শুরু করছি ‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’ অনুষ্ঠান. অনুষ্ঠানটি সংকলন করেছেন নিনা রুকাভিশনিকোভা আর স্টুডিওয় ভাষ্যকার কৌশিক দাস.

এই অনুষ্ঠানে আমরা আপনাদের পাঠানো প্রশ্নাবলীর ভিত্তিতে রাশিয়া সম্পর্কে জানিয়ে থাকি আমাদের পাঠক ও শ্রোতাদের. আর তাই ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মরিশাসের পাঠক ও শ্রোতাদের কাছে আমাদের আবেদন যত বেশি সম্ভব প্রশ্ন পাঠানোর. আজ আমরা উত্তর দের পরবর্তী প্রশ্নগুলিরঃ

রুশী পদবীর শেষে ‘ওভ’ বা ‘এভের’ অর্থ কি? যেমন, গর্বাচোভ, কালাশনিকভ, চেখভ? এই প্রশ্নটি আমাদের পাঠিয়েছেন পাকিস্তানের শেখপুর শহর থেকে নাভিদ আব্বাস, নূরজাহান, ইউসুফ ও মরিয়ম ফারুখি.

রুশবাসীরা ঠান্ডার হাত থেকে কিভাবে বাঁচে? আপনাদের দেশে তো তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রির নীচে নেমে যায়! আপনারা ঐ রকম আবহাওয়ায় থাকেন কেমন করে? – জিজ্ঞাসা করেছেন বিহারের হরপুর থেকে নীলেশ কুমার সিং.

পাকিস্তানের চারজন শ্রোতা – নাভিদ আব্বাস, নুরজাহান, ইউসুফ ও মরিয়ম ফারুখি জানতে চেয়েছেন রুশী পদবীর শেষে ‘ওভ’ বা ‘এভের’ অর্থ. এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে উল্লেখ করতে চাই, যে রাশিয়ায় এরকম পদবীও বহু প্রচলিত, যাদের শেষাংশে থাকে ‘ইন’. যেমন, পুশকিন, পুতিন ইত্যাদি.

সেভাবে দেখতে গেলে প্রাচীনকালে রুশদেশে পদবী ছিল না, ছিল শুধু নাম. পদবীর উদ্ভব শুরু হয় চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতাব্দীতে প্রথমে জমিদারদের মধ্যে, তারপরে বণিকদের মধ্যে, স্বাধীন কারিগরদের মধ্যে. ১৮৬১ সালে ভূমি ক্রীতদাস প্রথা উচ্ছেদ করার পরে কৃষকরাও পদবী নিতে শুরু করে.

অধিকাংশ রুশী পদবী নেওয়া হয়েছে নাম থেকে, পেশা থেকে, বসবাসের জায়গার নাম থেকে, ডাকনাম থেকে. ওভ বা এভ- এর অর্থ হল লোকের পরিবারভুক্ত থাকার. ইভান রাশিয়ায় সবচেয়ে প্রচলিত নাম. রোমানভ, যারা তিনশো বছর ধরে দেশ শাসন করেছে, তাদের পদবী এসেছে রোমান নাম থেকে.

এবার উদাহরন দিচ্ছি সেরকম পদবীর, যাদের আবির্ভাব হয়েছে পিতৃপুরুষের পেশার নাম থেকে. সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত কালাশনিকভের অটোমেটিক রাইফেল. প্রাচীনকালে রুশদেশে কালাশনিক বলা হতো তাদের, যারা পাঁউরুটি বানাতো. তারমানে প্রথম কালাশনিকভের বাবা ছিল পাঁউরুটি প্রস্তুতকারক.

আর মহান রুশী কবি আলেক্সান্দর পুশকিনের পদবী এসেছে ‘পুশকা’ মানে গোলা শব্দটি থেকে. বিজ্ঞানীদের অনুমান, যে তার পিতৃপুরুষরা ছিল গোলন্দাজ.

অনেক পদবী এসেছে ঠাট্টা করা নাম থেকে, যেমন, গর্বাচোভ. আগে ‘গর্বাচ’ বলে ডাকা হতো কুঁজো লোকেদের. আর মহান রুশী লেখক আন্তন চেখভের পদবীর উদ্ভব হয়েছে চোখ, চিখ, চেখ থেকে, যেরকম শব্দ করে লোকে হাঁচি দেয়. বোধহয় তার পিতৃপুরুষদের মধ্যে কেউ ঘন ঘন হাঁচি দিত?

মহান রুশী লেখক লেভ তলস্তোয়ের পদবীর শেষে ‘ওভ’ নেই. কেন? সব রুশী পদবীর শেষাংশেই ওভ, এভ বা ইন থাকে না. ‘তলস্তোয়’ মানে মোটা. জানা গেছে যে লেখকের এক পূর্বপুরুষ পঞ্চদশ শতাব্দীতে মস্কোর একচ্ছত্র অধিপতি রাজা ভাসিলির কাছে কাজ করতো, যিনি তাকে ‘মোটা’ বলে ডাকতেন. প্রথম জার ক্ষমতায় থাকা কালে লেখকের পূর্বপুরুষরা বিশেষ ভূমিকা প্রদর্শন করার সুবাদে জারের কাছ থেকে ‘কাউন্ট’ উপাধি পেয়েছিল.

পৃথিবীর প্রথম মহাকাশচারী ইউরি গাগারিনের পদবীর শেষে ‘ইন’. গাগারার অর্থ কি?

গাগারা – বিশাল জলপাখি, যাদের দেখলে অট্টহাসির কথা মনে পড়ে. প্রাচীনকালে হাসিহুল্লোড়ে লোকেদের নাম দেওয়া হতো গাগারা. এটা জমিদারদের পদবী. যখন ইউরি গাগারিন মহাকাশে গেছিলেন তখন আমেরিকায় বসবাসকারী একজন গাগারিন তাকে নিজের আত্মীয় বলে ঘোষনা করেছিল. বাস্তবে মহাকাশচারী গাগারিনের পিতৃপুরুষরা ছিল জমিদারের ভুমিদাস, যারা স্বাধীনতা পাওয়ার পরে জমিদারের পদবী নিয়েছিল – গাগারিন.

শুনেছি, যে আপনাদের দেশে শীতকালে তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রির নীচে নেমে যায়. আপনারা ঠান্ডার হাত থেকে কেমনভাবে বাঁচেন, ওরকম ঠান্ডা আবহাওয়ায় আপনারা থাকেন কেমন করে? – এই প্রশ্নটি পাঠিয়েছেন বিহার রাজ্যের হরপুর থেকে আমাদের বহুদিনের শ্রোতা নীলেশ কুমার সিং.

রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলে অধিকাংশ জায়গায় শীতকালে তাপমাত্রা মাইনাস দশ থেকে ত্রিশ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করে. আর উত্তরমেরুর কাছে অবস্থিত ইয়াকুতিয়ায় তাপমাত্রা মাইনাস পঞ্চাশ বা তার নীচেও নেমে যায়. ভারতীয় উপমহাদেশে আমাদের পাঠক ও শ্রোতাদের পক্ষে এটা কল্পনা করাও কঠিন. চারিপাশে সবকিছু বরফে ঢাকা, নদী ও সরোবরে জল জমে বরফ হয়ে যায়. বৃষ্টির বদলে আকাশ থেকে ঝরে বরফ...

ইদানীং মস্কোয় কদাচিত তাপমাত্রা মাইনাস ২৫-৩০ ডিগ্রি পর্যন্ত নামে. তবে কখনো সখনো নামে. ওরকম দিনগুলির জন্য অধীর হয়ে প্রতীক্ষা করে স্কুলের নীচু ক্লাসের ছেলেমেয়েরা. তখন তাদের ছুটি দেওয়া হয়. স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে তখন তারা উঠোনে বা মাঠে বা পার্কে খেলাধুলা করে. তবে আমরা সেই প্রশ্নের উত্তর দিইনি - আমরা ঠান্ডার হাত থেকে কিভাবে বাঁচি?

শুরু করবো এই বলে, যে সব বাড়িঘরে তাপদায়ী ব্যবস্থা আছে, যখন গরম জল, যা বিশেষ বয়লারে ফুটিয়ে পাইপের মধ্যে দিয়ে সব বাড়িতে পৌঁছায়. হাসপাতাল, স্কুল ও নার্সারির বাড়িগুলোর প্রতি বিশেষ নজর রাখা হয়. বাড়ির ভেতরে তাপমাত্রা ২০-২২ ডিগ্রির নীচে কখনো নামে না. তবে কখনো কখনো যান্ত্রিক গোলোযোগও ঘটে. বিশেষতঃ বয়লার ও পাইপলাইনে. যতক্ষণ মেরামতির কাজ চলতে থাকে শহরের বাসিন্দারা হয় রান্নাঘরে গ্যাস বার্নার জ্বালিয়ে ফ্ল্যাট গরম রাখে, নতুবা ইলেকট্রিক হিটার চালু করে. যখন বড়সড় গোলোযোগ হয়, তখন লোকেদের সাময়িকভাবে স্কুলবাড়ি বা অন্য কোনো সরকারী ভবনে ঠাঁই দেওয়া হয়, যেখানে গরম আছে.

গত ডিসেম্বর মাসে সেরকম একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল তুভা জাতীয় প্রজাতন্ত্রে অবস্থিত হোভু-আক্সি গঞ্জে. সেখানে অনতিবিলম্বে রুশ ফেডারেশনের জরুরী পরিস্থিতি দপ্তর লাইন দিয়ে গাড়ি পাঠিয়েছিল. উদ্ধারকর্মীরা সেখানে পৌঁছে দেয় ১৯০টি গরম করার চুল্লী ও ৬৫ টন খাদ্যদ্রব্য. তার আগে ঐ দপ্তর বিমানযোগে স্থানীয় তাপ বিদ্যুতকেন্দ্রের দ্রুত মেরামতি করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পাঠায়. গঞ্জের অধিকাংশ বাসিন্দাকে পার্শ্ববর্তী জনবসতি কেন্দ্রগুলিতে স্থানান্তরিত করা হয়. ঈশ্বরের কৃপায়, এরকম জরুরী পরিস্থিতির উদ্ভব হয় কালেভদ্রে.

আর গ্রামবাসীদের কি হাল হয়? সেখানে তো সেন্ট্রালাইজড হিটিং সিস্টেম নেই?

আমাদের গ্রামের বাড়িগুলোতে ইট দিয়ে নির্মিত চুল্লী আছে, যেগুলোকে কাঠ অথবা কয়লা দিয়ে গরম রাখা হয়. ঐ চুল্লীতে রান্না করা যেতে পারে, চুল্লীর ওপরে আরামে ঘুমানো যায়. এরকমই বড় রুশী চুল্লী. গ্রামবাসীদের, বিশেষতঃ বৃদ্ধবৃদ্ধাদের বাড়ি বাড়ি কাথ ও কয়লা পৌঁছে দেয় গ্রামীণ প্রশাসন দপ্তর. তবে আজকাল কদাচিত গ্রামবাসীরা বড় চুল্লীতে রান্না করে, সেজন্য আছে গ্যাস ওভেন অথবা ইলেকট্রিক ওভেন.

আর শীতকালে আমরা রাস্তায় বেরোই প্রচুর গরম পোষাকআষাক পরে. প্রবাদে বলেঃ খারাপ আবহাওয়া বলে কিছু নেই, আছে খারাপ পোষাক প্রত্যেক পরিবার আয়ের বড় একটা অংশ খরচ করে শীতের পোষাকআষাক কেনার খাতে – এক্ষেত্রে কেউ কৃপনতা করে না. গরম ওভারকোট, ফারের কানঢাকা টুপি, ফেল্ট শু, উলের গ্লাভস, মাফলার.

শহর ও গ্রামের সর্বত্র পরিবহন যানে উষ্ণতা থাকে, বিশে, তাপদায়ী ব্যবস্থা কাজ করে. মোটমাট আমরা শীতকাল ভালোবাসি এবং এ নিয়ে প্রচুর গান আছে. সেরকমই একটি গান এখন আমরা আপনাদের শোনাতে চাই. শীতকাল নিয়ে গান...

আমাদের অনুষ্ঠান রাশিয়ার আদ্যোপান্ত আজকের মতো এখানেই শেষ করছি. আমরা আপনাদের কাছ থেকে রাশিয়া সম্পর্কে নতুন নতুন প্রশ্ন সহ চিঠিপত্রের অপেক্ষায় থাকবো. ইন্টারনেটে আমাদের ঠিকানাঃ letters a ruvr.ru