১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশে করা অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রখ্যাত ঐস্লামিক ধর্ম প্রচারক আবুল কালাম আজাদকে সোমবারে ফাঁসি দিয়ে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে. এই বিচার করা হয়েছে অপরাধীর অনুপস্থিতিতেই – গত বছরের এপ্রিল মাসে সে দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে গা ঢাকা দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে, সম্ভবতঃ সে রয়েছে পাকিস্তানেই. আদালত তার বিরুদ্ধে আনা আটটি হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে সাতটি প্রমাণিত বলেই স্বীকার করেছে.

পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার যুদ্ধ, - (স্বাধীনতা লাভের আগে বাংলাদেশের নাম এটাই ছিল), - এটা আধুনিক ইতিহাসে একটি সবচেয়ে রক্তাক্ত অধ্যায়. ১৯৭১ সাল শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগেই পাকিস্তানের সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর হাতে বিভিন্ন মূল্যায়ণ অনুযায়ী, তিন লক্ষ থেকে তিরিশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল. দুই থেকে চার লক্ষ মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল, তার উপরে আবার ধর্ষকামী এই রাজাকারদের কাছে তাঁদের বয়স কোনও বাধা ছিল না – তা যেমন হয়েছিল সাত আট বছরের বাচ্চা মেয়েরা, তেমনই হয়েছিল প্রায় বৃদ্ধা মহিলারাও. অর্থাত্ সেই কুকীর্তির বিষয়কে, যা এই যুদ্ধের সময়ে করা হয়েছিল, তাকে অনায়াসেই বলা যেতে পারে গণহত্যা বলে. এটা আবার বেশী করেই করেছিল, যারা নিজেদের কট্টর মুসলমান বলে এখনও প্রচার করে যাচ্ছে, তারাই.

২০০৮ সালে সারা দেশ জোড়া নির্বাচনের সময়ে প্রচারে নেমে বর্তমানের ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা, আনুষ্ঠানিক ভাবেই ঘোষণা করেছিলেন যে, সমস্ত যুদ্ধাপরাধীদের, যারা গণহত্যা ও অন্যান্য মানব সমাজের বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে, কাঠগড়ায় টেনে এনে দাঁড় করাবেন. এই বিচারের রায়ের প্রথম হয়েছে, এই আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে দেওয়া ট্রাইব্যুনালের রায়.

বিচার শেষ হওয়ার পরে বাংলাদেশের প্রধান অভিশংসক মহবুব আলম ঘোষণা করেছেন: “এটা আমাদের দেশের এক ঐতিহাসিক দিন. এটা মানব সমাজের জয়. বাংলাদেশের মানুষ একাত্তর সালের পরে আজ প্রথম সহজে শ্বাস নিতে পারছে”. গণহত্যা – সত্যই এক ভয়ঙ্কর অপরাধ, যার কোনও পুরনো হওয়ার মতো সময় সীমা হতে পারে না, আর তাই অভিশংসকের সঙ্গে একমত হওয়া যেতেই পারত. কিন্তু বেশ কয়েকটি বিষয় সাবধানতা প্রদর্শনের কারণ হয়েছে, এই কথাই উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“২০০৮ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষা সংস্থা গুলি খুবই সহর্ষে এই ট্রাইব্যুনাল তৈরী নিয়ে সমর্থন জানিয়েছিল. কিন্তু তার প্রাথমিক কাজ কর্মই দেখিয়ে দিয়েছে যে, সেটি বেশী করেই ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থের কথা ভেবে কাজ করছে, যত না আইনের স্বার্থ ভেবে. অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল, তাদের সকলেই ছিল বিরোধী পক্ষের লোক – প্রধানতঃ জামাত – এ- ইসলামি দলের সদস্যরা, যুদ্ধের বছর গুলিতে যারা পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাওয়ার বিপক্ষে ছিল ও তাদের সঙ্গেই ছিল বেশ কিছু দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতা খালেদা জিয়ার সমর্থক. তদন্তের সময়েও খুবই গুরুতর রকমের প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিল: তা চাপ দিয়ে তথ্য আদায় ও সাক্ষীদের উপরে চাপ সৃষ্টি করা নিয়েও উঠেছিল, অনেক সময়েই যারা অভিযুক্তদের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসেছিল, তারা কোন রকমের চিহ্ন না রেখেই নিখোঁজ হয়েছে বলে রটনা হয়েছিল. ফলে পরবর্তী কালে আন্তর্জাতিক ভাবে এই ট্রাইব্যুনালের কিছুটা মর্যাদাহানীও হয়েছিল”.

বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবন বিগত বছর গুলিতে দুই উজ্জ্বল মহিলার লড়াইয়ের মঞ্চ হয়েছে. একদিকে মুজিবুর রহমানের কন্যা ও বর্তমানের প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্য দিকে বাংলাদেশের নিহত সপ্তম রাষ্ট্রপতির স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া. এই লড়াইয়ে দুই পরিবারের একেবারেই জটিল ইতিহাসও যুক্ত হয়েছে, যে দুটিই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে উদয় হয়েছিল ও এই দেশের প্রথম স্বাধীন বছর গুলিতে তাদের বিকাশ ঘটেছিল.

মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে এক চক্রান্তের কারণে নিহত হয়েছিলেন প্রায় সপরিবারে. এই সময়ে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট নয়, মনে করা হয়ে থাকে যে, যদি তিনি সরাসরি এই চক্রান্তের সঙ্গে যুক্ত নাও থাকেন, তবুও কম করে হলেও তিনি এই চক্রান্তের খবর রাখতেন আগে থেকেই ও কোন রকমের সাবধান করে দেওয়ার কাজ করেন নি. তাই বর্তমানের এই অপরাধীদের বিচার ব্যাপারটিকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতির কন্যার পক্ষ থেকে তাঁর পিতার হত্যাকারীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত হিসাব মিটিয়ে ফেলার মতো করেও দেখা হতে পারে.

কিন্তু এখানে প্রধান ব্যাপার হল, যে এই বছরে বাংলাদেশে পরবর্তী পার্লামেন্ট নির্বাচন হতে চলেছে, আর বর্তমানের প্রশাসন খুব একটা সহজ সময় পার হচ্ছে না. এই পরিপ্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক স্মৃতির দিকে তাকাতে জনগনকে আহ্বান করা ও ক্ষমতাসীন দলের শত্রুদের প্রতি তারা সমগ্র জাতির শত্রু বলে অঙ্গুলি নির্দেশ করা দিয়ে প্রাক্ নির্বাচনী প্রচারের ক্ষেত্রে খুবই জোরালো এক যুক্তি হতে পারে.