অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্যে পরিস্থিতি আবারও ভারতের সংবাদপত্রগুলির প্রথম পাতায় উঠে এসেছে. ২৮শে জানুয়ারী সেই সময় সীমা পার হয়েছে, যে সময়ের মধ্যে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সুশীল কুমার শিন্ডে আশ্বাস দিয়েছিলেন রাজ্যের দশটি জেলাকে, যেগুলি ঐতিহাসিক ভাবে তেলেঙ্গানা নামে পরিচিত, তাদের আলাদা রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার.

সিদ্ধান্ত আবার করে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে. এটা যেমন অন্ধ্র প্রদেশ থেকে তেলেঙ্গানা আলাদা হয়ে যাওয়ার বিষয়, তেমনই তার বিরুদ্ধে থাকা মিছিল সমাবেশের সক্রিয়তাই বাড়িয়ে দিয়েছে. রবিবারে আঞ্চলিক দল তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি, যারা চেষ্টা করেছিল কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে ৩৬ ঘন্টা ধরে রাজ্যের রাজধানী হায়দ্রাবাদে বিরোধী সমাবেশ করার, তাদের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে.

তেলেঙ্গানার সমস্যা - একেবারেই নতুন নয় ও ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময়ে এর মূল প্রোথিত হয়েছিল. ১৯৫০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে সেই সময়ের রাজাদের শাসনের অধীনে থাকা রাজ্য গুলির মধ্যে ভাষার ঐক্য অনুযায়ী অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্য সমস্ত এলাকাকেই একত্রিত করে নিতে পেরেছিল, যেখানে জনতা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই তেলেগু ভাষায় কথা বলতো. কিন্তু তখনই রাজ্যের ভেতরের দিকের এলাকার লোকরা, যাদের সমুদ্রে বের হওয়ার পথ ছিল না, অর্থাত্ যারা সেই তেলেঙ্গানা রাজ্যেরই লোকজন, তারা প্রতিবাদ করেছিল নিজেদের এলাকায় যথেষ্ট কর্ম সংস্থানের সুযোগ না থাকাতে. এটাকে তাদের মতে এক করে দেওয়া ন্যায় সঙ্গত হয় নি বলে. কারণ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় আয়ের অসম বণ্টন আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল – অন্যায় রকমের জল ব্যবহারের নিয়ম. ফলে ১৯৫৬ সালে অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্য তৈরীর সময়েই তৈরী করা হয়েছিল, তথাকথিত “ভদ্রলোকের সমঝোতা”, যাতে সমস্ত রকমের আয় ও ছাড় সমানভাবে বণ্টন করা হয়. কিন্তু তেলেঙ্গানার সমর্থকদের মতে এই সমঝোতার ধারা পালন করা হয় নি ও ১৯৬০ সাল থেকেই আলাদা হয়ে যাওয়ার জন্য সক্রিয় লোকরা আন্দোলন শুরু করেছিল.

এই সংগ্রাম বিশেষ করে বিগত বছর গুলিতে সক্রিয় হয়েছে – যা হয়েছে ২০০০ সালে উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ ও বিহার রাজ্য থেকে আলাদা হয়ে উত্তরাখণ্ড, ছত্তিশগড় ও ঝাড়খণ্ড রাজ্য তৈরী হওয়ার সাফল্যের কারণেই. এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“তেলেঙ্গানার পরিস্থিতিতে প্যারাডক্স হল যে, অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের আওতার মধ্যে ভাষা বা সংস্কৃতি – ধর্মের কোন রকমের বিশেষত্বের কারণে এই রাজ্যের আলাদা হওয়ার মতো কোন কারণ নেই. এখানের বেশীর ভাগ জনতাই তেলেগু বলেন ও তাদের ধর্ম হিন্দুধর্ম (শুধু রাজধানী হায়দ্রাবাদ বাদে, যেখানে মুসলমানদের সংখ্যা বেশী ও সেই কারণেই নিজেদের মাতৃভাষা উর্দু বলে মনে করেন এমন লোকের সংখ্যাও বেশী). তাই আলাদা রাজ্য হওয়ার আন্দোলনকে কোন ভাবেই ধর্ম বা ভাষা বা প্রজাতিগত কারণে আলাদা হওয়ার আন্দোলন বলে ভাবা যেতে পারে না. এর মূল স্রেফ অর্থনৈতিক, আর তার কারণ হল স্থানীয় উচ্চ কোটির মানুষদের অর্থের প্রবাহকে নিজেদের প্রয়োজন মতো ঘুরিয়ে দেওয়ার অভিলাষ”.

ফলে একেবারেই কানাগলিতে গিয়ে ঠেকেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার – আর তাকেই সংবিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন রাজ্য সৃষ্টি বা তার অস্তিত্ব নষ্ট করা নিয়ে. যদি ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস তেলেঙ্গানা আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তারা তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতির পক্ষ থেকে সমর্থন পেতেই পারে, যারা ২০১৪ সালে নিজেদের রাজ্যে সর্বজনীন লোকসভা নির্বাচনে প্রায় ধরে নেওয়া যেতেই পারে যে, জিতবে. এই ভাবেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস তাদের জোটে ১৭টি লোকসভা সদস্যের সমর্থন পেতে পারবে. কিন্তু একই সময়ে অন্ধ্র প্রদেশের অন্যান্য অংশ থেকে ২৫ জন সদস্যের সমর্থনও হারাবে.

এই পরিস্থিতিকে ত্রিশঙ্কু অবস্থায় রেখে দেওয়া ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জন্য একটা হেরে যাওয়ার মতো পথ: তারা তেলেঙ্গানার তরফ থেকে কোনও সমর্থন যেমন পাবে না, তেমনই এই রাজ্যের অন্যান্য জায়গা থেকেও কোন রকমের স্পষ্ট সমর্থনও পাবে না. তাই বর্তমানের পরিস্থিতিতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা নষ্ট হয়ে যেতে বসার সময়ে, সারা দেশের পরিসরে খারাপ সমস্ত উপায়ের মধ্যে সবচেয়ে কম খারাপটিকেই বেছে নিতে হচ্ছে.

যদি এই পরিস্থিতিকে শুধু এখনও ঐক্যবদ্ধ অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্যেই আসন্ন নির্বাচনের বদলে দূরের ভবিষ্যতের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা হয়, তবে বলতেই হবে যে, তেলেঙ্গানার আলাদা হয়ে যাওয়া থেকে নাগরিকরা মোটেও লাভবান হবেন না. উচ্চ কোটির জন্য লাভ লক্ষ্য করতেই পারা যাচ্ছে, কিন্তু রাজ্য সৃষ্টি হলেই সেখানের লোকদের জন্য কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা আপনা থেকেই হতে পারে না.

সমগ্র প্রজাতন্ত্রের দিক থেকে এই আলাদা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আরও বিপজ্জনকই মনে হয়েছে. স্বাধীন ভারত থাকার সমস্ত সময়ের মধ্যেই তার একমাত্র আদর্শ ছিল এক খুবই কঠিন ভাবে সংজ্ঞা দেওয়ার যোগ্য “ভারতীয়ত্বের” মধ্যে. আজ সারা দেশের অনুপাতে অনেক বেশী করেই নিজেদের সম্বন্ধে জোর গলায় বলছে সমস্ত আঞ্চলিক দল গুলি, যারা সর্ব জাতীয় শক্তি গুলির পায়ের তলা থেকেই শক্তি কেড়ে নিচ্ছে. আর “ভারতীয়ত্বের” এই ধারণা আরও বেশী করেই মুছে যাচ্ছে. তেলেঙ্গানার আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদ বেশী করেই পরিস্থিতিকে ঘোরালো করতে পারে – তার মধ্যে দেশের অন্য জায়গাতেও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন গুলিকে নিজেদের উদাহরণ দিয়েও.