জলজ সম্পদের মালিকানা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা পরিস্থিতি বিরাজ করছে.

জল নিয়ে বিরোধপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান প্রায় নিয়মিত ভারতকে হুঁশিয়ারি করছে. নতুন বছর শুরুর ঠিক কয়েকদিন আগে পাকিস্তানি পত্রিকা “দ্যা ন্যাশন” ভারতকে তথাকথিত “জল সন্ত্রাস” বলে অভিহিত করেছে.

এদিকে গত সপ্তাহের শেষের দিকে পাকিস্তানের লাহরে “Water Resources Governance in the Indus Basin” শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়. এতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও জাতিসংঘের অন্তত ১০০ জন বিশেষজ্ঞ অংশ নেয়. সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা কোন ঐক্যমতে পোঁছাতে পারেন নি. এশিয়া অঞ্চলে জলজ সম্পদ নিয়ে বিতর্ক আরোও ছড়িয়ে পড়ছে. কিন্তু, এ সমস্যা সমাধান কিভাবে করা যাবে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেন নি বিশেষজ্ঞরা.

কৌশলগত জলজ সম্পদের মালিকানা নিজেদের বলে দাবী করা প্রতিটি পক্ষ “নিজেদের কাছে লেপ টেনে নিচ্ছে” এবং অস্বচ্ছ খেলায় মেতে ওঠার দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে প্রতিবেশী দেশের প্রতি. নয়া দিল্লির ওপর পাকিস্তান থেকে অভিযোগ এনেছেন দেশটির পার্লামেন্টের কাশ্মির বিষয়ক কমিটির প্রধান মাওলানা ফাজলুর রাহমান. তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, কাশ্মির থেকে পাকিস্তান অভিমুখী নদীর ওপর ভারত অবৈধ বাঁধ নির্মাণ করছে এবং এর মধ্য দিয়ে তাঁরা আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস করতে চেষ্টা করছে.

এ অঞ্চলের নদ-নদীর ব্যবহারের নিয়মনীতি নিয়ে ১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে “Indus Water Treaty” শীর্ষক একটি চুক্তিপত্র সই হয়. দুই দেশের ভূখন্ড দিয়ে যেসব নদী প্রবাহিত হচ্ছে তার আইনগত সঠিক ব্যবহাররের দিকনির্দেশনা উল্লেখ রয়েছে ওই চুক্তিতে.

অন্যদিকে ভারত বলছে যে, পাকিস্তানের করা ওই অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে. শুধুমাত্র প্রচারণা যুদ্ধে না জড়াতে পাকিস্তানী সরকারকে আহবান জানিয়েছে. এ বিষয়ে আরও জানিয়েছেন আমাদের বিশেষজ্ঞ সেরগেই তোমিন. রেডিও রাশিয়াক তিনি বলছেন, “Indus Water Treaty নামে চুক্তিটি ভারত ও পাকিস্তানের পক্ষে তখন স্বাক্ষর করেছিল জওহরলাল নেহেরু ও আউয়ুব খান. তবে ওই চুক্তির গঠনতন্ত্রে তেমনস্পষ্ট করে বর্ননা না থাকায় জল সম্পদ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধের এখনও মিমাংশা হয় নি. তাই আজও ওই চুক্তি তাঁরা নিজের মত করে ব্যবহার করছে. কিন্তু সত্য হলেও দিল্লী কিংবা ইসলামাবাদ এখন পর্যন্ত এ সমস্যার সমাধান নিয়ে আন্তর্জাতিক ভৌগলিক সালিসির শরনাপন্ন হয় নি”.

হিমালয়ের পাদদেশ দিয়ে বহে চলা ইন্দ নদীর ওপর এ অঞ্চলের অন্যতম বৃহত জলবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প নিমো-বাজগো’র বিরোধীতা করে আসছে পাকিস্তান. এ বছরের শুরুর দিকেই এ কেন্দ্র চালু হওয়ার কথা রয়েছে. পৃথিবীর অন্যতম উঁচু ভুমিতে স্থাপিত ওই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র যা ভারতীয় সীমান্তবর্তী রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরে অবস্থিত. ভূমি থেকে ৩০০০ মিটার উঁচুতে গড়ে তোলা ওই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র দুর্গম এলাকার অধিবাসীদের বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে যেখানে এখনও সন্ধার পর বাড়িতে কেরোসিনের বাতি জ্বালাতে হচ্ছে.

নিমো-বাজগো জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ভারত বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে. ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক ভৌগলিক সালিসিতে যেতে অস্বীকার করায় এই দাবীর যৌক্তিকতা নেই বলে দিল্লি জানিয়েছে.

অন্যদিকে, তিব্বতের মালভূমি নদীর ওপর চীনের নির্মাণাধীন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাড়তি উৎকন্ঠা সৃষ্টি করেছে. তবে দিল্লির জন্য সবচেয়ে আশংকার কারণ হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ী নদী ব্রহ্মপুত্রের ওপর চীনা কার্যক্রম যা দুটি দেশের ভূখন্ড দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে.

মার্কিন গবেষক জেফ হিসকোক “ভূমি যুদ্ধঃ বিশ্ব সম্পদের জন্য লড়াই” নামের বইতে লিখেছেন যে, বেইজিংয়ের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ যা ভারত ও বাংলাদেশর ১৫০ মিলিয়নেরও বেশি জনগনের কাছে আগ্রহের কারণ হতে পারে.

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এশিয়ার দুই প্রধান অর্থনৈতিক শক্তির দুই দেশ ভারত ও চীন বর্তমানে জল সম্পদ সংকটে ভূঁগছে এবং নিজেদের আবার নতুন করে বিরোধে জড়ানোর আগেই এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট ঐক্যমতে পৌঁছানো দরকার.