পাকিস্তানের ইতিহাসে একটা অত্যন্ত জটিল অধ্যায় শুরু হয়েছে. ইসলামী সুফি তাহির কাদ্রির নেতৃত্বে লাখে লাখে মানুষ সরকারকে চরম শর্ত দিয়েছেঃ রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের পদত্যাগ, লোকসভা ভেঙে দেওয়া ও দেশে চরমপন্থার রাজনৈতিক সংস্কারসাধন.

গত সপ্তাহে তাহির কাদ্রির ডাকে অসংখ্য মানুষ “ইসলামাবাদ চলো” নামক আন্দোলনে সামিল হয়েছে. যেন দেশলাইয়ের বাক্সে আগুনের ফুলকি উড়ে এসে পড়েছে. মঙ্গলবার প্রতিবাদী জনতা রাজধানী ইসলামাবাদে জড়ো হয়েছে. “আমাদের দীর্ঘ পদযাত্রা সমাপ্ত হয়েছে. এটা বিপ্লবের সূচনা. কাল সকালে যখন আপনারা ঘুম থেকে উঠে নমাজ পড়া শেষ করবেন, তখন আপনারা দেখতে পাবেন অন্য দেশ” – জনতার উদ্দেশ্যে এই কথা বলেছেন তাহির কাদ্রি.

‘ইসলামাবাদ চলো’ নামক পদযাত্রার উদ্যোক্তা পাকিস্তানের বিপ্লবের ম্যানিফেস্টো বলে অভিহিত করেছেন জনসভায় ঘোষিত ‘ইসলামাবাদের ঘোষনাপত্র’কে. এর সারমর্ম হল – দেশে আমূল সংস্কার সাধন করা. এর লক্ষ্য – রাজনৈতিক ওপরমহলে দুর্নীতির সমূল উচ্ছেদ. দেশের অসামরিক সরকারের উপর পরিস্থিতির অবনতি ঘটার দায়ভার চাপালেও কাদ্রি রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর কার্যকলাপের উচ্চ মূল্যায়ন করেছেন.

আমাদের পর্যবেক্ষক সের্গেই তোমিনের মতে লক্ষ লোকের ইসলামাবাদ অভিযানে আন্দোলনকারীরা প্রথম নৈতিক জয় অর্জন করেছে. –

পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্ট মঙ্গলবার দেশের প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আসরাফকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করার ফরমানা দিয়ে বস্তুতঃ সমাবেশকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়েছে. ২০১০ সালে কেন্দ্রীয় সেচ ও জ্বালানীশক্তি মন্ত্রীর পদে আসীন থাকাকালে আসরাফকে ঘুষ খাওয়ার দোষে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে. অবশ্যই সুপ্রীম কোর্টের রায় জেনে সমাবেশকারী জনতা উল্লাসে ফেটে পড়েছে.

পদযাত্রাকে কাদ্রি পাকিস্তানে ‘মিশরের তাহরির চক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন. কিন্তু মুসলিম এই সুফির কার্যকলাপ আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে ১৯৭৯ সালে ইরানের কথা, যখন দেশ থেকে বিতাড়িত আয়াতোল্লা খোমেইনি দেশে ফিরে এসে ইসলামী বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন. মনে করিয়ে দিতে চাই, যে যেমন শিয়া অধ্যুষিত ইরানে, তেমনই সুন্নী অধ্যুষিত পাকিস্তানে জনতা রাস্তায় নেমেছে গণতন্ত্রের পুণর্স্থাপন ও ইসলামী নৈতিকতার পুণরুজ্জীবনের শ্লোগান নিয়ে.

কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে লক্ষ লোকের পদযাত্রায় গোপনে মদত দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর ওপরমহলের একাংশ. এই দৃষ্টিভঙ্গীর সমর্থকদের দৃঢ়বিশ্বাস, যে ক্ষমতাশালী মদতদাতাদের সাহায্য ছাড়া বহুকাল দেশের বাইরে থাকা তাহির কাদ্রি কোনোমতেই এত অল্প সময়ের মধ্যে অসংখ্য লোকজনকে আন্দোলনে সামিল করতে পারতো না. জনপ্রিয়তা পুরোপুরি খুইয়েছে, সেটা বুঝেই বর্তমান শাসকরা আর আন্দোলন থামাতে পারছে না. তাদের মতে সেনাদল আড়ালে থেকে বোধহয় কাদ্রির হাত দিয়ে কলকাঠি নাড়াচ্ছে.

পাকিস্তানের ইতিহাসে সেনাবাহিনী বহুবার অন্তরাল ছেড়ে বেরিয়ে এসে বলপ্রয়োগ করে “নতুন শৃঙ্খলা” স্থাপন করেছে. তবে তাহির কাদ্রি অস্বীকার করছে, যে সে সেনাদের হাতের পুতুল ও সমানে বলে যাচ্ছে, যে তার একমাত্র লক্ষ্য হল – “দুর্নীতিগ্রস্ত ও চোর শাসকদের ক্ষমতা থেকে অপসারন করানো”. সুতরাং সে কে – জনগণের নতুন আন্দোলনের প্রকৃত নেতা নাকি তাকে দিয়ে কলকাঠি নাড়াচ্ছে অন্যরা – সে প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে.