পাকিস্তান তাদের দেশের জেলে থাকা সমস্ত আফগান তালিবদের মুক্তি দিচ্ছে. এই সব আফগানিস্তানের তালিবরা, যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তাদের নিজেদের দেশের জেলে রাখার ইচ্ছা নেই বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব জলিল জিলানি, তাঁর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আফগানিস্তানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আবু ধাবি শহরের এক ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের পরে. এক সম্মিলিত সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান নিয়ে দায়িত্ব প্রাপ্ত বিশেষ প্রতিনিধি ডেভিড পির্স ও আফগানিস্তানের উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ লুদ্দীনের সঙ্গে উপস্থিত হয়ে এই ঘোষণা করেছেন. “জেলে থাকা বাকী বন্দীদেরও ছেড়ে দেওয়া হবে, আমরা আমাদের শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সম্মিলিত ভাবে কাজ করছি”. আর যখন নিজেদের কানকেই বিশ্বাস করতে না পেরে সাংবাদিকরা আবার করে জিজ্ঞাসা করেছেন যে, এই আশ্বাস কি পাকিস্তানের জেলে বন্দী থাকা সবচেয়ে উচ্চপদস্থ বন্দী মুল্লা বারাদার – যে প্রাক্তন তালিবান নেতা মুল্লা ওমারের ডেপুটি, তার ক্ষেত্রেও খাটবে কি না, তখন জাভেদ জিলানি উত্তর দিয়েছেন: “আমাদের লক্ষ্য – সকলকেই ছেড়ে দেওয়া”.

তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আমেরিকার কূটনীতিবিদ এই প্রসঙ্গে বিশেষ হর্ষ প্রদর্শন করেন নি. এই ঘোষণা করা হয়েছে, খুবই সম্ভবতঃ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে মৌন সম্মতি পেয়েই, যারা তালিবদের এখনও “মধ্যপন্থী” ও চরমপন্থী এই দু ভাগেই ভাগ করে চলেছে. আর আফগানিস্তানের কূটনীতিবিদ কিন্তু ছিলেন খুবই আহ্লাদিত. কাবুল অনেক দিন ধরেই ইসলামাবাদের কাছ থেকে আফগানিস্তানের তালিবদের ছেড়ে দেওয়া নিয়ে দাবী করে আসছে, তারা হিসাব করছে যে, এই ভাবে দেশে জাতীয় শান্তি প্রক্রিয়াকে কানাগলি থেকে বের করে নিয়ে আসা যাবে. এই প্রসঙ্গে আফগানিস্তানের উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন যে, দেশের শান্তি প্রক্রিয়াতে “২০১৩ সাল হবে সিদ্ধান্ত মূলক”. আর এই মুহূর্ত ছেড়ে দেওয়া যায় না.

আসলে আফগানিস্তানের তালিবদের জেল থেকে ছেড়ে দেওয়ার কাজ পাকিস্তানে শুরু হয়েছে গত বছরের নভেম্বর মাসেই. তখন পাকিস্তানে ২০০৫ সালে গ্রেপ্তার হওয়া তালিবান প্রশাসনের প্রাক্তন আইন মন্ত্রী মুল্লা নুরুদ্দীন তুরাবিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল. আজ এই ব্যক্তিত্বকে দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বে কিছুটা ভুলে যাওয়া হয়েছে. আর তা শুধুশুধুই. কারণ তিনিই তালিবান শাসনের সময়ে প্রকাশ্যে প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা করেছিলেন. তার মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রতিধ্বনি তুলেছিল কাবুলের চত্বরে প্রাক্তন আফগান নেতা নাজিবুল্লার ফাঁসী, যার যৌনাঙ্গ ফাঁসীর আগে কেটে দেওয়া হয়েছিল. তাছাড়া. এই নুরুদ্দীন তুরাবি সারা দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বে প্রবল প্রতিবাদের ঝড় তোলা নির্দেশ দিয়েছিলেন বামিয়ানে বিখ্যাত বুদ্ধ মূর্তি ধ্বংস করে দেওয়ার. গত হেমন্তে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল কুখ্যাত জঙ্গী কম্যান্ডার আনোয়ার উল- হক মুজাহিদকে. তোরা-বোরা পাসে এই লোকই তালিবদের অপারেশনের নেতৃত্ব দিয়েছিল, যেখানে এক সময়ে বিশ্বের “এক নম্বর সন্ত্রাসবাদী” ওসামা বেন লাদেন লুকিয়ে ছিল.

যদিও এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাও একশরও বেশী তালিব এখনও পাকিস্তানে জেলে বন্দী রয়েছে. আফগানিস্তানের তালিবদের থেকে রেহাই পাওয়া নিয়ে পাকিস্তানের সরকারের সিদ্ধান্ত – বলা যেতে পারে, এক “জীবন্ত উত্তরাধিকার”, সেই ইসলামাবাদের তরফ থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তানে সামরিক অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে, যা আজ পাকিস্তানেরই রাজনীতিতে এক আমূল পরিবর্তন এনেছে. ২০০১ সালের হেমন্তে পাকিস্তানের তত্কালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল পারভেজ মুশারফ মার্কিন রাষ্ট্রপতি বুশের সঙ্গে আফগানিস্তানে সন্ত্রাস বিরোধী অপারেশনে যোগ দিয়েছিলেন. তারপরে পাকিস্তান শুধু নিজেদের দেশের জেলই আফগানিস্তানের তালিবদের দিয়ে ভর্তি করে নি, বরং আমেরিকার গুয়ান্তানামো জেলের বন্দী সরবরাহের জন্যও কাজ করেছিল.

আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন এই প্রসঙ্গে নিজের মত দিয়ে বলেছেন:

“ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে খুবই দ্রুত খারাপ হয়ে আসা সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে সন্ত্রাস বিরোধী কার্যকলাপের ক্ষেত্রে প্রভাব না ফেলে পারে নি. আরও একটি প্রধান ফ্যাক্টর হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান সংক্রান্ত রাজনীতিতে পরিবর্তন. আফগানিস্তান থেকে যত দ্রুত সম্ভব চলে যাওয়ার বিষয়ে সম্পূর্ণ রকমের মতিস্থির করে রাষ্ট্রপতি ওবামা জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝি প্রথমবার একমত হয়েছেন যে, তালিবরা একটা আইন সঙ্গত শক্তি ও তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতে অংশ নিতে তিনি আহ্বানও করেছেন. আর আফগানিস্তানে প্রথম দফায় অপারেশনের সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একেবারেই তালিবদের সঙ্গে কোন রকমের রফায় আসার বিষয়কে অগ্রাহ্য করেছিল”.

তারই মধ্যে বহু পর্যবেক্ষকই মনে করেছেন সমঝোতায় অরাজী তালিবদের “পোষ মানানোর” জন্য কাবুলের নীতি, যা বাস্তবায়ন করার জন্য আজ ইসলামাবাদও সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়েছে, তা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ. কারণ তালিবদের ছেড়ে দেওয়া মানেই এই নয় যে, তারা আরও বাধ্য হবে ও সমঝোতায় রাজী হতে চাইবে. স্বাধীন হতে পারলে তারা খুব সহজে আবার করে কারজাইয়ের প্রশাসনকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতের পুতুল মনে করে ফেলে দিতে চাইবে.

0তাছাড়া, কিছু সময়ের জন্য ভুলে থাকা, চরমপন্থী ইসলামের প্রসারের বিপদ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও আবার করেই বাস্তব হতে পারে. কারণ আফগানিস্তানে শুধু প্রতিশোধ নেওয়াটাই তালিবদের যথেষ্ট মনে নাও হতে পারে.