পাকিস্তানে বিপ্লবের সম্ভাবনা, যে বিষয় নিয়ে ঐস্লামিক ধর্মীয় নেতা তাহির কাদরির নেতৃত্বে “লক্ষ লোকের মিছিলে” বেরিয়ে আসা মানুষরা আওয়াজ তুলেছিল, তা আপাততঃ বাতিল হয়েছে. অথবা, বলা যেতে পারে, কম করে হলেও স্থগিত রাখা হয়েছে সাময়িক ভাবে. রাস্তার মিছিলে উত্তেজনার পারা চড়তে গিয়ে যখন একেবারে বিস্ফোরণের পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিল, ঠিক তখনই সরকার ও মিছিলের বিরোধী পক্ষের একটা সমঝোতাতে পৌঁছনো সম্ভব হয়েছে. নির্বাচনের আগে সরকার রাজী হয়েছে সমস্ত রাজনৈতিক শক্তির জন্যই গ্রহণযোগ্য এই রকমের একটা অন্তর্বর্তী কালীণ সরকার গঠনের. এরই উত্তরে তাহির কাদরি তাঁর লোকজনকে ইসলামাবাদের রাস্তা আর মাঠ থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছেন. দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটা খুবই তীক্ষ্ণ সঙ্কট মুহূর্ত পার হতে পেরেছে, কিন্তু তাদের সামনে এখন নতুন পরীক্ষা বাকী রয়েছে.

একটা প্রাচীন সংস্কৃত প্রবচন রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে. “সেই জয়ী হয়, যাঁকে জয় পরাজয় ছুঁতেই পারে না”, এটাই পাকিস্তানের সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনার সম্পূর্ণ রকমের একটা বর্ণনা হতে পারে.

“ইজিপ্টের তহরির” – কায়রোর চিত্রনাট্যের মত করে রাস্তার ও মাঠের বিপ্লব, যা দিয়ে পাকিস্তানের সরকারকে বহু লক্ষ লোক তথাকথিত “লক্ষের মিছিলে” যোগ দিয়ে ভয় দেখাচ্ছিলেন, তা একটা চোখে পড়ার মতো স্লোগান হয়েই রয়ে গিয়েছে. মিটিংয়ের এই চলতেই থাকা, যা ইসলামাবাদকে হঠাত্ই ঘূর্ণি ঝড় বা বিষুবরেখা অঞ্চলের প্রবল ধারাপাতের মতো শুরু হয়ে অচল করে দিয়েছিল, তা চলে যাওয়া পরে রয়ে গিয়েছে বিপুল জঞ্জাল ও অনেক নতুন প্রশ্নের সারি, যেমন, এটা আসলে কি ছিল? লোকের মাথা পাগল করে দেওয়ার মতো সাময়িক কোনও উত্তেজনা, নাকি কারও খুবই হিসেব করে করা রাজনৈতিক অঙ্ক, যেখানে পরিবর্তনের জন্য হন্যে হয়ে ঘোরা বিপুল জনতাকে জনতার ভূমিকাতেই অভিনয় করিয়ে নেওয়া হয়েছে, অথবা এটা আরও একটি উদাহরণ যে, পাকিস্তানের সমাজ এবারে রাজনৈতিক ভাবেই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠছে আর সেখানেও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরী হচ্ছে? আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন মনে করেন যে, একটা সাময়িক সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছনো যেতে পারে, তাই তিনি বলেছেন:

“দেখাই যাচ্ছে যে, এই বিরোধের কোন এক পক্ষও এর থেকে জয়ী হয়ে বের হতে পারে নি. কিন্তু এটা সেই রকমও যে, কোন পক্ষই হেরে যায় নি. রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে “প্রাক্তন” বলে নাম দিয়ে ও দেশের পার্লামেন্টের সদস্যদের উপরে প্রবল ক্ষোভ উদ্গীরণ করে তাহির কাদরি নিজের সবচেয়ে বড় পরিকল্পনা সেই রূপায়ণ করতেই অসমর্থ হয়েছেন. দেশের নেতৃত্ব তাঁর চরম নির্দেশ মানে নি ও পদত্যাগও করে নি. পার্লামেন্ট, এই অবাক করা জনাব কাদরি যার “অস্তিত্বই মানতে চান নি”, তাও নিজের কাজই করছে.

তাহলে এই “মিছিলের” অংশগ্রহণকারীরা কি পেল? খুব একটা কম লাভ তাদেরও হয় নি. সরকার তাদের সত্যিকারের রাজনৈতিক শক্তি বলে স্বীকার করে নিয়েছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে বসেছে ও এমনকি রাস্তার বিরোধীদের সঙ্গে ইসলামাবাদ বিবৃতি বলে প্রকাশিত পত্রে স্বাক্ষরও করেছে. সরকার আশ্বাস দিয়েছে যে, সংবিধান সম্মত ভাবেই পাকিস্তানে নির্বাচন করা হবে ও তা একেবারেই নির্দিষ্ট সময়েই হবে. নির্বাচনের আগে পর্যন্ত দেশে সমস্ত রাজনৈতিক দলের পক্ষে গ্রহণযোগ্য অন্তর্বর্তী কালীণ মন্ত্রীসভা তৈরী করা হবে.

সরকারও এই বিরোধে একেবারে স্পষ্ট করে নিজেদের জন্য কোন জয় আনতে পারে নি. যাঁরা মিটিং করেছেন, তাঁদের দাবী এড়ানো সম্ভব হয় নি. সরকারকে এই “মিছিলের” আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের “রাষ্ট্র বিরোধী কাজকর্মে” জড়িত বলে অভিযোগ করে কড়া শাস্তি দেওয়ার হুমকি ফিরিয়ে নিতে হয়েছে. আর “সংবিধান সংরক্ষণের” নামে অস্ত্র বিহীণ মিছিলের লোকদের উপরে শক্তি প্রয়োগ করে লন্ডভন্ড করে দেওয়ার লোভও ছিল খুব বেশী করেই.

পাকিস্তানের অসামরিক প্রশাসনকে এই ক্ষেত্রে তাদের প্রাপ্য প্রশংসা করতেই হবে, তাঁরা ইসলামাবাদের রাস্তা থেকে জনতাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন বড় রকমের কোন রক্তপাত না করেই. আর এটা কোন আরব দেশেই করা সম্ভব হয় নি, যেখানে গত দুই বছর ধরে মোটেও কোন “মখমল বিপ্লব” হচ্ছে না.

পাকিস্তানের বিরোধে কোন “হ্যাপি এন্ড” হয়েছে কি বলা যেতে পারে? মোটেও না, বরং বলা যেতে পারে যে, এখানে কথা হচ্ছে একটা সাময়িক বিরতির. আরও একটি বিরক্তির চাপা বাষ্প এবারেও ছাড়া সম্ভব হয়েছে, বিস্ফোরণ হয় নি. তাহির কাদরি সাবধান করে দিয়েছেন যে, এই “লক্ষের মিছিলের” লোকরা আবার রাস্তায় নেমে আসবেন, যদি সরকার “ইসলামাবাদ ঘোষণার” প্রতিশ্রুতি পালন না করে ও দেশের নির্বাচনের আইনে সংশোধন না করে. সর্ব স্তরের দুর্নীতি, সরকারি লোকদের ক্ষমতার অপব্যবহার, দেশের বহু অংশে নিরাপত্তার কান্না আসার মতো পরিস্থিতি – এই সবই দেশে বিরক্তির বিস্ফোরণের আরও একটা কারণ হতেই পারে. আর কখন তা হতে চলেছে, তা কেউই জানে না.

দেশের অসামরিক সরকার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এই রাজনৈতিক সঙ্কটের সমস্যা মর্যাদার সঙ্গেই পার হয়েছে. এই বছরের বসন্তে দেশে প্রথম স্বাধীন গণতান্ত্রিক নির্বাচন পাওয়া পরিনামকেই আরও মজবুত করতে বাধ্য. কিন্তু সামরিক নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মাপের গণতান্ত্রিক পথে চলার ক্ষেত্রে কম বাধা ও খানাখন্দ আসবে না. কারণ এই পথ মাত্র চার দিনেই পার হয়ে আসা যায় না...