মালির ক্ষমতাসীন সরকারকে মদত দেওয়ার নামে আসলে নিজস্ব সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্খা পূরণের জন্য প্যারিসের প্রয়াসের দরুন আফ্রিকায় অকস্মাত পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে পড়েছে. হাঙ্গামা ঐ ছোট রাষ্ট্রটির সীমানা অতিক্রম করে গেছে. মালিতে ফরাসী ফৌজের সামরিক অভিযান শুরুর পরেপরেই আলজিরিয়ায় লোকজনকে বন্দী করে খুন করা হল, এরিত্রেতে রাষ্ট্রীয় অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা হল, সুদান ও জিম্বাবোয়েতে আভ্যন্তরীন গোলমাল নতুন করে জেগে উঠলো. এর পরে কোন দেশ?

মনে হচ্ছে, যে ইউরোপ আর আফ্রিকায় আমেরিকা ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মেনে নিতে রাজি নয় এবং সে নিজের মতো খেলতে চাইছে. বেটিংয়ের মূল্য খুব চড়াঃ আফ্রিকার বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ ও সুবিধাজনক ভৌগলিক অবস্থান. এবং এই ভূ-রাজনৈতিক বড় ম্যাচের খেলুড়েরা এমনিতেই অবহেলিত ঐ মহাদেশের বাসিন্দাদের স্বার্থের কথা আদৌ ভাবছে না.

মালির ঘটনাবলী উত্তেজনার নতুন অনুঘটক. আরব্য বসন্তের ক্ষণস্থায়ী বিরতি, যেখানে পাশ্চাত্যের মদতে বহু অসামরিক শাসনব্যবস্থার পতন ঘটেছে, হ্যাঁ, তারা সবাই হয়তো ভেজা বেড়াল ছিল না. কিন্তু তাদের জায়গা দখল করলো আরও অনেক বেশি অশুভ শক্তিরা – আপোষহীন বুনিয়াদপন্থীরা, যাদের লোলুপ দৃষ্টি গোটা মহাদেশের দিকে নিবদ্ধ. ফলশ্রুতিতে আবির্ভাব হয়েছে উত্তেজনার সুদৃঢ় কোমরবন্ধনীর সুদানে, সোমালিতে, আলজিরিয়ায়, লিবিয়ায়, মাদাগাস্কারে, মালিতে, নাইজেরিয়ায় ও অন্যান্য দেশে. যেকোনো মুহুর্তে রক্তগঙ্গা বইতে পারে এমন কয়েকটি দেশে, যেখানে এখনো টলমলে ভারসাম্য বজায় রয়েছে. আফ্রিকা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ সেরকমই মনে করেন –

গ্যাঁরাকল বাঁধাতে পারে মাদাগাস্কার. বহুবার মাদাগাস্কারের লোকেরা আফগানিস্তান সহ পৃথিবীর বহু দেশে মুসলিম জঙ্গীদের হয়ে যুদ্ধ করেছে, যেখানে পাশ্চাত্যের সভ্যতাকে প্রতিরোধ করা হচ্ছে. হতে পারে, ইসলামিদের শিকার হবে এমন সব দেশ, যেমনঃ ঘানা, বুর্কিনা-ফাসো ও নাইজেরিয়া. নাইজেরিয়ায় ইতিমধ্যেই অর্ধেক রাজ্যে অসামরিক শাসনব্যবস্থার বদলে শরিয়তি শাসন কায়েম করা হয়েছে.

মালিতে অভিযান দেখাচ্ছে, যে আফ্রিকা মহাদেশে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সংগ্রামের নতুন পর্যায় শুরু হল. এটা ঠিক, যে ঘোষনা করা শুভ উদ্দেশ্য সবসময় শুভ নয়. পশ্চিমী দুনিয়ার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য – আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ কব্জা করা – সোনা, তামা, ইউরেনিয়াম, হীরে, খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস. তবে এমনকি সত্যিকারের শুভ প্রয়াসের ফলও হতে পারে উল্টো. সেটা চরমপন্থী ইসলাম ও বিচ্ছিন্নতাবাদকে চাগিয়ে তুলতে পারে. আফ্রিকা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ভ্লাদিমির কুকুশকিন বলছেন, যে সন্ত্রাসবাদের চালিকাশক্তি আল-কায়িদার ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার হাত থেকে রেহাই পাবে না কেউ. –

আফ্রিকার উত্তরাঞ্চলে আরব দুনিয়ায় ও আফ্রিকার মধ্যাঞ্চলে কোনো রাষ্ট্রই আল-কায়িদার চোখরাঙানি অস্বীকার করতে পারবে না. কারন ওখানে সেভাবে সীমান্তে পাহারাই দেওয়া হয় না.

পশ্চিমী প্রতিদ্বন্দীদের মতোই ইসলামিরাও এলাকার সম্পদ বাগে আনতে চাইছে. এবং এটা অদূর ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত অশুভ পরিপ্রেক্ষিত. উদাহরনঃ লিবিয়া, যেখানে চরমপন্থী ইসলামিরা দেশের খনিজ তেল থেকে আয়ের দুই-তৃতীয়াংশ করায়ত্ত করে বিদেশে একমতাবলম্বীদের সাহায্য দিচ্ছে.

পশ্চিমী মিশনারীদের সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে – দ্রুত পরিবর্তনশীল আধুনিক দুনিয়ায় নিজেদের স্বার্থরক্ষা করার জন্য সাম্রাজ্যবাদী পন্থা ব্যবহার করা. এই বিষয়ে ‘রেডিও রাশিয়া’কে দেওয়া সাক্ষাত্কারে বলছেন ‘বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়া’ নামক পত্রিকার মুখ্য সম্পাদক ফেওদর লুকিয়ানভ. –

আরব দুনিয়ার পূর্বাঞ্চলে ও আফ্রিকায় এখন যা সব ঘটছে, তাতে গত আধা শতক ধরে যেনতেন প্রকারেন যে শাসন ব্যবস্থার মডেল কাজ করছিল, তা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে. কিন্তু এই শাসনব্যবস্থার ধ্বস থামানো যাবে না সাম্রাজ্যবাদী পন্থায় কোনোভাবেই. আর পশ্চিমী দেশগুলো যা করছে, সেটা সাম্রাজ্যবাদী কার্যকলাপ, তা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নিয়েই হোক বা না নিয়েই.

তথাকথিত সভ্য দেশগুলো মন্ত্রের মতো মুখে আউড়ে যাচ্ছে রক্তপাত বন্ধ করার কথা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা আর পাশাপাশি ঐ এলাকায় নিজেদের স্বার্থ গোছাতে ব্যস্ত, এমনকি শক্তিপ্রয়োগ করার মাধ্যমেও. ইসলামিরা উল্টোদিকে নতুন নতুন হামলার হুমকি দিচ্ছে, যার পরিণতি সর্বজনবিদিত – অসংখ্য হতাহত. আফ্রিকায় বড় যুদ্ধ পৃথিবীর কোনে কোনে প্রতিধ্বনি তুলবে. কিন্তু অভিজাত লোকজন, যারা বিশাল মুনাফা লুটছে ও রাজনৈতিক ফয়দা তুলছে, তারা ভেবে নিয়েছে, যে তারা সুউচ্চ প্রাচীরের আড়ালে নির্বিঘ্নেই দিনযাপন করবে.