নববর্ষের নীরবতার পরে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক আবার খুবই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে. জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে দুই ভারতীয় সৈনিকের আকস্মিক ও পাশব নিধন বিশ্বকে আবার করে মনে করিয়ে দিয়েছে “রাষ্ট্রসঙ্ঘের আলোচ্যের তালিকায় থাকা একটি প্রাচীনতম বিরোধের” কথা. যখন দিল্লী ও ইসলামাবাদ একে অপরকে শান্তি চুক্তি লঙ্ঘনের অপরাধে অভিযুক্ত করে চলেছে, তখন নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর খুবই ভঙ্গুর স্থগিতাদেশ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় করা হচ্ছে এই বিরোধ আরও তীব্রতর হলে – যা বিশ্বের একটি অন্যতম বিস্ফোরক সীমান্ত বরাবর রয়েছে.

মঙ্গলবারে এক অজানা পরিস্থিতিতে মেন্ধার সেক্টরে পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত আগলে থাকা চৌকীর নিহত দুই ভারতীয় সৈনিকের ক্ষত বিক্ষত দেহ এক খুবই শোকাচ্ছন্ন স্মৃতিরই উদ্রেক করেছে যে, ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের মধ্যে যুদ্ধের দানব বিভিন্ন সময়ে বারবার ফিরে এসেছে. আশ্চর্য্যজনক ও নিধন অযোগ্য এই যুদ্ধের দানবরা প্রত্যেকবারই ফিরে এসেছে আর এর মধ্যেই প্রত্যেক পক্ষ নিজেদের মত করে সত্য বিচার করেছে, এই বিরোধের উপরে নিজেদের দৃষ্টিকোণ বজায় রেখেছে, নিজেদের নিহতদের তালিকা বৃদ্ধি করেছে, নতুন ক্ষতির তালিকা হাতে নিয়ে, যার সঠিক সংখ্যা আজ কেউই জানেন না. কারণ তিনটি সরকারি ভাবে স্বীকৃত যুদ্ধ ছাড়াও, এমন অনেক যুদ্ধই হয়েছে, যা কখনও ঘোষিত হয় নি. আর এটাতেও প্রত্যেক পক্ষের তরফ থেকে নিজেদের উপকথা অনুসরণ করে চলেছে.

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ, যার ভিত্তিতে কাশ্মীর নিয়ে বিবাদ রয়েছে, তা সমস্ত রকমের সমঝোতার অভাব ও নিষ্ঠুরতা স্বত্ত্বেও আজ খুবই অযৌক্তিক এবং যদি তাকে অর্থহীণ না বলাও হয়, তাহলেও খুবই গন্তব্যহীণ এক বিরোধ. আর তা শুধু এই কারণেই নয় যে, এই বিরোধে কোন বিজয়ী বা পরাজিত বলে কেউ তাকতে পারে না – এখানে সকলেই হারবে. আর প্রত্যেক পক্ষই আজ পারমানবিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ বলে সারা বিশ্বে প্রতি বার “কাশ্মীর” শব্দটির পুনরাবৃত্তিতে একেবারে উত্তেজনায় চলত্শক্তিহীণ অবস্থার সৃষ্টি হয়, যার অর্থ হল এক অসাধারণ নিসর্গ সৌন্দর্যের রাজ্য, যদিও তা বিশ্বের একটি অত্যন্ত দূরধিগম্য স্থানও বটে.

মনে হতে পারে যে, প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রে খুবই দরিদ্র এই উঁচু পাহাড়ী ও চরম আবহাওয়ার কাশ্মীরের অধিকার নিয়ে আঁকড়ে থাকা ভারতের এর থেকে প্রায় কোন লাভই হয় না: তার সামরিক অথবা অর্থনৈতিক অর্থও বেশী কিছু নয়. কিন্তু আসলে, এক এলাকা হিসাবে কাশ্মীর পাকিস্তানের জন্যও বিশেষ কিছু মূল্যবান জায়গা নয়. তবুও কেন এই এলাকা নিয়ে দুই পক্ষই দড়ি টানাটানির খেলা চালিয়ে যাচ্ছে একেবারে “বিশ্বের গৃহ চূড়ায়”, যেখান থেকে পদস্খলনের সম্ভবনা কি নেই?

আসলে এখানে বিষয় শুধু এলাকা নিয়েই নয়, যত না প্রত্যেক দেশের রাষ্ট্রীয় আদর্শের লড়াই. আদর্শ এখানের বাজী ধরেছে সবচেয়ে বেশী আর তা কোন পক্ষকেই নিজেদের নীতির বিরুদ্ধে যেতে দিচ্ছে না. আসলে এটা দুটি ধারণার মধ্যে ঐতিহাসিক এক বিতর্ক, যার ভিত্তিতে দুটি একদা অভিন্ন রাষ্ট্রের থেকে এই দুই দেশের উত্পত্তি হয়েছে. ভারতের ধারণায় একক দেশ ও পাকিস্তানের দুই জাতির “দুই দেশের ধারণার” মধ্যে বিরোধ.

নব ভারতের জনক – জওহরলাল নেহরু ও মহাত্মা গান্ধী যদিও হিন্দু ছিলেন, তবুও তাঁরা দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও শুধু হিন্দুদেরই নয়, বরং অন্যান্য প্রজাতি, সংস্কৃতি ও ধর্মের সমস্ত মানুষদের জন্যই সমানাধিকারের ও সম মর্যাদায় বেঁচে থাকার অধিকারের কথা বলেছিলেন. এই অর্থে “একক জাতির” ধারণা অথবা “একক সুখী প্রজাতিদের পরিবারের” ধারণা, যা নেহরু ও গান্ধীর মতে ভারতের হয়ে ওঠা উচিত্ বলে মনে হয়েছে.

নিজের দিক থেকে পাকিস্তানের জনক মুহাম্মেদ আলি জিন্না মনে করতেন যে, হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে এক বড় তফাত রয়েছে, যা তাদের একসাথে থাকতে দেয় না. জিন্না সত্যই বিশ্বাস করতেন যে, ভারতের মুসলমানরা সমান অধিকার ও নিজেদের বাস্তবায়ন করার জন্য একমাত্র নিজেদের ঐস্লামিক রাষ্ট্রেই পারে. এই ভাবেই জন্ম নিয়েছিল “দুই জাতির” ধারণার – হিন্দু ও মুসলমান.

যদি এক মিনিটের জন্যও মনে করা যায় যে, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের স্বপ্ন সফল হবে ও কাশ্মীর ভারতের থেকে আলাদা হয়ে যাবে, তবে তারই সঙ্গে সেই “ঐক্যবদ্ধ পরিবারের” ধারণার কবর তৈরী হবে, যার উপরে আজ গণতান্ত্রিক ভারতের সমস্ত আদর্শ ভিত্তি করে রয়েছে. যদি এই ঘটনা এই রকমের কূপরিণতির দিকে গড়ায়, তবে একেবারে সমগ্র ভারতীয় রাষ্ট্রের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে. আর এটা কেউই হতে দেবেন না.

আর এখানেই রাশিয়ার সঙ্গে একটা সমান্তরাল টানা যেতে পারে: যদি দুটি চিচনিয়ার যুদ্ধের সময়ে, যা সোভিয়েত দেশের পতনের পরেই শুরু হয়েছিল, তথাকথিত স্বাধীন ইচকেরিয়ার সংগ্রামীরা নিজেদের পরিকল্পনাকে সফল করে তুলতে পারত ও স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরী করতে পারতো, তবে এটাই রাশিয়া প্রজাতন্ত্রের উপরে এক মারণ আঘাত হানত.

এখানে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, একেবারে শুরু থেকেই চিচনিয়াতে সন্ত্রাসবাদী বিরোধী অপারেশনের পক্ষে ভারত সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেছিল ও কখনও তা নিয়ে কোন রকমের সন্দেহ প্রকাশ করে নি. মস্কো যে পরিস্থিতিতে পড়েছিল, তা একেবারে শুরু থেকেই ভারতীয়দের জন্য খুবই জানা ছিল – কাশ্মীরের মত করে.

কাশ্মীর এখন ভারতীয় ও পাকিস্তানী দুটি রাষ্ট্রীয় ধারণার বিরোধের যাঁতাকলে আজ পঞ্চাশ বছরের উপরে আটকে রয়েছে. এটাই আজও মূল কারণ হয়ে রয়েছে কেন এই যুদ্ধের দানবরা বারবার ফিরে আসছে তার, যা এই এলাকাকে নিষ্ঠুর অত্যাচারে, ক্ষয় ক্ষতিতে ও রক্তে পাথর ও জমিকে রাঙিয়ে তুলেছে. আর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের লক্ষ্য করার উন্নতিকে প্রতিবারে প্রতিহত করে আবার করে পিছিয়ে দিচ্ছে এই গুলি চালাচালি ও সন্ত্রাসবাদী হানা দিয়ে, এক প্রতীক ও ভঙ্গির যুদ্ধে, যা আজও অনবরত ঘটেই চলেছে.