মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা এই চলে যাওয়া সপ্তাহের শেষে নতুন প্রশাসনের প্রধান দায়িত্বভার গুলি ভাগ করে দেওয়া শেষ করেছেন. তাঁর ক্যাবিনেটের, মনে হচ্ছে এবারে বেশী করেই উপস্থিত বুদ্ধি সম্পন্ন ও বাস্তব ভারসাম্যের ধারণা আছে এমন সব মানুষ বেড়েছে. নতুন মুখ হয়েছে পররাষ্ট্র দপ্তর, অর্থমন্ত্রক, পেন্টাগন ও সিআইএ সংস্থার প্রধানদের. সমস্ত পদ অর্পণের মধ্যেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে গত মেয়াদে ওবামার রাষ্ট্রপতি হিসাবে নেওয়া প্রধান কাজ গুলির প্রতিফলন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনীতির খাদের কিনারা থেকে উদ্ধার করা, বাজেট সমস্যার সমাধান করা আর খুবই পাল্টে যাওয়া বিশ্বের বাস্তবকে হিসাবের মধ্যে নেওয়া.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি এবারে হিলারি ক্লিন্টনের জায়গায় নির্ধারণ করবেন ডেমোক্র্যাটিক দলের পক্ষ থেকে সেনেট সদস্য জন কেরি. বিশেষজ্ঞরা যেমন উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর ক্লিন্টনের থেকে অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান কোন অংশে কম নয়, বরং ক্লিন্টনের মত তাঁর কোনও “পররাষ্ট্র নীতিতে অধিক উত্তপ্ত ইস্পাতের” মতো মনোভাব নেই. পেন্টাগনে আসছেন প্রাক্তন সেনেট সদস্য চাক হেগেল: সমস্ত জানা রিপাব্লিকান দলের সদস্যদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশী বাম ঘেঁষা. সিআইএ সংস্থায় ওবামা রাখছেন এক সেই সংস্থারই নিয়মিত কর্মী ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এক বিশেষজ্ঞ জন ব্রেন্নান কে. নতুন অর্থ মন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছেন জ্যাকব লিউ, যিনি বর্তমানে মার্কিন রাষ্ট্রপতির প্রশাসনের প্রধানও ছিলেন. লিউ, মার্কিন কংগ্রেসের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে একজন অত্যন্ত পটু ব্যক্তি, তিনি টিমোথি হাইটনারের জায়গা নিচ্ছেন, যাঁকে ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময়ে অগ্নি নির্বাপণের কাজ করতে হয়েছিল.

ওবামা এই প্রথমবারই তাঁর ক্যাবিনেটের মধ্যে রিপাব্লিকান দলের সদস্য রেখে খানিকটা “কম ঘন” করছেন না, এবারে চাক হেগেল পেন্টাগনে দ্বিতীয়বার রিপাব্লিকান দলের প্রধান হতে চলেছেন. ২০০৮ সালে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরে ওবামা বুশের উত্তরাধিকার বজায় রেখে ছিলেন রবার্ট গেইটসকে পদে বহাল রেখে. তাঁর পরিবহন মন্ত্রীও হতে চলেছেন রিপাব্লিকান দলের সদস্য. রাষ্ট্রপতি নিজেই এই বিষয়ে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি এই ধরনের পদ বিতরণ করে ওয়াশিংটনে দুই দলীয় রাজনীতির মূল ধারণা রোপন করেছেন, তিনি বলেছেন:

“চাক হলেন দুই দলীয় ব্যবস্থার একটা ঐতিহ্যের বাস্তবায়ন, যা ওয়াশিংটনে এত প্রয়োজন. নিজেদের চিন্তাধারায় স্বাধীনতা ও তার বিষয়ে সমঝোতার খোঁজ করার জন্য তিনি যেমন আমাদের সামরিক নেতৃত্বের কাছ থেকে, তেমনই জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার নেতৃত্বের কাছ থেকে সম্মানের অধিকারী. রিপাব্লিকান ও ডেমোক্র্যাটদের তরফ থেকে এবং আমার কাছ থেকেও. আমার গোষ্ঠীতে এই ধরনের মানসিকতারই ঠিক প্রয়োজন. আমাদের সেই বাস্তবকে মানতেই হবে যে, যখন আমাদের দেশের প্রতিরক্ষার কথা ওঠে, তখন আমরা আর ডেমোক্র্যাট বা রিপাব্লিকান নই. আমরা – আমেরিকার লোক”.

এই সব পদভারপ্রাপ্তদের এরপরে মার্কিন সেনেটের কাছ থেকে সমর্থন পেতে হবে. এখানে সমস্যা হতে পারে শুধু চাক হেগেলের প্রার্থী পদ নিয়েই. তাঁর নিজের প্রাক্তন দলের লোকদের সাথেই কংগ্রেসে তাঁর সম্পর্ক খুব একটা মসৃণ নয়.

হেগেলকে রিপাব্লিকানদের মধ্যে ধরা হয় যিনি কাঠামো মানেন না, বিরোধ পন্থী ও দলছুট বলেই. তিনি এই কারণেই বিখ্যাত যে, ইরাকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা শুরুর পক্ষে কথা বলেছেন ও প্যালেস্তিনীয় স্বয়ং শাসিত এলাকায় হামাস দলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কথাও বলেছেন.

পেন্টাগনের প্রধান হওয়ার প্রার্থী মনে করেন যে, সামরিক মন্ত্রণালয়ের বাজেট খুবই বাড়িয়ে করা হয়েছে ও তা কমানো দরকার. হেগেল সব সময়েই ইজরায়েলকে অর্থ সাহায্যের পক্ষে, কিন্তু তা স্বত্ত্বেও নিজেদের নিকট প্রাচ্যের প্রধান সহযোগী দেশকে প্রায়ই সমালোচনা করেছেন. একবার এমনকি ঘোষণা করেছিলেন যে, কংগ্রেসে খুবই শক্তিশালী, তিনি যেমন বলেছেন – “ইহুদীদের লবি”. যে কারণে তাঁকে শুধু ইজরায়েলের বিপক্ষের রাজনীতিবিদই নয় এমনকি ইহুদী বিদ্বেষী বলেও নাম দেওয়া হয়েছিল. সুতরাং রিপাব্লিকান দলের লোকরা বোধহয় সেনেটে চেষ্টা করবেন নিজেদের দলের লোককেই কিছুটা “ভেজে তুলতে”. যদিও খুব সম্ভবতঃ, সমালোচনার পরে তাঁর প্রার্থী পদকে সমর্থন করা হবে.

জন কেরি, পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধানের পদে যাঁকে এগিয়ে দেওয়া হয়েছে, তিনি সব সময়েই ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা শুরুর পক্ষে কথা বলেছেন. তার ওপরে তিনি একাধিকবার বলেছেন যে, ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে সমস্যার সমাধান করা দরকার রাশিয়ার সঙ্গে একসাথেই. আর ওবামার মস্কোর সঙ্গে “নতুন করে সম্পর্ক শুরু করাকেও” সমর্থন করেছেন. কেরি সেনেটের বিদেশ নীতি পরিষদের সভাপতি ছিলেন, আর কখনও ইউরোপে আমেরিকার রকেট বিরোধী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন না. কেরির মতে, যদি কূটনৈতিক ভাবে ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে সমস্যার সমাধান করা যায়, তবে ইউরোপে আমেরিকার রকেট প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রয়োজনও নিজে থেকে ফুরিয়ে যাবে. আর এর অর্থ হল যে, রুশ – মার্কিন সম্পর্কের মধ্যে একটা বড় বিরক্তির কারণই আর থাকবে না.

প্রসঙ্গতঃ, ১১ই জানুয়ারী ওয়াশিংটন ঘোষণা করেছে যে, তারা মস্কোতে রাষ্ট্রপতির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা টম ডনিলনকে পাঠাচ্ছে. তিনি জানুয়ারীর শেষে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনকে বারাক ওবামার বিশেষ বার্তা পৌঁছে দেবেন. বিশ্লেষকদের মতে, ডনিলন যে আসছেন, সেটাই রাশিয়াতে বারাক ওবামার নিজের সফরের প্রস্তুতি নিয়ে একটা মুখ্য অধ্যায় হতে পারে. কিছু তথ্য অনুযায়ী ক্রেমলিনে চাওয়া হয়েছে যে, মার্কিন রাষ্ট্রপতি যেন এখানে বছরের প্রথম অর্ধেই আসেন.