ড ডিস্ট্রিক্ট ক্রিকেট ক্লাবের সঙ্গে প্রথমবার সরকারি ভাবে খেলতে নেমেছিল. সেই রাশিয়ার জাতীয় দলে অবশ্য রুশ পদবির লোক খুঁজে পাওয়া যায় নি – এঁরা সকলেই ছিলেন সেই পদবির লোক, যা বলে দিয়েছিল যে, এঁদের জন্ম, দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান অথবা প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা দেশে হয়েছিল.

এক বিদেশী এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিয়েছিল, যা রাশিয়াতে ক্রিকেটের নব জন্মের কাজ করেছিল, অশ্বিনী চোপরা নামে এক ভারত থেকে আসা পড়ুয়া ও পরে পাকেচক্রে ব্যবসায়ী এবং তার বন্ধুরা বহুদিন ধরেই মস্কো শহরে নানা জায়গায় ক্রিকেট খেলায় অংশ নিচ্ছিল, সেটা শুরু হয়েছিল আশির দশকের শেষে ও নব্বইয়ের শুরুতে. তখন নিজেদের দেশ থেকে আনা ক্রিকেট ব্যাট ও বল দিয়ে খেলা হত, অনেক সময়ই সরঞ্জাম নিয়ে আসা যেত না ওজন ও বিমান বন্দর গুলির শুল্ক বিভাগের কর্মীদের অজ্ঞানতার কারণে. তাই প্রায়ই খেলা সীমাবদ্ধ থাকত একটা ব্যাট ও টেনিস বলের মধ্যেই. কিন্তু সময়ের সঙ্গে যখন রাশিয়াতে সমস্ত কিছুই নিয়ে আসা সম্ভব হতে শুরু করেছিল, তখন এসেছিল হাজারও বেআইনি জিনিষের সঙ্গে কিছু ভাল জিনিষও, যার মধ্যে ছিল, ক্রিকেটের সরঞ্জাম, পোষাক, ব্যাট বল, উইকেট এবং আরও অনেক কিছুই. এই অশ্বিনী চোপরা তখন কিছু সমবয়সীদের সঙ্গে নিয়ে এই খেলাকে ক্রিকেটের ইউনাইটেড লিগের একটি দল হিসাবে নথিবদ্ধ করেছিল. তারাই রাশিয়ার জাতীয় দল হিসাবে নিজেদের স্বীকৃতি দিয়েছিল ও মস্কোয় থাকা ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি দেশ থেকে আসা বিভিন্ন দেশের লোক, যারা ক্রিকেট খেলা ভালবাসেন ও তা খেলতেও চান, তাদের নিয়ে একটা বাত্সরিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল.

এর পরে তারা আরও এগিয়েছে. এখন এমনকি সারা রাশিয়া প্রতিযোগিতাও আয়োজন করা হয়ে থাকে, যদিও তাতে দলের সংক্যা হাফ ডজনও হয় না, তবুও এটা সাফল্য বলা যেতেই পারে.

২০১০ সালে ম্যাসিডোনিয়া দেশে বলা যেতে পারে এক ইংল্যান্ড বাদে বাকি ইউরোপের দল গুলির মধ্যে প্রতিযোগিতায় রাশিয়ার জাতীয় দল ফাইনালে উঠে খেলেছিল হাঙ্গেরীর দলের সঙ্গে. এটাই ছিল একেবারে সেরা ব্যাপার, কারণ হাঙ্গেরীর বেশী ভাল ও অভিজ্ঞ দলের কাছে হারলেও রৌপ্য পদক জয় সম্ভব হয়েছিল. এই প্রসঙ্গে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“এখানে প্রধানতঃ ভারতীয় ও অন্যান্য দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা লোকরাই খেলে থাকেন, যারা হয় রুশ নাগরিকত্ব নিয়েছেন অথবা এখানের গ্রীন কার্ডের হোল্ডার. যদিও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কমিটির নিয়ম যথেষ্ট নরম ও তাই এখানে শুধু দেশের নাগরিকদেরই জাতীয় দলে খেলার সুযোগ ঘটে না, এমনকি সেই সব লোকও খেলতে পারেন, যারা এই দেশে অন্তত পাঁচ বছর ধরে রয়েছেন, তবুও রাশিয়াতে ক্রিকেটের প্রসার কম হওয়ার কারণ হয়েছে রুশীদের এই খেলার প্রতি আগ্রহের অভাব. আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কমিটি অবশ্যই জানে যে, কোন কড়া নিয়ম এই দেশের জন্য করলে, এখানে ক্রিকেটের যতটুকু বা অস্তিত্ব রয়েছে, তাও আর থাকবে না. আর এটা ক্রিকেটের জন্যই খারাপ”.

ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশীপের রূপো – যদিও সরকারি ভাবে তেন কিছু বড় ব্যাপার নয়, তবুও রাশিয়ার মাপে এটাকে অবশ্যই বলা যেতে পারে সাফল্য, যতই ক্রিকেটের উচ্চ কোটির লোকরা এটাকে অবজ্ঞা করুন না কেন আর তারা তাদের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফেভারিট দলদের নিয়েই ব্যস্ত থাকুন না কেন.

প্রায়ই লোকের মুখে সন্দেহের কথা শুনতে পাওয়া যায়: রাশিয়াতে এই ভারত – অস্ট্রেলিয়া- ব্রিটেনের ক্রিকেটের কি প্রয়োজন, যদি রুশীদের নিজেদেরই লাপতা খেলা থেকে থাকে? আর যদি কিছু এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দরকারই হয়, তবে তার জন্য তো লাপতা খেলা, নিজেদের জাতীয় খেলা তো রয়েছেই.

লাপতা – এটা সত্যই, একেবারেই রুশী খেলা. প্রত্নতত্ববিদরা এই খেলার নানা রকমের জিনিষ এমনকি প্রাচীন নভগোরদ শহরের চিহ্ন খুঁজতে গিয়ে পেয়েছেন, আর সেই সময় ছিল চতুর্দশ শতকের স্তরে. অর্থাত্ বাদ দেওয়া যা না যে, লাপতা ক্রিকেটের চেয়ে পুরনো খেলা.

আর তা আবার ক্রিকেটের সঙ্গে অনেকটাই মেলে. লাপতা ও ক্রিকেট এটা প্রায় যমজ খেলা. দুটো খেলাতেই উদ্দেশ্য একই – ব্যাট দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর ছোঁড়া বলকে যত দূরে সম্ভব মেরে চেষ্টা করা যত বেশী বার সম্ভব মাঠের মদ্যে দিয়ে এদিক থেকে ওদিকে দৌড়ে রান তোলা যায়.

কখনও এক সময়ে লাপতা খেলা রাশিয়াতে এত জনপ্রিয় ছিল যে, তা খেলত রুশ দেশের ধনী দরিদ্র, বুদ্ধিজীবী নির্বিশেষে. কিন্তু পরে লাপতা খালার প্রতি আগ্রহ কমে গিয়েছিল. সুতরাং, লাপতা যারা পছন্দ করেন, তারা বলে থাকেন যে, এই খেলাকেই তো জনপ্রিয় করার চেষ্টা করলেই হত.

কিন্তু সেই সমস্ত লোকদের, যারা রাশিয়াতে ক্রিকেটের পক্ষে, তারা সব সময়েই একটা লোহার মত শক্ত প্রতিবাদী যুক্তি দিয়ে থাকবেন: ক্রিকেটের একটা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে. কারণ সেই সমস্ত একই ধরনের খেলার ক্ষেত্রে, যেখানে বল ও ব্যাট ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাতে আন্তর্জাতিক ভাবে বিস্তৃতি লাভ করা সম্ভব হয়েছে শুধু বেসবল ও ক্রিকেট খেলার.

সুতরাং রাশিয়ার মাঠে প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত লাপতা ও ক্রিকেটের খেলার মধ্যে বিজয় সম্ভবতঃ আগে থেকেই তৈরী করা রয়েছে ক্রিকেটের জন্যই.