বৃহস্পতিবারে পাকিস্তানের দুই শহর কোয়েটা ও মিঙ্গোরাতে একসারি বিস্ফোরণের ফলে ১০০ জনেরও বেশী নিহত ও ২০০ জনেরও বেশী আহত হয়েছেন. পাকিস্তানের পুলিশের তথ্য অনুযায়ী কোয়েটা শহরের একটি বিলিয়ার্ড ক্লাবের কাছে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুটি বিস্ফোরণ হয়েছে. দুটি ক্ষেত্রেই আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদী এই বোমা ফাটিয়েছে. নিহতদের মধ্যে শিশু সহ স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক ও নয় জন পুলিশ কর্মীও ছিলেন. একই দিনে সোয়াত উপত্যকায় খাইবার-পাখতুনভা রাজ্যে মিঙ্গোরাতে, যেখানে প্রায় দেড় হাজার স্থানীয় লোক এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিলেন, সেখানে আরও একটি বিস্ফোরণ হয়েছে. ৩০ জনেরও বেশী লোক মারা গিয়েছেন ও ৮০ জনের মতো আহত হয়েছেন.

পরিস্থিতি মূল্যায়ণ করে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ ও সামাজিক নেতা মুহাম্মেদ ফারুক আরশাদ বলেছেন:

“গতকালের কোয়েটা শহরের বিস্ফোরণ (বেলুচিস্তানের রাজধানী) ও সোয়াত উপত্যকায় বিস্ফোরণ সারা দেশ জুড়ে প্রচুর বিক্ষোভ ও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সহানুভুতির ঢেউ তুলেছে – আর তাদের সংখ্যা খুবই আহতদের সংখ্যা যোগ করলে কয়েক শো মানুষ. বেশ কিছু দিন ধরে দেশে মোটামুটি শান্ত পরিস্থিতি ক্ষুণ্ণ হয়েছে. আর বহু স্থানীয় লোকেরই একটা অনুভূতি তৈরী হয়েছে যে, এই ধরনের সন্ত্রাসবাদী কাণ্ডের জন্য সময় বাছা হয়েছে একেবারেই হঠাত্ করে নয়. দেশে লোকসভা নির্বাচনের সময় এগিয়ে আসছে. ভারত – পাকিস্তান সীমান্তে একটা উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে. ইসলামাবাদে বিরোধী দল গুলির মিছিল তৈরী হচ্ছে আর এই মুহূর্তে বিস্ফোরণ শুরু হয়েছে. সম্ভবতঃ এটা পরিস্থিতি বিকল করার জন্য ও নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার জন্যই করা হচ্ছে. আর এখানে বাদ দেওয়া যায় না এমন সম্ভাবনাও যে, এটা বিদেশ থেকে নির্দিষ্ট শক্তির ইশারাতেই করা হচ্ছে. যে কোন ক্ষেত্রেই সমস্ত আভ্যন্তরীণ ও বিদেশের পরিস্থিতি চিন্তা করে দেখলে দেখা যাবে যে, তা সময় মতো নির্বাচন করার জন্য মোটেও অনুকূল নয়”.

যেখানে এই সব মৃত্যুবাহী বিস্ফোরণ হয়েছে সেই বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনভা, পাকিস্তানের সবচেয়ে অশান্ত রাজ্য. তাতে বিশেষ করে শক্তিশালী রয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতা, ধর্ম মতের মধ্যে বিরোধ – উত্তেজনা. সেই কারণেই খাইবার পাখতুনভা রাজ্যে ঘটেছে কিশোরী মালালা ইউসুফজাই হত্যা প্রচেষ্টা. এই রকমই বেলুচিস্তানেও বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতা খুবই প্রবল. এটা পাকিস্তানের এলাকা অনুযায়ী সবচেয়ে বড় রাজ্য, যেখানে প্রভূত পরিমানে খুঁজে পাওয়া অথচ উত্তোলন না করা খনিজ পদার্থ রয়েছে, আর সেটি একটি দরিদ্রতম রাজ্যও বটে. অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রায় হচ্ছেই না. এখানে খুবই সক্রিয়ভাবে চরমপন্থী গোষ্ঠীরা কাজ করছে. গত বছরের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ইফতিকার মুহম্মদ চৌধুরী পাকিস্তানের প্রশাসনকে অভিযোগ করেছেন যে, তারা কোন কাজই করছেন না এবং দেশের গুপ্তচর বাহিনীর কাছে জবাবদিহি চেয়েছেন যে, বেলুচিস্তানে হারিয়ে যাওয়া পাকিস্তানের নাগরিকদের সম্বন্ধে কারণ দর্শাতে.

রাশিয়ার রাজনীতিবিদ ইভগেনি সাতানোভস্কি পরিস্থিতি নিয়ে সমস্ত দোষের কারণ শুধু তালিব জঙ্গীদের উপরেই দেন নি, তিনি মনে করেন যে, এর জন্য একই সঙ্গে পাকিস্তানের অসামরিক প্রশাসন ও সামরিক নেতৃত্বও দায়ী, তাই বলেছেন:

“পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী খুব একটা ঐস্লামিকদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায় না. শেষমেষ বলা যেতে পারে যে, সোয়াত উপত্যকায়, বেলুচিস্তানে এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় ঐস্লামিকরাও পাকিস্তানে শক্তিশালী হয়েছে, বর্তমানের সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সহায়তা করার জন্যই. হাক্কানি ও অন্যান্য একই ধরনের গোষ্ঠী যে কোন ধরনের অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতার জন্য একেবারেই আলাদা রকমের, তারা শুধু খ্রীষ্টানই নয়, এমনকি শিয়া মুসলমানদের প্রতিও নিষ্ঠুর. পাকিস্তানে রক্তপাত প্রায় প্রত্যেক দিনই হচ্ছে. প্রজাতিগত ও ধর্ম মত অনুযায়ী সংখ্যালঘুদের উপরে নিষ্ঠুর অত্যাচার এর পরে পাকিস্তানকে এক রাষ্ট্র হিসাবে টিকে থাকার পক্ষেই প্রতিকুল হতে পারে”.

যদি প্রশাসনের পক্ষে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়, তবে এই হিংসার বাড়াবাড়ি বসন্তে দেশে পার্লামেন্ট নির্বাচনকেই শিকেয় তুলতে পারে ও পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে খুবই গুরুতর ভাবে অস্থিতিশীল করে দিতে পারে.