রাশিয়ার তোমস্ক শহর এই দেশের একমাত্র শহর হয়েছে, যা “এশিয়ান নেটওয়ার্ক অফ মেজর সিটিজ ২১”, “এএনএমসি২১” (একবিংশ শতকের এশিয়ার বড় শহর গুলির মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে কাজকর্ম প্রতিষ্ঠান) এর সদস্য হতে পেরেছে. এশিয়ার প্রধান শহরগুলির এই নেটওয়ার্কে রয়েছে টোকিও, সিঙ্গাপুর, সিওল, হ্যানয়, ব্যাঙ্কক, দিল্লী, জাকার্তা, কুয়ালালামপুর, ম্যানিলা, সিঙ্গাপুর, তাইপে ও রেঙ্গুন. প্রায় সব কটিই এশিয়ার দেশ গুলির রাজধানী, আর একমাত্র তোমস্ক শহর – এটা সাইবেরিয়ার একটি রাজধানী নয় এমন শহর, যা যেমন ইউরোপের সীমান্ত থেকে তেমনই এশিয়ার এলাকা গুলি থেকেও সমান দূরত্বে অবস্থিত. এশিয়ার জন্য এই রুশ শহর কেন এত আকর্ষণীয়?

তোমস্ক – এটা এক বিশাল বৈজ্ঞানিক ও প্রশিক্ষণের ক্ষমতাশালী শহর: ৩৩টি বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান, ২টি জাতীয় গবেষণা কেন্দ্র, ৮টি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখানে রয়েছে. তোমস্কের বৈজ্ঞানিক গবেষণা নিয়ে এশিয়ার দেশ গুলি যেমন আগ্রহী, তেমনই এই শহরের বিদেশী নাগরিকদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে প্রচুর অভিজ্ঞতা সম্বন্ধেও তাদের আগ্রহ রয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে তোমস্কের প্রশাসনের আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক যোগাযোগ বিভাগের অধিকর্তা আলেক্সেই স্তুকানভ বলেছেন:

“শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের প্রাথমিক কাজের লক্ষ্য – এটা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও চিনের ছাত্রছাত্রীরা. এখন তোমস্ক শহরে প্রায় ছয় হাজার বিদেশী ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করছেন. আমরা আরও অনেককেই নিতে পারি আর বিশ্বাস করি যে, এটা খুব শীঘ্রই করা হবে. আমরা আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ এক এলাকার মর্যাদা অর্জনে সক্ষম হয়েছি. আমাদের এখানে বিশ্ব মানের বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন বেশ কিছু আধুনিক বিষয়ে: রেডিও নিয়ন্ত্রণ, অপটিক্স, নতুন ধরনের জ্বালানী শক্তি, পরিবেশের আধুনিক ভাবে পর্যবেক্ষণ ও অবশ্যই ন্যানো প্রযুক্তি”.

২০১২ সালে রাশিয়াতে করা একশটি সেরা আবিষ্কারের তালিকায় তোমস্কের পলিটেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির একটি আবিষ্কার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে. এখানে বিজ্ঞানীরা বিশ্বে প্রথম পদ্ধতি বের করতে সমর্থ হয়েছেন কি করে অন্যান্য পদার্থের উপরে হীরের ন্যানো পার্টিকেলের প্রলেপ দেওয়া সম্ভব হতে পারে. এটা কোন মূল্যবান পাথর তৈরীর জন্য কিন্তু করা হয় নি, বরং বিভিন্ন রকমের পদার্থের ধর্ম – যেমন ধাতু ও সেমি কণ্ডাক্টরের পাল্টানোর জন্য করা হয়েছে, বলে জানিয়েছেন এই বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রফেসর গেন্নাদি রেমনিয়েভ. এই কাজ এই ল্যাবরেটরীর অন্য অনেক আবিষ্কারের মতই মনে হয় লোকের প্রয়োজনীয় হবে, তাই তিনি যোগ করেছেন:

“আমরা বিন্দু সম তড়িত্শক্তি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে থাকি. বিদ্যুতের এক একটি প্রবাহ একেক রকমের পদার্থের আয়নের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে একেক রকমের ধর্ম পরিবর্তন করে, যার দিকে তা লক্ষ্য করে পাঠানো হয়েছে. যেমন, অন্য পদার্থের উপরে কিছু দিন আগে আমরা যে ন্যানো পার্টিকেলের আস্তরণ দিয়েছি হীরে দিয়ে, তা সেই পদার্থকেই অনেক মজবুত করে দিয়েছে. মনে হচ্ছে, আমাদের এই শেষের আবিষ্কার লাইট এমিটিং ডায়োড তৈরী ও সেমি কণ্ডাক্টর প্রযুক্তিতে কাজে লাগবে.

একই সময়ে তড়িত্শক্তি প্রবাহ দিয়ে শুধু শক্ত জিনিষের উপরেই নয়, এমনকি তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের উপরেও প্রভাব ফেলা যেতে পারে. বিশ্বে এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য, নর্দমার জল পরিশ্রুত করার জন্য, উত্পন্ন গ্যাস পরিবেশে বর্জনের আগে পরিশোধনের জন্য. আমাদের এই ক্ষেত্রে আবিষ্কার নিয়ে আগ্রহী হয়েছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া. প্রসঙ্গতঃ আমরা জাপানে এখন এমন যন্ত্র সরবরাহ করছি, যা চিকিত্সা ক্ষেত্রে, গন্ধ দ্রব্য উত্পাদনের সময়ে নির্বিজ করণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে”.

তোমস্কের ন্যানো প্রলেপ দেওয়ার প্রযুক্তি রুশ – জার্মান যৌথ প্রকল্প “মোজে সেরামিক ইমপ্ল্যান্ট” কারখানাতে ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে বানানো হয় কৃত্রিম প্রত্যঙ্গ, যার সমকক্ষ কোনও জিনিষ আজ বিশ্বের বাজারেই নেই, এই কথা উল্লেখ করে এই কোম্পানীর ডিরেক্টর আলেক্সেই কারলভ বলেছেন:

“আমরা কব্জি, পায়ের গোড়ালি, আঙ্গুলের হাড়ের বদল করে লাগানোর উপযুক্ত সমস্ত রকমের সেরামিক প্রত্যঙ্গ তৈরী করে থাকি. কিন্তু তোমস্কের বিশেষজ্ঞরা জার্মানীর আবিষ্কারের উপরে ন্যানো প্রলেপ লাগিয়ে তা আরও সমৃদ্ধ করেছেন. এই ধরনের জৈব প্রলেপ দেওয়ার ফলে এই ধরনের প্রত্যঙ্গ শরীরের সঙ্গে আরও সহজে জোড়া হতে পারে. এখন এক প্রথম পর্যায়ের কারখানা চালু করা হয়েছে ও নানা ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা ও গবেষণা করা হচ্ছে. আগামী বছরে আমরা এই রকমের জিনিষ বাজারে আনতে চলেছি, যার বিশ্বে কোনও রকমের তুলনা যোগ্য কিছু নেই. এই ধরনের ইমপ্ল্যান্ট নিয়ে বিশ্বের ২৬টি দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে. বর্তমানে আমরা ভারতের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করছি: সেখানে আমাদের পরীক্ষা মূলক ল্যাবরেটরী রয়েছে, কারখানা খোলা হয়েছে কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য যন্ত্র তৈরী করতে. আগামীতে তৈরী জিনিষ ভারতের ৫০০টি ক্লিনিকে ডাক্তারদের কাছে দেওয়া হবে, এর অর্থ হল এক বিশাল বাজারে প্রবেশ করা”.

তোমস্ক এলাকায় গত পাঁচ বছরে সব মিলিয়ে দেড়শটিরও বেশী প্রতিযোগিতায় সক্ষম প্রযুক্তি আবিষ্কার করা হয়েছে, আর এই ধরনের উদ্ভাবনী মূলক প্রযুক্তি বিক্রয় থেকে পাওয়া অর্থের পরিমান হয়েছে ১৮ কোটি ডলারের সমান.