ভারতীয় সমাজে সবচেয়ে উত্তপ্ত আলোচনার বিষয় বস্তু হয়েছে গত বছরের ১৬ই ডিসেম্বর দক্ষিণ দিল্লীতে এক ছাত্রীকে গণ ধর্ষণ ও তার পরবর্তী পরিণাম হিসাবে সেই ছাত্রীর মৃত্যু সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগে পাঁচ অপরাধীর বিচার, যা বাস্তবিক ভাবেই বিশ্বে প্রতিধ্বনি তুলেছে.

মনে হতে পারে যে, আইনের চোখে এই মামলা খুবই সহজ. যদি অভিযুক্তদের অপরাধ প্রমাণিত হয় – আর তাদের দোষের প্রমাণ, বর্তমানে যা তথ্য রয়েছে, তা অনুযায়ী যথেষ্টই রয়েছে – তবে তাদের সকলকেই আইন অনুযায়ী খুবই কঠিন শাস্তি দেওয়া হতে পারে, এমনকি মৃত্যুদণ্ড অবধি.

কিন্তু এই মামলা অনেক আগেই স্রেফ আইনের পরিসর ছেড়ে অনেক দূরে গড়িয়ে গিয়েছে আর বোধহয় বাড়িয়ে বলা হবে না যে, তা সমস্ত সমাজকেই একেবারে জ্বালিয়ে দিয়েছে, যেখানে সেই সব প্রশ্ন উঠেছে, যার জবাব মনে তো হয় না যে, আদালতে শুনানীর সময়ে পাওয়া যাবে, এই রকমই মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ভারতে মহিলাদের বিরুদ্ধে করা অপরাধের পরিসংখ্যান চমকে দেয়. আর এটা শুধু ধর্ষণ নয়, পরিবারের মধ্যে অত্যাচার, যা খুবই কম সময়ে প্রকাশ্যে জন সমাজের গোচর হয়. এর মধ্যে সেই সব কাজ কারবারও রয়েছে, যা খুবই আইন সিদ্ধ ও বিবেকের দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য, কিন্তু আসলে সমস্ত রকমের মূল্যবোধের নিয়মকেই ছাপিয়ে যায়, যেমন, ভ্রূণ হত্যা, বিশেষ করে যদি আগে থেকে জানা সম্ভব হয় যে, ভবিষ্যত শিশুটি স্ত্রী লিঙ্গের”.

শুধু ২০১১ সালেই ভারতে ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে মামলা দায়ের হয়েছিল ২৪ হাজার, যা তার আগের বছরের চেয়েও শতকরা নয় ভাগ বেশী. আর এখানে শুধু মামলার কথাই বলা হচ্ছে, যেগুলি ধর্ষণের পাত্রী ভয়ে মামলা করতে সাহস করে নি, সেগুলির নয়, তার সংখ্যা পরিসংখ্যান জানে না.

ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে প্রার্থী পদে সামিল হয়েছে ২০০রও বেশী প্রার্থী, যাদের নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে মহিলাদের উপরে অত্যাচারের কোন না কোন প্রমাণ রয়েছে. আর কিছু লোক আবার নিজেদের রাজ্যে এই ধরনের ব্যক্তিগত কলঙ্ক স্বত্ত্বেও বিধানসভার সদস্য হতে পেরেছে. তার মধ্যে পার্লামেন্টে আছে ছয় জন, যাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা চলছে, আর আরও ৩৬ জন – মহিলাদের প্রতি আরও অন্য অপরাধের কারণে অভিযুক্ত.

ভারতের ধর্ষণের পরিসংখ্যানে প্রায় প্রতি কুড়ি মিনিটে একটি করে ধর্ষণ হচ্ছে. কিন্তু এখনও এই ধরনের ক্ষেত্রে লোকে চুপ করে থাকাই পছন্দ করেছে. মহিলাদের প্রতি অপরাধকে এখনও মনে করা হচ্ছে না দেশের প্রশাসনে আইন প্রণেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোন বাধা হিসাবে. তাহলে হতে পারে যে, দিল্লী শহরে ১৬ই ডিসেম্বর রাত্রে যে ঘটনা ঘটেছে, তা মোটেও একদল দুষ্কৃতীর একমাত্র অপরাধের ঘটনা নয়, বরং তা সমাজের প্রবণতার এক খুবই গুরুতর পরিস্থিতির প্রতিফলন, যা আজ ভারতের সমাজের বর্তমান চরিত্রের পরিচয় দিচ্ছে? তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই ধরনের ধারণা কিছু রাজনীতিবিদ, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতাদের খুবই সন্দেহজনক প্রতিক্রিয়া থেকেই বেশী করে মজবুত হচ্ছে. তাদের মধ্যে অনেকেই – যারা আবার বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন ধর্মের ও বিভিন্ন দলের লোক – তারা বাস্তবে এই অপরাধের জন্য দোষ কিয়দংশে সেই ধর্ষিতা মেয়েটির উপরেই চাপাতে চাইছেন. যেমন, ভারতের এক হিন্দু ধর্ম প্রচারক আসরাম বাপু এমনকি এমন বলে ফেলেছেন যে, মেয়েটির উচিত্ ছিল নিজের ধর্ষকদের হাত ধরে ভাই বলে তাদের কাছে রেহাই দেওয়ার কথা বলার আর ভগবানের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা. অন্যান্যরা আবার বলছেন যে, অবিবাহিত মেয়ের পক্ষে দিল্লীর মত শহরে রাত করে নিজের ছেলে বন্ধুর সঙ্গে ঘোরা ফেরা করা উচিত্ হয় নি, অথবা তারা আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে জামা কাপড়ের বিষয়ে খুবই প্রয়োজন ভব্যতা রক্ষা করে চলার. অনেকে আবার একেবারে অসম্ভব সব কথা বলছেন, তারা বলছেন যে, ধর্ষণের কাণ্ড যে হবে, তা আগে থেকেই বোঝা গিয়েছিল, কারণ সেই রাতে গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান মোটেও ভাল ছিল না অথবা সব কিছুর মূলে সেই ফাস্ট ফুড, যা খাওয়ার ফলে মানুষের শরীরে নাকি হরমোনের চরিত্র পাল্টে যায় ও তা এই ধরনের কাণ্ড করতে প্ররোচনা দেয়”.

এই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখে বোঝা যায় যে, ভারতের সমাজে এক খুবই গভীর সভ্যতার সঙ্কট চলছে, এই রকমই মনে করেছেন এই রুশ সমীক্ষক. প্রাচীন সব নিয়ম, যাতে দেশের ধর্ম গুলির ঐতিহ্য মেনে করা হয়েছিল, তা ভেঙে পড়ছে, আর তথাকথিত নতুন, যা কিনা পশ্চিমের থেকে দেশের সমাজে প্রবেশ করছে, তা এমন বিকৃত গঠনে ঢুকে পড়ছে, যে, এটার ফলে খুবই ভয়ঙ্কর সব বাড়াবাড়ি হচ্ছে. নিজেদের প্রভাব কিন্তু এরই মধ্যে দিচ্ছে সেই বলিউড, যারা দেখাচ্ছে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিকৃত ধারণা ও মহিলাদের যৌন অত্যাচারের উপযুক্ত সহজলভ্য বস্তু বলেই প্রমাণের চেষ্টা করছে.

আর এর অর্থ হল যে, এমনকি সবচেয়ে কঠিন রকমের শাস্তি এই ছয় অভিযুক্তকে দিলেও তা সমস্যার সমাধান করবে না. তার মূল অনেক গভীরে চলে গিয়েছে, আর তার সমাধান আরও বহু বছর ধরেই করে যেতে হবে, হতে পারে তা বেশ কয়েক দশকও.