ইউরোপের সামাজিক স্তর বিন্যাস এক নাটকীয় চরিত্র নিয়েছে ও তা ভীতিজনক ভাবেই তীক্ষ্ণ রূপ নিচ্ছে. এই বিষয়ে প্রামাণ্য হয়েছে ইউরো কমিশনের সামাজিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান নিয়ে শেষ প্রকাশিত রিপোর্ট. কিন্তু এই ভয়ঙ্কর ভেদ, যা সংখ্যালঘু ধনী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্রদের মধ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা হচ্ছে বাকী সস্ত বিশ্বেও.

দাভোস শহরে আয়োজিত বাত্সরিক অর্থনৈতিক ফোরামে বিশ্ব জোড়া এই বিভেদের প্রসঙ্গ ঐতিহ্য মেনেই তোলা হয়েছে. এবারে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে নোবেল বিজয়ী আমেরিকার অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিত্স কৃত প্রবন্ধ. তিনি উদাহরণ হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থ – সামাজিক পরিস্থিতির কথা তুলেছেন, তিনি নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার পাতায় এই রকমের একটা সিদ্ধান্ত করেছেন যে, এই ধনের অসাম্য উন্নয়নের পথই রুখে দিচ্ছে. ফলে আমেরিকার স্বপ্ন – জেদী কাজের বিনিময়ে ভাল জীবন – তা আস্তে হলেও আজ মরে যাচ্ছে.

বর্তমানের সঙ্কট – এটা অর্থনীতিতে লিবারেল ধরন নেওয়ার ফল, এই কথা উল্লেখ করে অর্থনীতিতে ডক্টরেট প্রফেসর নিকিতা ক্রিচেভস্কি বলেছেন:

“লিবারেল ধরণ হল সমস্ত প্রশ্নেরই এক এবং অদ্বিতীয় উত্তর দেওয়া: মানুষকে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ দেওয়া হোক. আর যদি তারা নিজেদের সেই রকম স্তরে কাজে লাগাতে না পারে, যা তারাই ঠিক করেছে, তবে এটা এই লোকদেরই সমস্যা ও প্রশাসন এই ক্ষেত্রে কিছুই করতে পারে না. একই সঙ্গে সারা বিশ্বেই অন্য এক ধরনের দৃষ্টিকোণ বেশী এগিয়ে রয়েছে, যা ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আয়ের পরিমানকে কিছুটা সমান করার কথা ভাবে. এটা শুধু গরিবদেরই প্রয়োজন নয়, যাদের, বড় করে দেখা হলে, প্রায় হারানোর মত কিছুই নেই, বরং বেশী করেই দরকার ধনীদের জন্য”.

কিন্তু আজ ইউরোপের মডেলের কর্মক্ষমতা নিয়েই সন্দেহ উত্পন্ন হয়েছে, যা বহু দিন ধরেই ভাবা হয়েছিল খুবই সফল. আগে যেমন ভাবা হত যে, ইউরোপ এক এমন জায়গা, যেখানে ধনী রাষ্ট্র গুলি দরিদ্র দেশ গুলিকে সাহায্য করে, আর ধনী নাগরিকরা হত দরিদ্রদের জন্য বেশী করেই কর দিয়ে থাকে.

এই প্রসহ্গে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সঙ্ঘের সদস্য ইগর দিদেঙ্কো বলেছেন:

“বর্তমানের পরিস্থিতি, তার মধ্যে সেই সমস্ত দেশে, যেমন ফ্রান্স, যদি দক্ষিণ ইউরোপের অথবা ইতালি, স্পেনের কথা ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলেও কম করে বললে, শেষ অবধি বাস্তব সম্মতই নয়. এটা বোঝা সম্ভব যে, যারা সমৃদ্ধ লোক, তাঁরা নিজেদের কিছু পরিমান অর্থ, সুযোগ ইত্যাদি ছেড়ে দিতে রাজী থাকতে পারেন, কিন্তু তা সেই সব সময়ে নয়, যখন ফ্রান্সের মতো নাগরিকের আয়ের শতকরা ৭৫ ভাগই কর হিসাবে নেওয়ার কথা ওঠে”.

সমস্যা সমাধানের পুরনো পদ্ধতি এই ধরনের খুবই ভাগ হয়ে যাওয়া সমাজে আর কাজ করতে চাইছে না – আর তার ফলে সারা বিশ্বেই দরিদ্র ও ধনীর মধ্যে খাদ বড় হয়ে যাচ্ছে. সকলেই বুঝতে পারছে যে, এটা শুধু অবাঞ্ছিতই নয়, বরং বিপজ্জনকও. বিগত সময়ে এই ধরনের পরিস্থিতি অবশ্যম্ভাবী ভাবে শেষ হয়েছিল বড় ধরনের যুদ্ধ দিয়ে. আর যদি বিশ্ব এই চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি না দেখতে চায়, তবে চাও আর নাই বা চাও পুরনো রোগ নিরাময়ের জন্য নতুন ওষুধ খুঁজতেই হবে.