বর্তমানের অর্থনৈতিক সঙ্কটকে “রেডিও রাশিয়াকে” দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির পরামর্শদাতা অর্থনীতিবিদ ও রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর অ্যাকাডেমিশিয়ান সের্গেই গ্লাজেয়েভ “টাঁকশালের যুদ্ধ” বলেই সংজ্ঞা দিয়েছেন.

বাজারে অর্থনীতির সঙ্কটের সময়ে এলোমেলো অর্থের পরিমান প্রভূত, কারণ সেগুলির কোথাও কাজে লাগার উপায় নেই, তাদের মূল্য হ্রাস হচ্ছে. একই সময়ে প্রয়োজন পড়েছে দীর্ঘ কালীণ ঋণের – বিজ্ঞানের নতুন দিক ও প্রযুক্তির বিকাশের জন্য. এই “ক্ষুধা” প্রশাসন গুলি বাধ্য হচ্ছে মেটাতে, টাঁকশালের যন্ত্র চালু করে. দেখা যাচ্ছে যে, আধুনিক অর্থনীতিতে নগদ অর্থের নির্গম – এটা স্রেফ অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য অগ্রিম. রাষ্ট্র বাস্তবে ঋণ উত্পন্ন করছে, যা বাজারের বিনিয়োগ ক্ষেত্রের ফাটকাবাজরা ভোগ দখল করছে, সেই গুলিকে একেকটা “বুদ্বুদে” পরিণত করে ও তারাই মূল্যবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে. কিন্তু অন্য পথও রয়েছে এই সমস্যার সমাধানের জন্য, এটাই উল্লেখ করে সের্গেই গ্লাজেয়েভ বলেছেন:

“সেই জিতবে, যে প্রথমে নিজেদের জন্য অপরিমিত দীর্ঘকালীণ ঋণের উত্স বের করতে পারবে – আর এই পরিস্থিতির কারণেই রসদের ক্ষেত্রে একটা অগ্রাধিকার পাবে. কিন্তু এই রসদ ব্যবহার করাও জানা চাই: এই অর্থ নতুন প্রযুক্তি আয়ত্ত্ব করার জন্য ব্যবহার করতে হবে. বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দেশ গুলিতে সঙ্কট বিরোধী খরচের প্রধান অংশই এই কারণে ব্যয় করা হচ্ছে – জ্বালানী সাশ্রয়, নতুন প্রযুক্তির বিকাশে সহায়তা, পরিকাঠামো ইত্যাদি”.

গ্লাজেয়েভের কথা অনুযায়ী বাজারে বর্তমানে উপস্থিত ফাটকাবাজী করার মতো ঋণপত্রের পরিমান বিশ্বের সমস্ত কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক গুলির মোট জমা অর্থের চেয়ে বিশ গুণ বেশী. বিশ্বের সমস্ত বিনিময় যোগ্য মুদ্রার উত্স গুলি – সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় সঞ্চয় ব্যবস্থা, ইংল্যান্ড ব্যাঙ্ক, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ও জাপানের জাতীয় ব্যাঙ্ক বর্তমানে অপরিমিত ব্যাঙ্ক নোট ছাপানোর নীতি নিয়েছে. শুধু ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কই একবারে লক্ষ কোটি ইউরো ছেপে বের করছে.

বাস্তবে এই প্রধান বিনিময় যোগ্য মুদ্রার উত্স গুলিই বহুদিন ধরে বিশ্বে অর্থনৈতিক সংগ্রাম শুরু করেছে, বলে বিশ্বাস করে সের্গেই গ্লাজেয়েভ বলেছেন:

“আমরা এমন এক পরিস্থিতির সামনে পড়েছি, যখন যেমন রুশ রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে বলেছেন যে, দেশের দশটির মধ্যে নয়টি বাণিজ্যিক চুক্তিই করা হচ্ছে অফ শোর এলাকায়. তাহলে পাওয়া যাচ্ছে যে, আমাদের সম্পত্তি নিয়ে কেনাবেচা – আমাদের কল কারখানা, খনিজ দ্রব্যের খনি, সেই গুলির উপরে অধিকার, করা হচ্ছে অন্য আইনের আওতায়, আমাদেরকেই লুকিয়ে. আর এই ধরনের কেনাবেচার ক্ষেত্রে তারাই প্রাধান্য বিস্তার করছে, যারা হাওয়া থেকে টাকা ছাপাচ্ছে”.

অ্যাকাডেমিশিয়ান গ্লাজেয়েভ দৃঢ় বিশ্বাস করেন যে, এই ধরনের প্রভূত অর্থের উপস্থিতিতে, কিছু কাঠামোর জন্য, যারা প্রভাব দখলের জন্য, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগীদের দাবিয়ে রাখার জন্য লক্ষ্য স্থির করে রেখেছে, তাদের লক্ষ্য পূরণের জন্য এই ধরনের অর্থ পাঠানোতে কিছুই বাধা সৃষ্টি করতে পারছে না. অর্থ এতটাই বেশী যে, সামান্য অংশেও এই ধরনের অর্থের প্রবাহ নিয়ে দিক পরিবর্তন করলেই বিশ্বের যে কোনও দেশেই দানবিক আকারে সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে.

রাশিয়ার জন্য এই পরিস্থিতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে মনে রাখা যে, সস্তায় বিদেশী মুদ্রা – একটা ফাঁদ, যাতে দেশ একবার ১৯৯৮ সালে, তারপরে ২০০৭ সালে পড়েছিল, সেই কথা মনে করিয়ে দিয়ে সের্গেই গ্লাজেয়েভ বলেছেন:

“তখন বাস্তবে আমাদের সমস্ত কর্পোরেশনই অর্থনৈতিক সঙ্কট বিনিয়োগের বাজারে শুরু হওয়ার পরে মাত্র দুই দিনের মধ্যেই দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল. তাই আমাদের উচিত্ হবে বিদেশী ঋণের উত্স বদল করে দেশের আভ্যন্তরীণ ঋণের উত্স ব্যবহার করা. এই ব্যবস্থা সোভিয়েত দেশের সময়ে কাজ করেছে, যুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপেও কাজ করেছে. এর সাধারন প্রকৌশল খুবই সহজ: রাষ্ট্র ততটাই অর্থ বিনিয়োগ করে, যতটা দেশের দীর্ঘস্থায়ী বিকাশের জন্য প্রয়োজন”.

গ্লাজেয়েভের কথামতো, এই ধরনের কাঠামোয় খুব গুরুত্বপূর্ণ হল মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ, যাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ফাটকাবাজদের পক্ষে সস্তা রাষ্ট্রীয় ঋণ পাওয়া সম্ভব না হয় ও তা বিদেশী মুদ্রায় পরিণত করে রুবলেরই বিরুদ্ধে খেলা করা যায়. আর এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হল দেশের স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষেত্র গুলি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রাখা.